অক্ষরের ঘর
যদি বলি অক্ষরের ঘর, ভুল হবে! চারদিকে লেখা লেখা আর লেখা। বর্ণমালায় ঘেরা সেই ঘরখানি যেন ইতিহাসের জন্মাবার আগের। তখন টি ভি ছিল গুটিকয় বাড়িতে। তবে কাগজ বা পত্রিকা পড়তে দেখেছি সবাইকে হুমড়ি খেয়ে। হয়তো একটা অক্ষরও বাদ যেত না। আগরতলা থেকে কাগজ আসত রাত্রি সাতটা- আটটায়। কখনও বা পরের দিন। সেটাই কত আগ্রহভরে লোকে পড়ত। উল্টেপাল্টে পড়ত। পাবলিক লাইব্রেরি, তথ্য সংস্কৃতি অফিসে, চায়ের স্টলে, সেলুনে, দোকানে-বাজারে কাগজ পড়ার ধুম দেখেছি। রীতিমত চর্চা মানে তর্ক হতো। হাতি মরলেও লাখ টাকা। পুরানো কাগজেরও ছিল দাম অনেক। সে এক দিন ছিল। মানুষের হাতে অঢেল সময়। রয়েসয়ে যেত দিন।
থাকতাম ছন বাঁশের ঘরে। আমি বলতাম কাগজের ঘর। কাগজের ঘর বললে যদিও বুঝা যায় না। বাঁশের বেড়ার উপর ময়দা দিয়ে পত্রিকার কাগজ সাঁটা। চারদিকে কাগজ লাগানো। এ কাজ মায়েরই। অনেক বার আমিও যে কাগজ সাঁটিনি, তা নয়। ত্যাদাড়া বেড়া। ত্যাদাড়া কথাটি কি ত্রিধারা থেকে এসেছে! জানি না। তবে এই ধরনের বাঁশের বেড়া তৈরিতে তিন দিক থেকে বাঁশের বেড়া এসে একজায়গায় মিশত। 'মিশত' এই অতীত বাচক শব্দটি বলছি কারণ এখন আর এই ধরনের বাঁশের বেড়া তৈরি করতে দেখা যায় না। একদিকে দুটি বাঁশের 'তরজা' বা পাত অন্যদিক থেকে আসত আরেকটি। এই ধরনের বাঁশের বেড়া বানাতে দক্ষ লোকজনদের বেশ ছিল নামডাক। পাকা বাঁশে এমনভাবে তারা এটি করতেন, দীর্ঘদিন কিচ্ছু হতো না। তবে শীতকালে কোনো ফাঁক দিয়ে হু হু করে বাতাস ঢুকত। কাগজ লাগানো হত সেজন্যই। অল্প কিছুদিনে বদলে গেছে সব। শহরে বাঁশের ঘর আর নেই। বাঁশের ঐ ধরনের বেড়ার উপর সিমেন্টের প্রলেপ দিয়ে বিশেষ এক ধরনের ঘর ছিল বেশ আভিজাত্যের। সরকারি বিভিন্ন অফিস ছিল এমন।
আর সেসব বাঁশের ঘরে ঝুলত বড় বড় ক্যালেন্ডার। রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি, কৃষ্ণ, গণেশ, শিব, ননী হাতে গোপাল, মহিষাসুরমর্দিনী ছাড়াও অনেক সময় দেখা যেত অর্ধনারীশ্বর, সতীর দেহ কাঁধে করে মহাদেব, পাপকাজ করলে মৃত্যুর পর নরকে কী ধরনের ভয়াবহ শাস্তি হতে পারে কিংবা গরুর শরীরে নানা জায়গার কোথায় কোন দেবতার বাস। এসব ছিল পরম আকর্ষণের। পরে আরো আধুনিক হতে থাকে সব। দেবদেবী বাদ দিয়ে প্রকৃতি বা নিসর্গের ছবি, কিংবা মায়ের কোলে হাসি হাসি মুখ শিশু। সবই ছিল আঁকা। শেষে প্রকৃতির ছবি ফটোগ্রাফ তুলে ছাপানো হতে থাকে। প্রায় প্রতিটা দোকানই ক্যালেন্ডার করত। সে ছিল বিজ্ঞাপনের তাগিদে। কোথাকার ক্যালেন্ডার কোথায় যে চলে যেত! আমি গৌহাটির ক্যালেন্ডার যেমন এই শহরে দেখেছি, তেমনি ধর্মনগরের কোনো এক দোকানের ক্যালেন্ডার দেখেছি মেলাঘরে। ঘর সাজানোর জন্য সেগুলি সংগ্রহেও ছিল বিশেষ আকর্ষণ। বাঁধা খরিদ্দাররা তো পেতেন। যারা বছরশেষের হালখাতার টাকা পুরো দেয়নি, দোকানীও যেন ক্যালেন্ডার দিতে চাইতেন না। সুতরাং বাঁশের ঘরে পত্রিকার কাগজ লাগানোর দৃশ্য বা হাওয়ায় ফরফর করে কাঁপতে থাকা ক্যালেন্ডারের পাতা সেসময় দুর্লভ ছিল না। এখন বিভিন্ন দোকানদারের হাত থেকে ক্যালেন্ডার গ্রহণ অনেকটা চাপের। তেমন ঘর কমে এসেছে যেখানে অনেক ক্যালেন্ডার লাগানো যায়। দেওয়ালে একটি কি দুটি লোহা আগে থেকেই গেঁথে রাখা। এছাড়া সবই ডিজিট্যাল হয়ে গেছে।
সেই শৈশবে যখন অক্ষর মাত্র শিখেছি, বেড়ার পত্রিকা, ক্যালেন্ডার ছিল আকর্ষণ। খুব খারাপ লাগত যখন পত্রিকা উল্টো করে লাগানো হতো, পড়তে গেলে মাথা নিচের দিকে অনেকটা শীর্ষাসনের কায়দায় রেখে পড়তে হতো। পড়ার বই ছাড়া এগুলি ছিল বেশ আনন্দের। কত ধরনের তথ্য যে জানা যেত। ছিল ছবি। নানা ধরনের ছবি। মানুষ থেকে বন্যপ্রাণী, গাছগাছালি থেকে সরোবর। বিছানায় উঠলেই সব এসে যেত কাছে। এরপর শুয়ে বসে এসব আবিষ্কার ছিল রোমাঞ্চকর। দৈনিক সংবাদ, দেশের কথা, আনন্দবাজার, বর্তমান, স্টেটসম্যান আরো কতো!
