পোস্টগুলি

সূর্যোদয় সূর্যাস্ত

ছবি
  চর্যাপদ যেমন বাংলার প্রথম কাব্যগ্রন্থ, তেমনি দিনের শুরুটাকেই চর্যাপদ ভাবা যেতে পারে। আবার চর্যাপদ যেমন আলো আঁধারি, অস্পষ্ট, তেমনি আলো ও অন্ধকারের মিলনে প্রতিটি সকাল ভাবা যায় চর্যাপদ। প্রতিটি বিকেলও তা। যেন এইমাত্র জন্ম হল কবিতার। এইমাত্র শুরু হল দিন বা রাত।  তার ভাষা কুহকভরা। অর্ধেক বুঝা যায়, অর্ধেক না। বাংলা কবিতার মত দিনের শুরু সে। রাতেরও। একটু একটু করে ফুটে ওঠে জবাকুসুমসঙ্কাশ। তার রঙ তার রূপই ফুটে আছে জগতে। অথবা একটু একটু করে রহস্য গাঢ় হচ্ছে তমসার দিকে।           সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত এই দুটি ঘটনা পৃথিবীতে ঘটে চলেছে প্রতিদিন। প্রতিটি দিন চর্যাপদ। প্রতিটি দিন রহস্যভরা। যখন ঘুমে, যখন ঘরে নানা কাজে, সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে, অথবা জটিল কোনো সমস্যায়, কিংবা তুচ্ছ আলাপে ব্যস্ত, ঠিক সে সময় সূর্য নিঃশব্দে তার বিপুল আলোর ভাণ্ডার নিয়ে স্থান বদল করছে। নাকি আমি বদল করছি স্থান। একপাশ থেকে আরেক পাশে চলে যায় আলো। রঙ বদলে যায়। প্রকৃতি বদলে যায়। নতুন প্রতিবেশ। নতুন আবহ। এই অত্যাশ্চর্য ঘটনায় বিস্ময়ের শেষ নেই। যখন ঘুমে থাকি তখনও সেই বিশাল আগুনের ভাঁটা জ্ব...

চাঁদের আঁচল

ছবি
      আজ পূর্ণিমা। অপ্রত্যাশিতভাবে মনে পড়ছে ঠাকুরমা দিদিমার কথা। আমাদের ঠাকুরমা বা দিদিমাদের কথা যখনই মনে পড়ে, মনে হয় এমন আর হবে না। ওরা ছিল লাস্ট জেনারেশন। আমরা মানে যাদের জন্ম আটের দশকে তাদের ঠাকুরমা বাবা দিদিমারা, সে এক আলাদা জেনারেশন। প্রাচীন বাংলার চিহ্ন, নিজস্ব ঘ্রাণ নিয়ে তাদের কাছেই শেষতক বেঁচে ছিল। এরপর পাল্টে গেছে অনেক কিছু। অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি, দেশভাগ থেকে বিশ্বায়ন সব বদলে দিয়েছে। সেই লাল পাড় শাড়ি সেই সাদা রঙের মাহাত্ম্য এখন আর নেই। তারা নিজেদের জন্ম-অঞ্চলটিকে কেমনভাবে স্বভাব, কথা বলার ধরন, স্বর ও সুর, আদব কায়দা, রন্ধনশিল্প, ব্রত, বিয়ে, পুজো থেকে আরো কত না বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে আকড়ে ধরে থাকতেন!                তাদের ছিল অজস্র শ্লোক, কথা, রূপকথা, গল্প, আখ্যান, কাহিনির ভাঁড়ার। আলো আঁধার, বিশ্বাস অবিশ্বাস, স্বপ্ন সংস্কার, বাস্তব অবাস্তব মিলিয়ে এক মায়ার রাজ্য। তাদের ভেতর দিয়ে অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যেত প্রাচীন বাংলায়। সেই জলজঙ্গলের দেশে। হয়তো তার কোনো চিহ্নই তখন নেই। তবু তাদের কথায়, চোখের চাওয়ায় যেন বেঁচেছিল ...

রাত্রির পাহারাদার

ছবি
  পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বিখ্যাত পাগলদের নাম আছে। তালিকাটি নেহাত ছোটো নয়। আকর্ষনীয় তো বটেই। সক্রেটিস থেকে শুরু করে বামাক্ষ্যাপা কে নেই সেই তালিকায়। কবি, দার্শনিক, শিল্পী, ধর্মগুরু। পাগলামি নিয়ে কত বড় বড় তত্ত্ব রয়েছে। মিশেল ফুকো তো তার ইতিহাস লিখেছেন। এর ভেতরে রাষ্ট্র ও সমাজের উদ্দেশ্য, দৃষ্টিভঙ্গি ও ষড়যন্ত্রের সন্ধান করেছেন। এসব বড় বড় চিন্তাকে পাশ কটিয়ে আমাদের ছোটো ছোটো শহরগুলিতে আছে অনেক অখ্যাত পাগল। যাদের সবাই চেনে, ভালোবাসে। শহরের পরিচয় যেন ওরা। কোথাও যেন মায়ায় ঘেরা। যখন থাকে এরা, কত গুরুত্ব নিয়েই থাকে। কবে যে হারিয়ে যায়। চেনা দৃশ্য থেকে বাদ পড়ে যায়! কে আর তার হিসেব রাখে! যখন চুপ করে বসি মাঝেমাঝে মনে পড়ে তাদের মুখ। সেই উদভ্রান্ত অনির্দেশ্য অনির্ণেয় চাহনি             ছোটোবেলায় তাদের রাস্তার ধারে, দিঘির পাড়ে, বাজারে, দোকানের বারান্দায় খিল খিল হাসতে হাসতে চিৎকার দিতে দিতে অথবা নীরবে হেঁটে যেতে দেখেছি। কই এরা এখন! তাদের নানা জনের নানা নাম। শহরের সবাই সে নামেই তাদের চেনে, ডাকে। তারা ছিল পরিচিত জন। শহর বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে কোথায় যেন...

গঙ্গা নামক জ্বিন

ছবি
  চোখ বুজলেই আপাতত যে ছবিটি ভেসে ওঠে, আমরা বলতাম 'গঙ্গার বাড়ি'। লোকালয় ছাড়িয়ে যেতে যেতে হঠাৎ বনের মধ্যে। দুটি মাত্র কাদা লেপা ঘর। লম্বাটে ঘরটি হয়তো থাকার। এক পাশেই শেষেরটি রান্নার। উপরে মাটিতে মিশে যেতে উদগ্রীব ধূসর রঙের ঝুঁকে থাকা ছনের চালা। ছোটো দাওয়া। স্থানে স্থানে বৃষ্টির জলে ক্ষয়ে ভেতরের কাঁকর মেশা লাল মাটি বেরিয়ে এসেছে। দাওয়ার এক পাশে বাঁধা দুটি ছাগল। অন্যপাশে তেল চিক্ চিক্ হলুদ বাঁশের খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বসা গঙ্গা। বলা ভালো, 'গঙ্গা' কোনো স্ত্রী-বাচক শব্দ নয় এখানে। 'গঙ্গা' একজন পুরুষের নাম। মূল নামটি গঙ্গারাম বা গঙ্গাপদ বা গঙ্গাচরণ বা গঙ্গেশ যা-ই থাকুক না কেন তিনি প্রচারিত শুধু 'গঙ্গা' নামেই।             চারদিকে হামলে পড়া গভীর জঙ্গল। লুটকি থেকে শুরু করে নানা অজানা বুনো গাছের ঝোঁপ, রিফিউজি লতা, হলুদ, আদা, শটি। আছে বড় বড় গাছ– গর্জন, গামাই, চাম কাঁঠাল, পিচণ্ডি, জারুল, আগর, শিমুল, লুকলুকি আর লক্ষ্মী আম– এক সঙ্গে দু তিনটি আঁটি মুখে নিয়ে চোষা যায়। এদিকেই পথ। ঘরের সামনে দিয়ে। উঠোন নেই। জঙ্গলে মিশে থাকা সীমাহীন বাড়িটিতে গোড়ালি ডুবে যাওয়া...

নির্জন মাটির কলসী

ছবি
  নীরবতার ধ্বনি আছে। নির্জনতারও আছে জন। কোনো একটি শব্দ নিস্তব্ধতাকে প্রকট করে তোলে। বিশাল ক্যানভাসে এক জন লোকের উপস্থিতি নির্জনতাকেও করে প্রগাঢ়।              ভাবি, নীরবতার চরিত্র পাল্টে গেছে নাকি! আট-নয়ের দশকের নিবিড় অলস দিনপ্রবাহ কি এখন আছে! কত কিছুই তো পাল্টে গেছে। একাকী অখণ্ড অবসরে হাতে এসে গেছে জাদুযন্ত্র মোবাইল। সে কথা বলে সারাক্ষণ। চিৎকার করে। সর্বদা বলে, এখানে কিছু লিখুন। রীল বানান, ভিডিও করুন। সে নীরব হতে শেখায় না। চুপ করতে দেয় না। সব সময় সে কিছু বলে। কিছু করে। গান শোনায়। না হলে অন্তত ম্যাসেজ আগমনের শব্দ তোলে।                 ছবিটি এখনো চোখে ভাসে। ঝা ঝা রোদ্দুরে আশপাশ যেন মিইয়ে গেছে। কোথাও ঝি ঝি ডাকে একটানা। ঘরের ভেতর ঘুণপোকার কিট কিট শব্দ। ঘু ঘু ডাকছে পাশেই কোনো এক গাছের ডালে বসে। প্রকৃতির এসব শব্দ কেমন যেন প্রকৃতির সঙ্গেই মিশে থাকে। বাড়তি মনে হয় না। অথচ মানুষের নানা কাজ, চিৎকার খাপ খায় না। রাস্তায় বেরোলে দেখা যায় মোড়ে রিকশাওলা হুড টেনে দিয়েছে ঘুম। দীর্ঘ বিটুমিনঢালা পথ একা। কেউ ন...

গাছের মেঘ, মেঘের পাখি

ছবি
  গাছের সঙ্গে থাকে পাখি। পাখির সঙ্গে মেঘ। মেঘের সঙ্গে থাকে ছায়া। একদিন ছায়া বড় হয়। ক্ষেত খামার নদী বন লোকালয়, সমস্ত জনপদ ঢেকে যায়। নামে বৃষ্টি। দিনভর রাতভর অবিরাম বৃষ্টি। মনে হয় কোনো নাম নেই, ঠিকানা নেই। বৃষ্টির জলের মতন আমরা সবাই গৃহহারা, উদ্দেশ্যহারা। ঝরে গেলেই সার্থক জীবন। গাছ ভেজে। পাখি উড়ে যায় না। কেবল উঁচু ডালে বসে বসে ভেজে।              বাঁশের ঘর। বরফি কাটা জানালায় বসে আছি। আমার সমুখে কালো টেবিল। টেবিলে খোলা রুলটানা খাতা। কিছু কি লিখছি! গভীর মেঘের ছায়ায় আচ্ছন্ন দিন। অবিশ্রাম ধারাপাতে ক্লান্ত অবসন্ন দিন। এখন সকাল না দুপুর, কে জানে! জানালা দিয়ে দেখা যায় কালো পুকুর। চারদিক ঘিরে অনেক রকম গাছ। পুবদিকে সুপুরি, লুটকি,বেত ও ডুমুর গাছের জঙ্গল, উত্তরে আম, কাঁঠাল, নারিকেল, লুকলুকি ও কচু বনের বিস্তার, পশ্চিমে বড়ই, জাম, কামরাঙা আর বাঁশবনের দুর্ভেদ্য মায়াজাল। যেন অরণ্য। বৃষ্টি পড়ছে। কোথাও একটুকু ফাঁক নেই। সমস্ত পৃথিবী জুড়েই যেন বৃষ্টি। এমন একটানা বৃষ্টি দেখলে নির্জন মৌনী তপস্বীর মত মনে হয়। যেন বাইরে চোখ বুজে বসেছেন ধ্যানে। আর কোনও প্রব...

সেই জোছনা-ধুতি

ছবি
এখন রাত বারোটা। পৌষ মাস। দূরে কোথাও কীর্তন শোনা যাচ্ছে। আমার সামনে সাদা পৃষ্ঠা। বাইরে অপ্রাকৃত জোছনা। বাইরে নিবিড় কুয়াশা। বাঁশির সুরেলা ঢেউ ক্ষেত খামার কাঁপিয়ে, বড় রাস্তা পার হয়ে সুপুরি নারকেল গাছের আঁকাবাঁকা পথ অতিক্রম করে নির্জন গলির এই ঘরে প্রবেশ করছে। অপার্থিব। চেনা জগত অচেনা হয়ে যায়। সাদা কাগজের দিকে তাকাতে তাকাতে মনে হয়, অনন্ত শূন্যতার মাঝে অজস্র রেখার কারিকুরি। সাদা কাগজের রঙ যেন সব জোছনার। তার ভেতর দিয়ে তাকানো যেন, জোছনার ভেতর দিয়েই তাকানো।         এমনই সাদা রঙ ছিল দাদুর। জোছনার মত। যেন প্রান্তর থেকে উঠে আসা। তার ধুতি- ধবে ধবে। পৌষ এলে কীর্তনে চলে যেতেন। ক'দিন পরে জোছনা-ধুতি হয়ে যেত হলদে। যখন ফিরতেন, দেহে ক্লান্তি, মুখে সজল শ্যামল ভাব। হাসি। জোছনারই যেন সে হাসি। মনে হত জোছনার সন্তান যেন। পৌর্ণমাসি রাতে কৃষ্ণ এসেছেন পেছন পেছন এগিয়ে দিতে। গুলঞ্চ গাছের তলা দিয়ে সেই পথ।           এখন আর সে ধুতি নেই। ঝটপট বদলে গেল সব। সে এক সময় ছিল। একটা ক্লাস তখনও পরত ধুতি। বিশেষ করে গাঁও-গঞ্জ থেকে উঠে আসা দাদু শ্রেণিটি। হাটে বাজারে পথ ...

গোধূলির সোয়েটার

ছবি
   ছোটোবেলায় গোধূলি ছিল। আজকের মতই হয়তো। তবু ভাবি, আজকের গোধূলি আর তিরিশ পয়ত্রিশ বছর আগের গোধূলি কি এক? কোনো বদল হয়নি তার? শরৎ পেরিয়ে এসেছি। শীত আসন্ন। আমি দুপুরে খেয়েদেয়ে ঘুমের সঙ্গে বাধ্য হয়ে ডুয়েল লড়ছি। পশ্চিমের বেড়ার উপরের দিকে ছনের চালার নিচে বাঁশ পুরনো হয়ে আরো বড় ফাঁকের সৃষ্টি হয়েছে।  সেদিকে দিয়ে আলো এসে পড়ছে আমাদের ঘরের মাটির মেঝেতে। মেঝেতে মায়ের নানা কারুকাজ। সুপুরির খোল কেটে নানা রকমের ডিজাইন করে কাদামাটি দিয়ে ঘর লেপার সময় মা সমস্ত মেঝেটিকে সাজিয়েছেন। কোথাও জলের ঢেউ। কোথাও মাছের ঝাঁক, কোথাও লতা, ফুল, পাতা, কোথাও ধানের শীষ। সবই অস্পষ্ট। হাল্কা ছাপ। শুকিয়ে সেগুলো যেন আরো অস্পষ্ট। এখন এক পাশ থেকে আলো পড়ায় সেই গোপন ছবিগুলি তার সমূহ জগৎ নিয়ে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এমন আশ্চর্য তো আগে দেখিনি। তাকাতে তাকাতে তন্ময় কিশোরের মুখে পড়ছে আলো। তার বিছানার প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে নানা আকারের আলোর টুকরো। টুকরোগুলো আরো হলুদ হতে হতে এখন কমলা রঙ। কাঁপছে। পশ্চিমের নারিকেল গাছের ঝালর টুকরোগুলোকে সজীব করে তুলেছে।              বাই...

দালির ঘড়ি

ছবি
  দালির ঘড়ির ছবিটি দেখছি এখন। সময় গলে পড়ছে। হ্যাঁ, এ সময় আমার সময়। গলে গলে যে পড়ল নিচে এই মুহূর্তে, সে ছবিটিতে সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টার কাঁটা সবই আছে, কেবল কোনো সংখ্যা নেই। দিন না রাত এখন! এই কমলা আকাশ, ধূসরাভ বাদামি ভূমি, সে কি সন্ধ্যা! মনে হয় অলৌকিক সব। কোনো নির্দিষ্টে বিশ্বাস রাখা যাচ্ছে না। কোনো ফ্রেমে না। কোনো টেক্সটে না। অথচ সে সময়টিতে প্রবেশের মুহূর্তটি কেমন ছিল! বাজার তখনও খায়নি মাথা। মানে আমরা তখন সে দৌবারিকের মুখোমুখি। যদিও সমস্ত বিশ্বে বাজার তখন মধ্যগগনে। সোভিয়েত ফল করবে। আমাদের স্টেটেও মার্ক্সবাদী দল। তবু ভেতরে তখনো সংস্কার। বিশ্বাস। কিংবা বলা যায়, এটাই বৈশিষ্ট্য। ইতিহাস যে মরে গেছে, অথবা ইতিহাস যে এমনই, সে বোধ তখনো আসেনি। সুতরাং টেক্সট তখনো মান্য। ঘটনার বহুস্বরিক ও বহুস্তরিক ব্যাখ্যার উপর ভাসমান ছবিটি তখনো মান্য। দালির ঘড়ির গলনশীল চেহারাটি পশ্চিম দুনিয়া ও মেট্রো শহরে বুঝা গেলেও, আমাদের কাছে আরোপিত। দিন চলে ঢিমে তালে। তখনও মূল্যবোধ ধুলোয় মিশে যায়নি। মানে স্মৃতিতে কারো কারো রয়ে গেছে। মাটিতে নিকানো ঘর দাওয়াগুলো মনোহর– এটা একটু হেঁটে গেলেই কোথাও না কোথাও দেখ...

তেরা কেয়া হোগা রে কালিয়া

ছবি
  খেয়াল করলে দেখা যাবে শ’ দেড়শো বছরের কোনো পুরানো বাড়ি নেই। ইতিহাস কি কেবল ইট-কাঠ-পাথরে! ইতিহাস তো থাকতে পারে পুকুরেও। পুষ্কুনি মানে পুষ্করিণীতেও। নামটির মধ্যেই রয়েছে সৌন্দর্য। কেমন নববধূর কাঁকন পরা হাতের বালা চুড়ির ঠিন ঠিন ধ্বনি। নদী নেই তো কী হল, সবার বাড়িতেই আছে কাকচক্ষুর মত কালো আম-কাঁঠাল-জাম আর সুপারি-নারকেল-পিচণ্ডি-গুলঞ্চ-ভাঁট ফুল ঘেরা নিবিড় পুকুর। এটা তার মানস গঠনে কতটুকু অবদান রেখেছে বিচার করা যেতে পারে।             তো বাড়ি বলতে তো শুধু ইট-পাথর-সিমেন্টের নয়। মানে কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তি বা রাজা মহারাজা এ মাটিতে না জন্মালেও ছিল সাধারণেরা। ছিল ঘাট। পিচ্ছিল। শ্যাওলাকালো। বাঁশবন, আদা-হলুদ বন। বাড়ির বউ বাঁ হাতের চেটোয় এঁটো বাসন নিয়ে এলেন অথবা শীতের দুপুরে কেউ তেলটেল মেখে ঝুপ্পুস। বিকালে বড়শি। ধ্যানী বক। বালিহাঁস উড়ে যায়। হু হু করা হলুদ মাঠ। রাস্তায় রাস্তায় গাছ। কোথাও ভঙ্গি তুলে নাচের মুদ্রায়, কোথাও উদাসী বাউল। সেই দুপুরে 'হরি বোল হরি বোল' বলে বৈরাগী এসে দাঁড়ালেন। বড় রেড কাউয়ের বা এঙ্করের গুঁড়া দুধের ডিবির মুখে করে চাল এগিয়ে দ...

নৌকা

ছবি
  বুঝতে পারছি না কিছুই। হঠাৎই বন্ধ কোনো ঘরে ঢুকে পড়লে যা হয়। কথাটি বলেছিলাম, যদিও মনে আমার ঘরের কথা নেই। ভেতরে নদীর কথা। এখন নদী বলতে কার মনে কেমন জানি না। গঙ্গা পদ্মা যমুনা বা ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী কারো মনে যে বিস্তার থাকা স্বাভাবিক, এখানে থেকে সেই ছবি ভেঙে যেতেই পারে।              জুরি নামক আপাত ছড়াসম জলপ্রবাহকেই আমরা নদী বলে বিশ্বাস করি। দুই ধার উঁচু তার, তবে পাড় ঢালু নয়। মাত্র সে পাহাড় থেকে নেমেছে। সারা বছরই শীতের শীর্ণতা, কেবল বর্ষা এলে ওনার যত হম্বিতম্বি। মা তো কথায় কথায় বলে এইট্টি ফোরের ফ্লাড। আমার বড় মামা আমাকে মাথায় করে গলাজল হেঁটে পার করেছিলেন। আমিও অবশ্য নদীর রাগ দেখেছি। স্মৃতিতে আছে এক রাত্রির কথা। টু বা থ্রিতে পড়ি। রাত্রি কত ঠিক জানি না। মায়ের ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে দেখি হুড়মুড় করে ঘরে জল ঢুকছে। মুহূর্তেই বিছানার পায়া জলে ডুবে গেছে। সবার ভয় করলেও, আমার অবুঝ মনে বেশ ছিল আনন্দ। মাতৃ আদেশে বিছানাতেই কাটিয়েছি। পরদিন সকালে একটা বড় বাঁওশ মাছ ও একটা সুদৃশ্য প্লাস্টিকের কৌটা উপহার দিয়ে জল নেমে গেল দুপুর থাকতেই।    ...

হারানো স্কুটার

ছবি
 দু'টি বাঁশের চোঙা। বাদামী রঙের তেল চিক চিক। একটা মোটা, একটা সরু। একটা চুলার মুখে, অন্যটি উপরে ডেকচি বসানোর জায়গায় ৪৫° এঙ্গেলে বসিয়ে কাঠের গুঁড়ো দিয়ে ভালো মতন জাঁক দিয়ে তারপর ধীরে আলগা করে বের করে আনা হত চোঙা। একটু এদিক সেদিক হলে ভেঙে পড়ত জাঁক। কাগজ বা শুকনো বাঁশপাতায় আগুন লাগিয়ে মাঝে ছেড়ে দিলেই ধিকিধিকি ধরত আগুন। এসব জটিল শিল্পকাজ ও রোমাঞ্চকর অভিযানের ভেতর দিয়ে রান্নাপর্ব সমাধা করতেন মা। কাঠের গুঁড়ো আনা হতো বস্তা দিয়ে কেবিনেট থেকে। পেছনে ডাঁই করা থাকত। করাতের গুঁড়ো। মায়ের সঙ্গে আমিও। ছোট হাতে যতটা সম্ভব। কাঠের গুঁড়ো ছাড়া আরেকটা ছিল 'রান্দার চেলি' বলতাম অর্থাৎ কাঠ পালিশ করার জন্য র‍্যাঁদা দিয়ে ঘষলে কাঠ থেকে যেটা বের হয়। ঘরের ভেতর শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ‘মনসামঙ্গল’ কবিতার সাতনরি শিকা। আমরা বলি ছিক্কা। রান্নাঘরে বিদ্যুৎ ছিল না। কুপিবাতি। সে যেন আলতামিরার পরিবেশ। বড় ঘর বলতাম যেটাকে– মূলত রান্নাঘর ছাড়া একটাই ঘর, তার জানালা বলতে বেড়ার গায়ে বরফি কাটা। বাঁশ দিয়ে ঠেলে উপরের দিকে তার ডালা উঠিয়ে দিলে খুলে যেত। দূরে কালো জল পুকুর। বাঁদিকে বাঁশবন, পিচণ্ডি, লুটকি, ...