নকুল রায়, দায়বদ্ধতা থেকে যিনি কখনোই মুক্তি চাননি

 






শুরুতেই বলে রাখি কবি নকুল রায়ের সামগ্রিক কবিতাচর্চা নিয়ে কথা বলবার জন্য এই লেখা নয়। ক্ষুদ্র পরিসরে তার দীঘল কাব্যভুবনের দিকে ফিরে তাকানো সম্ভবও নয়। সম্পাদক মহাশয় অবশ্য এক্ষেত্রে সীমা বেঁধে দিয়েছেন। তিনি চেয়েছেন কবি নকুল রায়ের যেকোন পাঁচটি কবিতা নিয়ে আলাপচারিতা। সুতরাং যাবতীয় কথা পাঁচটি কবিতাকে ঘিরেই থাকা উচিত। তবে বেসুরো গায়কের গলায় যেমন সূত্রের চেয়ে ভাষ্যের দিকে, গানের চেয়ে কানে হাত চাপা দিয়ে বিপুল অঙ্গভঙ্গির দিকে ঝোঁক লক্ষ করা যায়, আশঙ্কা, আমার আলোচনাও সেই পথেই যেতে পারে। কবিতার আলোচনায় অন্ধের হস্তিদর্শন ছাড়া গতি কী! কোনো মহৎ কবিতাই তার প্রতি স্তরে, পাঠক এমনকি লেখককেও অবাধ প্রবেশের অনুমতি দেয় না। আবার যেখানে ইশারা ও ইঙ্গিতই মূল ভাষা, সেখানে প্রতিটি কথা, মত বিরুদ্ধ মত, সবই সম্ভাবনাময়। এটাই ভরসা।

        এছাড়া কবিতার নির্বাচন একটা সমস্যা। কোন পাঁচটি কবিতা! কবি নকুল রায় সারাজীবনই লিখেছেন। ‘নীহারিকা’ থেকে ২০২০ সালে তার ‘কবিতা সমগ্র’ বেরিয়েছে, যাতে তার কুড়িটি কাব্যগ্রন্থ ও অনেকগুলো অগ্রন্থিত কবিতা স্থান পেয়েছে। তার প্রথম জীবনের দুটি কাব্যগ্রন্থের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। এছাড়া ‘কাব্যসমগ্র’ প্রকাশের পরেও তার কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে বলে শুনেছি। সুতরাং এই বিপুল কবিতারাশির মাঝখান থেকে পাঁচটি কবিতা বাছাই করা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। এক্ষেত্রে আমি আমার ভালো লাগার উপর নির্ভর করেছি। যে কবিতাগুলি নির্বাচন করা হল, সেই কবিতাগুলি তার প্রতিভার ঔজ্জ্বল্য ধারণ করতে পেরেছে তো– এই সংশয় থেকেই যায়। এটাও ঠিক, শুধুমাত্র পাঁচটি কবিতা দিয়ে একজন কবিকে মূল্যায়ন কখনোই করা যায় না। তাই সেই চেষ্টা না করে কবিতাগুলির মায়া ও মহক অনুসন্ধান করাই ভালো। তবে এক্ষেত্র কবি নকুল রায়ের শুরুর দিক থেকে অধুনাকাল পর্যন্ত কবিতাকেই নির্বাচন করা হয়েছে, যাতে পরিবর্তনটা চোখে পড়ে।

            সত্তর দশক সম্পর্কে নতুন করে বলবার কিছু নেই। স্বাধীনোত্তর ভারতবর্ষে চরম সংকটের মুহূর্ত। দুর্বল অর্থনীতি। অন্ন বস্ত্র বাসস্থান শিক্ষা স্বাস্থ্য পানীয় জল বিদ্যুৎ যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সর্বস্তরে সাধারণ মানুষ চরম দারিদ্র্যের শিকার। সমস্ত দেশেই নানান বিদেশি মদতপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনের কার্যকলাপ এবং তৎসঙ্গে জাতি ধর্ম বর্ণের নামে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রমাগত গণ আন্দোলন মিছিল প্রতিবাদ অনশন বিক্ষোভ। সব মিলিয়ে একটা অস্থির সময়। মূলত এই পরিবেশেই কবি নকুল রায়ের উত্থান। সময়ের এই সামগ্রিক প্রভাব সেই কালখণ্ডের সকল কবির মত তার কবিতায়ও শক্তি যুগিয়েছে। তার দৃষ্টিভঙ্গি ও বক্তব্যকে নির্মাণ করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মানুষের মূল্যবোধ পাল্টে গেছে। আলোকায়নের অন্তঃসারশূন্য স্বরূপ প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। বীভৎস হয়ে উঠেছে তার দাঁত নখ। এসব কথা কিছুই নতুন নয়। নকুল রায় সত্তর দশকের কবি।

         কোনো কোনো কবিকে নিয়ে ভাবতে বসলে তার দশককে উপেক্ষা করা যায় না অর্থাৎ ভোলা যায় না। কারণ তার সমগ্র লেখালেখির উপর তার উত্থানের সময়খণ্ডের বিস্তৃত ছায়া বড় হয়ে পড়ে। নকুল রায়ের সারাজীবনের লেখালেখি বিচার করলে এর প্রমাণ খুব জোরালো ভাবে পাওয়া যায়। তিনি যে ভাষা, যে আঙ্গিক নির্মাণ করেছেন অথবা যে বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করেছেন, তার উপর সত্তরের সেই অগ্নিগর্ভ সময়ের প্রভাব সাংঘাতিক। সারাজীবন যেন তিনি অন্তরে তা লালন করেছেন। তার নির্মিত বা অর্জিত বোধ ও বিশ্বাসের আবর্তেই তিনি রচিত হতে চেয়েছেন। আমরা লক্ষ করলে দেখব যে সব কবি কোন আন্দোলন থেকে বা কোন নির্দিষ্ট মতবাদ থেকে কবিতা রচনায় প্রয়াসী হয়েছেন, তাদের সমগ্র লেখালেখি সেই বৃত্ত ছেড়ে বেরোতে পারে না। নকুল রায় গ্রুপ সেঞ্চুরি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যদিও গ্রুপ সেঞ্চুরির লেখালেখিতে কোনো নির্দিষ্ট বাঁধাধরা কিছু ছিল না। কিন্তু ‘সত্তর দশক মুক্তির দশকে’র মত তারা যে রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক অন্যায় ও অসাম্য থেকে শিল্প সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে মুক্তির পথ খুঁজছিলেন তা সত্য। সময়ের প্রভাব তথা সমাজ-রাজনৈতিক তাই ঐ সময়ের লেখালেখিতে সরাসরি এসেছে। নকুল রায় তার ব্যতিক্রম নয়।

               আমাদের আলোচ্য প্রথম কবিতাটি তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হৃদপিণ্ডের হাট’ থেকে নেওয়া। এটি প্রকাশিত হয়েছে ১৯৭৪ সালে। কবিতাটির আয়তন ছোটো। সুতরাং এখানে সম্পূর্ণ উল্লেখ করা যেতেই পারে। একবার পড়ে নেয়া যাক।


ঘোড়া


ছোলাহীন ঘোড়াগুলো দাবানলে কাশে 

ঠিক সাতটা পঁচিশের এলার্ম 

আমার বাসার রোয়াকে বসে 

দুটো পাতিকাক 

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে 

ঠিক শালা... 

আমি যেন লাশঘরে বসে আছি 

সভ্যতার মানুষ লাগাম ছাড়া ঘোড়া 

তেড়ে আসছে ছোলা না পেয়ে


                   কবিতার নাম ‘ঘোড়া’। ঘোড়া মূলত দ্রুতির প্রতীক। আবার শক্তির প্রতীকও ঘোড়া। আমরা ‘অশ্বশক্তি’ বা ‘হর্স পাওয়ার’ কথাটির মানে জানি। যন্ত্রের শক্তি বোঝাতে কথাটি ব্যবহৃত হয়। আধুনিকতার আসল জোরের জায়গাটি হল যন্ত্রের ব্যবহার। জেমস ওয়াটের বাষ্পইঞ্জিন যন্ত্রসভ্যতার যে জয়যাত্রার সূচনা করেছে তা আর থামেনি। সুতরাং ঘোড়া এমন একটি প্রতীক যা স্থান ও কালবিশেষে গতি ও শক্তির প্রকাশ। ঘোড়া প্রাচীনকাল থেকে যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। ছোট এই কবিতাটির নাম শব্দটি বাদ দিলেও দুই বার ‘ঘোড়া’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আমরা জানি ঘোড়ার প্রিয় খাবার ছোলা। প্রথম লাইনে আছে ছোলাহীন ঘোড়াগুলো দাবানলে কাশবার কথা। বনে যখন আগুন লাগে তখন তাকে দাবানল বলে। ছোলার জন্য ঘোড়াগুলো ডাকতে পারে, কাঁদতে পারে, অস্থিরতা দেখাতে পারে। কিন্তু কাশি দেবে সেটা কখনোই সম্ভব নয়। আবার ঘোড়া যখন স্থির, বিশ্রামরত তখনই ছোলা খাবার কথা প্রাসঙ্গিক। ঘোড়া যখন ছোটে তখন নিশ্চয়ই ছোলা খায় না। আসলে যে কবির পরবর্তী কবিতায় শ্লেষই হয়ে উঠবে প্রধান শক্তির জায়গা, সেই কবি যে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থেই তার ইঙ্গিত দেবেন, তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। বস্তুত নকুল রায়ের সামগ্রিক কবিতা পাঠ করলে দেখা যায় শুরু থেকে অধুনাকাল পর্যন্ত শ্লেষকে তিনি নানাভাবে ব্যবহার করেছেন। তির্যক বাচনভঙ্গির দ্বারা তিনি বারবারই সভ্যতার অন্ধকারকে ফুটিয়ে তুলেছেন, খোঁচা দিয়েছেন, আঘাত করেছেন। এই কবিতাটিতে ‘সাতটা পচিশের এলার্ম’, ‘সভ্যতার মানুষ লাগাম ছাড়া ঘোড়া’, ‘বাসার রোয়াক’, ‘পাতিকাক’ ইত্যাদির মাধ্যমে একটি নাগরিক প্রতিবেশ ফুটে ওঠে। এলার্মের সাহায্যে ঘুম থেকে ওঠার মধ্য দিয়ে গতিশীল জীবন এবং জীবনে সময়ের বাঁধন স্পষ্ট বুঝা যায়। কিন্তু ছোলা বিহীন ঘোড়া অর্থাৎ খাদ্যহীন বলে ঘোড়া দৌড়তে পারছে না। সে কাশছে। অথচ দাবানল অর্থাৎ সবদিকেই আগুন। কথাটি ভাবার। ছোলাও কিন্তু শক্তির দ্যোতক। ছোলা মানুষের দেহেও শক্তির সঞ্চার করে বলে ব্যায়ামবীররা ছোলা খান। ছোলাহীন ঘোড়া মানেই তার তেজহীনতার কথা বলা হচ্ছে, যা আসলে মৃত্যুর সামিল। 

        আবর্জনাতেই কাক এসে বসে। একটু পরেই বলা হয় ‘লাশঘরে বসে আছি’। কাকের সঙ্গে মৃতদেহের বা মৃত পদার্থের যোগ রয়েছে। শকুনের সঙ্গেও রয়েছে। জীবনানন্দ লিখেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে মাথার উপর শকুন উড়ছে। কাক এবং শকুনের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। কাক বললে যেমন আবর্জনা ঘেঁটে ঘেঁটে মৃত পদার্থ ভক্ষণ করার নাগরিক চিত্রটি মনে পড়ে। শকুন কিন্তু শহর হোক বা গ্রাম, সরাসরি মৃতদেহটাই ভক্ষণ করে। কাক আকছাড় দেখা যায়, শকুন নয়। আমরা দেখব কবি অদ্ভুতভাবে ‘লাশঘর’ শব্দটি ব্যবহার করছেন। বলছেন না লাশ পড়ে আছে, লাশঘর শব্দটির ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত শহর বা পৃথিবীটাই একটি লাশঘরে পরিণত হয়েছে, যেখানে রোয়াকে বসে থাকা পাতিকাক লাশঘর থেকে লাশ খেতে না পারার জন্য দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে। কবির উপস্থিতি লাশঘরেই। হয়তো কবি একাই বেঁচে আছেন আর পাতিকাক লাশ ঘরে ওই একজন মাত্র জীবিতের জন্য দীর্ঘশ্বাস ছাড়ছে! সভ্যতার মানুষদের খাদ্যবিহীন হয়ে তীব্র আক্রোশে তেড়ে আসা, গতিশীল জীবনের শূণ্যগর্ভ অসারতাকেই ইঙ্গিত করে। আসলে যন্ত্রসভ্যতার তুমুল অধঃপতন বা সভ্যতার গতিমানতার বিপরীতে স্তূপীকৃত লাশের পাহাড়, মৃতদেহের স্তূপ বেড়ে ওঠার ইঙ্গিত পুঁজিবাদী আধুনিক ভোগবাদী জীবনের অসারতাকেই তুলে ধরে। ছোট্ট আয়তনে কবি ধরতে চেয়েছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পুঁজিবাদী সময়ের সংকটকে।

               ইতোমধ্যে তার কয়েকটি কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। মাথার মধ্যে নতুন কিছু করার পরিকল্পনা বাসা বেঁধেছে। তখন রাজ্যের বুকে ভয়াবহ মান্দাই দাঙ্গা বাঁধেনি। তবে নিশ্চয়ই জনজাতি বাঙালির সম্পর্কে ফাটল ধরে থাকবে। কলকাতা থেকে কবি সন্তোষ রায় ও কৃত্তিবাস চক্রবর্তীর সঙ্গে চিঠিতে যোগাযোগ করছেন তিনি। পরিকল্পনা ‘গ্রুপ সেঞ্চুরি’ আন্দোলনের। পরে আরও আরও যুক্ত হচ্ছেন তরুণ তূর্কিরা। 

        ১৯৮০ সালে ফিরে এলেন কলকাতা থেকে আগরতলা। ইমারজেন্সির সময়। নানা ঘটনা প্রবাহ। দাঙ্গার কিছু আগেই বেরিয়েছে তার বহু আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘শব্দশৈল্য এবং শানিতদীপমল্লিকা’। বহু আলোচিত– কেননা এই গ্রন্থটির নাম সে সময়ের ষাট-সত্তর  দশকের অনেক কবির মুখে মুখেই শুনেছি। গ্রুপ সেঞ্চুরির মুখপত্র ‘ধ্বনিপ্রান্তর’-এ বইটি নিয়ে আলোচনা লিখেছিলেন কবি কল্যাণব্রত চক্রবর্তী। গ্রুপ সেঞ্চুরি ম্যুভমেন্টের শুরুর মুখে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটিতে যেন ধরা পড়েছে কবি নকুল রায়ের ভেতরের বজ্র ও বিদ্যুৎ। বলাবাহুল্য এই গ্রন্থে নকুল রায়ের স্বর আরও পরিণত ও শানিত হয়ে উঠেছে। কবিতাগুলির দিকে তাকালেই দেখা যাবে কবিতার লাইনগুলি আরো প্রশস্ত হয়েছে। কবি বলছেন প্রচুর। অনেক কথা। পুঞ্জীভূত কথা যেন বিস্ফারিত হয়েছে এই পর্যায়ে। এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতাই তার টগবগে তারুণ্যকে ধারণ করে আছে। দেখা যাক ‘ধারাপতনের কোলাহল’ কবিতাটি।


‘লঙ্গরখানায় এক ডেকচি ভাত-অসামান্যতার দিকে ঝুঁকে পড়েছে একলক্ষ চোখ,

দশ বছর কি আরো পরে,

এর থেকেই সিঁদকাটা এক চোরের ছেলে হয়েছে অধ্যাপক, আমি তার ছেলেমেয়ের শিক্ষক, আমার বাপ ছিলো

মাঝিমাল্লা দেশের ডাকহরকরা, তেপান্তরের রঙিন কিশোর সব হারিয়ে

আজ পেয়েছে সে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

ফ্যান খাইয়ে মা পাঠিয়েছিল পাঠশালায়

তারপর 'ঠান্ডা মাথায় রেগে' যেতে যেতে এক সময় ধানকলে আমি ধান ছাড়িয়ে চাল হলাম’

           নাতিদীর্ঘ সমগ্র কবিতাটি নিয়ে আলোচনা করা এখানে সম্ভব নয়। তবুও কিছু জিনিস উল্লেখ করার মতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষিতে আমাদের দেশে স্থানে স্থানে খোলা হয়েছিল লঙ্গরখানা। সেখানে ক্ষুধার্ত লক্ষ লক্ষ লোকেরা খাবারের জন্য লাইন দিত। আমরা কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুকান্ত ভট্টাচার্য, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সেই সময়ের বহু কবির কবিতায় তার সার্থক প্রমাণ পাই। জাস্ট ওই একটি শব্দে ‘ধারাপতনে’র সূচনাটি কৌশলী হয়ে দেখিয়ে দিলেন কবি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর দেশভাগ, অভাব-অনটন-দারিদ্র্য ইত্যাদি অভিশাপের মত দেশের জনগণের মূল্যমানকে অধঃপতনের চূড়ান্ত জায়গায় নামিয়ে এনেছিল। চারিত্রিক স্খলন ছাড়া কোন চরিত্র নেই। আদর্শ একটা মিথ্যা কল্পনার নাম। কবি মূলত শিকড়ে যেতে চাইলেন। এখানে প্রথম লাইনে অদ্ভুত এক দৃশ্যের সূচনা করেছেন কবি। একটা ভাতের ডেকচি মাঝখানে, আর চারদিক ঘিরে আছে অসংখ্য ক্ষুধার্ত মানুষেরা। যারা ক্ষুধার্ত, হাভাতে তাদের থেকে একজন হল সিঁদকাটা চোর। সেই চোরের ছেলে হয়েছে অধ্যাপক। সুতরাং ধারাপতনে অর্থাৎ শিকড়ের সন্ধান করতে গিয়ে কবি  জেনারেশনের কথা বলছেন। ক্ষুধার্ত, চোর এবং অধ্যাপক। আর অন্যদিকে সমান্তরাল ভাবে আরেকটি শ্রেণিচরিত্র ফুটে উঠেছে, সেখানে ধারাপতনের আরেকটি ছবি ধরা পড়েছে। মাঝেমাল্লার দেশের ডাকহরকরা থেকে শিক্ষক। অধ্যাপকের বাবা যেখানে পরের বাড়িতে চুরি করে সংসার সাজিয়েছেন সেখানে শিক্ষকের বাবা চক্রান্তের শিকার হয়ে জেলে গেছেন, আর মা কষ্ট করে ফ্যান খাইয়ে তাকে বড় করে তুলেছেন। এখন অধ্যাপক ও শিক্ষক এই যে দুটি শ্রেণী চরিত্র ফুটে উঠেছে তার টানাপোড়েন কবিতাটি। শিক্ষক এবং অধ্যাপকই রাষ্ট্রের কারিগর। আমরা লক্ষ্য করি ধারাপতনের দুই রকম অভিযাত্রা। ১] ফুটন্ত ভাত— ক্ষুধার্ত লোক— সিঁদকাটা চোর—  অধ্যাপক আবার অন্যদিকে, ২] মাঝি মাল্লার দেশের ডাক হরকরা— জেলের অপরাধী— শিক্ষক— ভাতের ফ্যান— চাল— ভাত।

             ভাতের জন্য সংকটের মুখে এক জেনারেশন চুরি-ডাকাতি করে সমাজের শীর্ষস্থানে উঠে যায়, অন্যদিকে আবার আরেক শ্রেণি খোলা মাঠের তেপান্তরের মুক্তি পেরিয়ে নিজেই কয়েক জেনারেশন পর ভাত বনে যায় বা ধনিক শ্রেণীর খাদ্যে রূপান্তরিত হয়। আমরা লক্ষ করলাম নকুল রায় ধনী-গরিব উচ্চ-নীচ ইত্যাদি দ্বন্দ্ব কিংবা বাইনারি ফুটিয়ে তুলতে চাননি। কবিতাটিতে সমাজের ভেতরে ভেতরে যে পর্যায়ক্রমিক শ্রেণী চরিত্রের রূপান্তর ঘটছে, এবং ব্যক্তি আদর্শের স্খলন ও সংকট ফুটে উঠেছে তা-ই প্রতিপাদ্য করতে চেয়েছেন।

              এছাড়া কবিতাটি পাঠ করলেই বুঝা যায়, কবি এই পর্যায়ে আরও সরাসরি আরও স্পষ্টভাবে কথা বলছেন। চিহ্নিত করছেন সমাজের রোগ। আক্রমণ করছেন। ‘ঘোড়া’ কবিতাটির মত এখানে কোনও আড়াল বা প্রতীকের আশ্রয় নিচ্ছেন না কবি, সোজাসুজি দায়ী করছেন সমাজের বিশেষ শ্রেণি বা চরিত্রকে। বক্তব্যমুখর হয়ে উঠছেন। 

           তবে বক্তব্যমুখর হলেও কোথাও কোথাও ফুটে উঠেছে অদ্ভুত সব চিত্রকল্প। যেমন আলোচ্য কবিতাটিতেই আছে–


‘একটি পিঁপড়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছে চোখের মণি, ভাত

দাঁড়িয়ে দেখলাম, সাঁজোয়া বাহিনীর সঙ্গে এক শাদা ট্যাঙ্ক কুরুক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে’

             একটি ভাতের সঙ্গে ট্যাঙ্কের সাযুজ্য ঘটানো বা উপমার প্রয়োগ নিশ্চিত অভিনব। সঙ্গে সঙ্গে এটাও বোঝা যায় যুদ্ধটা আসলে কার বিরুদ্ধে, যোদ্ধাই বা কে।

                আমাদের মনে রাখতে সত্তরের পটভূমি। প্রগতি আন্দোলন তখন বিপুল কদমে দানা বেঁধেছে। আবার ত্রিপুরার প্রেক্ষিতে হাংরি আন্দোলনেরও তুমুল প্রভাব পড়েছে কবিতায়। মলমুত্রকফথুতু থেকে বর্জ্য পদার্থ, গালিগালাজ কবিতায় অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে সংস্কার ছাড়া। শব্দ নির্বাচনে স্বাধীনতা চাইছেন কবিরা। এক সময় ‘পাঁজরের এন্টেনা’ নামে একটি সিরিজ কবিতার বই প্রকাশ করেছেন নকুল রায়। অনিবার্যভাবে এই কবিতা গ্রন্থটির ভেতরেও নকুল রায়ের হৃদয়ের বোমা ও কার্তুজ। প্রতিটি লাইন সেখানে বিস্ফোরক। 

         প্রসঙ্গত আলোচ্য তিনটি কাব্যগ্রন্থের নামের দিকেও একবার তাকানো যেতে পারে। ‘হৃদপিণ্ডের হাট’, ‘শব্দশৈল্য ও শানিত দীপমল্লিকা’ এবং ‘পাঁজরের এন্টেনা’– তিনটি নামের মধ্যেই যে গতি, যে জোর ফুটে উঠেছে তা স্মরণে রাখার মত। পাঁজরের এন্টেনার কবিতাগুলির নাম দেওয়া হয়নি। প্রতিটি কবিতাকে একটি সংখ্যা করে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার নাম দেওয়াও যেত না, কারণ প্রতিটি কবিতায় একই সুর, একই মোটিফ ধরতে চেয়েছেন কবি। এ যেন একটি দীর্ঘ কবিতার অংশ, সবগুলি মিলে একটাই কবিতা। আমরা গ্রন্থটি থেকে নিচের ১৩ সংখ্যক কবিতাটির দিকে একবার তাকাতে পারি। 


‘ছায়াগীতের আসরে আছি চুপ, কায়ার পেছনে মায়ার ছদ্মবেশে থাকি, 

অনাথ যুদ্ধ ও মায়ের বুকের দুধ মিলেমিশে দেহমজ্জার নদী, সূর্যের পরমাণু

গ্রহণ করেছি শিবির পাহারা দেব বলে, মেঘকে ফাটিয়ে দিয়েছি ক্ষয়ক্ষয়ে চাঁদে-

আমার অশ্রু কৌটোতে ভরে রাখবে দীনভিখিরি,-শুধু একবার বলুক সে 'শুয়োরের বাচ্চা’

            প্রলম্বিত পংক্তি। যতিচিহ্নে নির্ভার কবিতাগুলির প্রবণতাই হচ্ছে, একটি পংক্তির ভেতর আরেকটি পংক্তির উদ্ভাসন। কোনো একটি চিন্তন সমাপ্তির দিকে পৌঁছবার আগেই আরেকটি পংক্তির পদক্ষেপ। এই যে অবিরত সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া, অবিরল কথার ধারা, এই প্রবণতাই পাঁজরের এন্টেনার সম্পদ। নিরীক্ষাধর্মী এই কবিতাগুলিতে কবির ঋজু উচ্চারণ ও আত্মবিশ্বাস দেখবার মত। শেষ লাইনে ‘শুয়োরের বাচ্চা’ বলে গালি দেবার মধ্য দিয়ে শব্দনির্বাচনে তার সংস্কারহীনতার প্রমাণ মেলে। তবে এই বইটির কবিতাগুলি নিবিড় পাঠে বাস্তবতার বাইরে কোথাও যাবার ইচ্ছা টের পাওয়া যায়। বস্তুর ভেতরে অতিবস্তু, বাস্তবতার ভেতরে অতিবাস্তব। কবিতাগ্রন্থটিতে সংকটকে যেন আরো কাছ থেকে দেখা গেল। প্রথম পংক্তিতেই ছায়াগীতের আসরে বসার ব্যাপারটিই, একটি মূল্যহীন অস্তিত্বের কথা বলে। ‘ছায়াগীত’ অর্থাৎ মূলগীত নয়। সুতরাং মায়ার ছদ্মবেশ। ‘অনাথ যুদ্ধ ও মায়ের বুকের দুধ’ নিশ্চিতভাবে সমাজে ফেলে দেওয়া সন্তানের কথা, জারজ সন্তানের কথা মনে করায়। শিবির পাহারা দেবার জন্য তবে জন্ম! সূর্যের পরমাণু গ্রহণ করা! যে জীবনের কথা বলা হচ্ছে, কৌটোতে অশ্রবিন্দু ধরে রাখলেও ‘শুয়োরের বাচ্চা’ ছাড়া কিছু আর তাদের ডাকা হয় না। কবিতাটার ট্যুইস্ট ঐ শেষ লাইনে। যেন কথক শুয়োরের বাচ্চা গালিটি শোনার জন্য অপেক্ষা করছে। এ নিয়ে তার যন্ত্রণা নেই বা সম্মানহানি হয় না। এ-ই যেন বাস্তব। বাস্তবতার বাস্তব। 

        কবি নকুল রায় সারাজীবনই বিদ্রোহী। তার কবিতা সমাজের ত্রুটি নিয়ে কথা বলতে চেয়েছে। আদর্শ ভ্রষ্টতা অন্যায়, অসাম্য নিয়ে চিন্তিত থেকেছে। তার স্বর চড়া। তিনি আজীবন প্রতিবাদী। চেয়েছেন কবিতাকে অস্ত্র করে তুলতে। তার কবিতা সবসময় এক বিশেষ ইডিওলজিকে তুলে ধরতে চেয়েছে। সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা তথা প্রগতিশীল চেতনা তার কবিতার মূল সুর। গ্রুপ সেঞ্চুরির মাধ্যমে যে সাংস্কৃতিক বিপ্লব করতে চেয়েছিলেন কবিরা, তার একটা বিষয় রুচির পরিবর্তন। মনে হয়েছিল, রুচি না বদলালে রুটি পাওয়া যাবে না। বিপ্লবের পথ সবার নয়। সবার দ্বারা তা সম্ভবও নয়। ১৯৯৯ সালে বেরিয়েছে তার কবিতাগ্রন্থ, ‘রক্ত দিয়েছি, এবার ভাত দে হারামজাদা’। তার সাত-আটের দশকের কবিতাগুলি পাঠ করলে যে বিপ্লবের স্বপ্ন খুঁজে পাওয়া যায়, এই পর্যায়ে তার স্বর ভিন্ন। যেন কোথাও একটা নিগোসিয়েশন, কোথাও রিয়েলাইজেশন কাজ করেছে। এক ধরণের আত্মোপলব্ধি। বাংলাদেশের কবি রফিক আজাদের একটি বিখ্যাত কবিতা আছে, ‘ভাত দে হারামজাদা’। প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। বাংশাদেশ স্বাধীন হলে পর দেশে খাদ্য সংকট দেখা দেয়। দুর্নীতিই ছিল এর মূল কারণ। নকুল রায়ের কবিতাগ্রন্থের নামের মধ্যে সরাসরি রফিক আজাদের কাব্যগ্রন্থের ইঙ্গিত মেলে। আসলে ততদিনে কালোবাজারি দুর্নীতিতে ভারতবর্ষের অবস্থাও সংকটজনক। খাদ্য থেকে শিল্প সর্বত্র এক হাল। এই পরিস্থিতিতে তার কবিতায়ও এসেছে সেই প্রভাব। নিচের ‘ধস ও চিত্রকল্প’ কবিতাটি পাঠ করা যাক।


না, এখন এই সমস্ত ঘরের কোনোদিকেই 

রোদ কিংবা বসন্ত নেই 

হাতের ভেতরে যে-স্বপ্ন লেখা থাকে 

তেমন জ্যোতিষবিদ্যা জানা নেই 

বাইরে খড়ের গাদায় বন্দুক রেখে 

যে-কজন অতিমানব মাতিয়ে গেল পাড়া 

তারাও কিছু বলতে পারেনি

             তোমার পরিচিতি শুধু 

             তোমার ঘর নয়, স্বদেশও

দাঙ্গার ভয়ে যে-নিশির ডাক ভুলে 

গেছলাম আমরা, 

আজ, এই একটু আগে       লন্ডভন্ড 

দোচালা পুকুরের মাছ নারীর চিৎকার

শিশুর দোলনা       শান্ত গ্রামের আগুন

কেউ চায়নি           কোনোদিন

বিপ্লবীর জুতো সবার জন্যে নয়’

                    বক্তব্য পরিষ্কার। শব্দ নয়, ধ্বনি নয়, কবিতার এনাটমি নয়, নন্দনচর্চা নয়, বরং সময়ের ব্যাধিকে চিহ্নিত করাই যেন তার কবিতার উদ্দেশ্য। নিজস্ব বোধ ও বিশ্বাসকে নির্ভর করেই সময়ের বিশ্লেষণ করেছেন কবি। আপাত শান্ত বিরোধহীন  মধ্যবিত্ত জীবনের খাপখাইয়ে বেঅঁচে থাকার চিত্র ফুটে উঠেছে সমস্ত কবিতাটিতে।

          তার কবিতা পাঠ করতে করতে এক সময় মনে হয় তার ভেতরে কোথাও কি নীতিবোধ কাজ করেছে সর্বদা! একটা আদর্শ সমাজ, একটা স্বপ্নের রাষ্ট্র, একটু সুন্দর শিল্পীত জীবন তার কি কাঙ্ক্ষিত ছিল! সারা জীবন কি সেটাই তিনি খুঁজে বেড়িয়েছেন অথবা নির্মাণ করতে চেয়েছেন তার লেখায়! ফলস্বরূপ ব্যর্থতা, রক্তাক্ত অভিঘাত প্রাপ্তি হয়েছে তার! হৃদয়ে ধারণ করেছেন তা-ই। তা থেকে যেন উত্তরণের কোন পথ তিনি পাননি। দুঃখিত হয়েছেন, ব্যর্থ হয়েছেন, তবু স্বপ্ন দেখা ছাড়েননি। 

           নিচের ‘ভালবাসার জন্য’ কবিতাটি তার ‘কবিতাসমগ্র’র অগ্রন্থিত কবিতা থেকে গৃহীত হয়েছে। পাঠ করা যাক।


‘ভালবাসার জন্য কোন বয়স নেই, 

তুমি কি জানো রোদের মলিন বেলা থেকে 

অদ্ভুত পতন থেকে বেঁচে যায় মানুষ, কীসের জন্য?

ভালোবাসার জন্য কোনো নিয়ম নেই

যে-নিয়মে তুমি এবং আমি বড় হয়েছি

কেউ শিখিয়ে দেয়নি প্রজ্বলিত রোদ কিংবা জ্যোৎস্নার

মুক্তো আমন্ত্রণ

তুমি কি জানো ম্লান রোদেও কীকরে ফুটে ওঠে নীলপদ্ম?’

               উপরের কবিতাটি পাঠ করলেই বূঝা যায়, আসলে তার অন্তর জুড়ে আছে মানুষের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা। আজীবন তিনি মানুষের মুক্তি চেয়েছেন। মানুষের অধঃপতনে দুঃখিত হয়েছেন। দুর্নীতি, ভ্রষ্টতা, অন্যায় তাকে বারবার ক্রোধী করে তুলেছে। মানুষের হাহাকার, আর্তনাদ, গরীব মানুষের সমস্যা, দুর্বৃত্তের লোভ, নষ্টামির বিরুদ্ধে চিরকাল তিনি খড়গহস্ত। তার কবিতা উদ্দেশ্য বর্জিত নয়। তিনি কবিতা লিখে আপামর মানুষের বেঁচে থাকার সান্ত্বনা খুঁজেছেন। তাদের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছেন। বিক্ষুব্ধ হয়েছেন তিনি, তবু মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারাননি। ফ্যান্টাসি, অলীক কল্পনা তার পথ নয়। বাস্তবের সংকট থেকে তিনি তার ভাষা সংগ্রহ করেছেন। জীবনের টানাপোড়েন, অভিঘাত থেকে তার চেতনা নির্মিত হয়েছে। তাই তার উপমার ভাষা, কল্পনার ছবি, মাটিতে পা রেখে কথা বলে। এই সামাজিক বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য তার কবিতাকে হয়তো কোথাও একটা বৃত্তের ভেতর রেখেছে। কোথাও হয়তো কবিতার বিষয় বৈচিত্র্যের বহুগামীতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, কিন্তু শিল্পের জন্য শিল্পচর্চা তার ইপ্সিত বিষয়ই নয়। কাম্যুর মতন তিনিও হয়তো বিশ্বাস করেন, বাস্তবতা ছাড়া শিল্প হয় না আবার শিল্প না থাকলে বাস্তবতা তাৎপর্যহীন হয়ে পড়ে। আসলে তার কাছে লেখা মানেই দ্রোহ। সমকাল থেকে তিনি চোখ সরাতে পারেন না তাই। তার লেখা পাঠ করলে মনে হয়, একা তিনি কথা বলছেন না, একসঙ্গে যেন হাজার মানুষ কথা বলে উঠেছে। এই দায়বদ্ধতা থেকে তিনি কখনোই মুক্তি চাননি। 



@ অভিজিৎ চক্রবর্তী






মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