তখন পলিব্যাগ আসেনি। কাগজের ঠোঙার ছিল বিপুল চাহিদা। এক কেজি দু কেজি চাল বাবাকে বড় বড় ঠোঙায় নিয়ে আসতে দেখেছি। বস্তা থেকে সুতো খুলে আলাদা করা হতো। আলাদা করে তাকে ম্যাচবক্স বা কোনো ডিবি বা কাঠ বা বাঁশের টুকরোর মধ্যে প্যাঁচিয়ে রাখা হতো। এরপর এগুলো বাজারে বিক্রি করা হতো।
নিউজিল্যান্ডের থেকে আসত দুধের বড় টিনের কৌটা, রেড কাউ বা এঙ্কর। এগুলো হয়তো বাংলাদেশ হয়ে আসত। ঠিক জানি না। তবে কৌটোগুলোর গায়ে বাংলায় লেখা পড়েছি। এভাবে কৌটোর গায়ে পড়তে পারা ছিল বেশ উৎসাহের। সেসময় কিছুদিন কাগজের ঠোঙা বানিয়েছেন মা। আমিও ছিলাম তার সহযোগী। পত্রিকা দিয়ে যে ঠোঙাগুলো বানানো হতো, সেগুলো ছিল আয়তনে বড়। সাধারণত দু তিন কেজির জিনিস কিনতে এই ধরনের ঠোঙা দেবার চল ছিল। সোভিয়েত রাশিয়ার হয়তো পতন হয়েছে বা হয়নি। আমি ক্লাস ওয়ান না টু ঠিক মনে নেই। গ্লোসি পেপারে সুন্দর করে ছাপা বাংলা পত্রিকাগুলো দেখেছি প্রচুর। 'রাদুগা' প্রকাশনী, মস্কো তাদের গায়ে লেখা থাকতো। এইসব ভারী কাগজগুলো কেটে মা ঠোঙার তলায় লাগাতেন এতে ঠোঙ্গা ছিড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল। ঘরের একপাশে ডাঁই করে রাখা কাগজের ভেতর কত রকম পত্রিকা, পত্রিকার ছবি, ছবির বই যে দেখেছি, এখন মনে পড়ে। কী সুন্দর কাগজ, ছাপা, বাঁধাই, আঁকা। যেকোনো শিশু সেই রূপকথার রাজ্যে হারিয়ে যেতে বাধ্য। কিশোর পাঠ্য সেসব বইগুলোর প্রাপ্তি ছিল হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া সোনার মোহরের মতো। হয়তো তার পাতা ছিঁড়ে গেছে, হয়তো তার ছবি টুকরো হয়ে গেছে, কভার কাটা, তবু এগুলো সঞ্চয়ে ছিল দীর্ঘদিন।
বাংলা ভাষাটি কলকাতা, ত্রিপুরার বাইরে সুদূর মস্কো তথা রাশিয়া বা নিউজিল্যান্ডের কোনো কৌটোর গায়ে ছাপা হতে পারে, সেটাই ছিল ভাবনার বাইরে। সত্যি বলতে কি আমার মায়ের ভাষাটি বহুদূরে মস্কোতে ছাপা হচ্ছে, এই আন্তর্জাতিকতার ভাবনাটি বহুদিন তাড়িত করত। এখন সে আর কোথায়! সোভিয়েত কোথাও নেই। জানিনা 'রাদুগা' প্রকাশনীর কী খবর! সেই টিনের কৌটোগুলি বহুদিন রান্নাঘরের শোভা বৃদ্ধি করতে করতে কালের বাতাসে জং ধরে নষ্ট হয়ে গেছে। সময়ও পাল্টে গেছে। সেসব মানুষেরাও আর নেই। তবু চোখ বুজলে এখনো সত্য মনে হয় সব। সেই অক্ষরের ঘর আমার ছোটবেলার, আমার নিভৃত সময়ের সাক্ষী।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন