বেগুনি রঙের ফুল



শেষ পর্যন্ত ফুলটি ফুটল। ছোট। গাঢ় বেগুনি। পাঁচটি পাপড়ি তার। যেন মখমলের। খুব কাছে গিয়ে তাকালে দেখা যায়, সারা শরীরে রোম। প্রতিটি রোমে এই জীবনের সমস্ত রোমাঞ্চ সে শুষে নিতে চায়। যেন গভীর কোনো ছক। জীবনের বাজি জিতে যাওয়ার নিপুণ কৌশল। মাঝখানে উজ্জ্বল হলুদ এক ফোঁটা। অপূর্ব তার শোভা। দেখি আর অবাক হই। খুশি লাগে খুব। সবুজ ছোট ছোট পাতাগুলোর উপরে ভাসমান সেই ফুল সকালের মৃদু হাওয়ায় দোল খায়। সঙ্গেই ঘুমন্ত আরেকটি কুঁড়ি। তাকিয়ে থাকি। আহা, গাছটি তার বৃক্ষজীবনের সবচেয়ে সেরা কাজ করে ফেলল। এই একটি ফুল ফোটানোর জন্য তার কত ইচ্ছা, কত চেষ্টা, কত না লড়াই, কত পরিকল্পনা। এই একটি মাত্র ফুল ফোটানোর আশায় সূর্যের দিকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা। মুখ বাড়ানো। মাটিতে কণা কণা হয়ে ছড়িয়ে থাকা অনন্ত জলের ধারাপ্রবাহ বিপুল আগ্রাসী টানে শুষে ফেলা। পোকা থেকে বাঁচিয়ে, রোগের সঙ্গে লড়াই করে, ঝড়-বৃষ্টি-রোদ-জোছনার সঙ্গে ভারাসাম্য রেখে প্রাণের অনন্ত উচ্ছ্বাস, ঐ একটি মাত্র ফুল। ঐটিই তার জয়পতাকা। ঐটিই তার আনন্দের একছিঁটে স্ফূরণ। এই অসীম বিচিত্র জগতে গ্রহ উপগ্রহ তারকামণ্ডলীর মাঝে পৃথিবীর তুমুল প্রাণের অবিরল উৎসারের প্রবহমানতায় সবুজ সরু ডগায় আকাশের দিকে উঁচিয়ে ধরা ঐ একটি ফুল– যেন তার আর্তি, বেদনা, স্বপ্ন, আর তার সমূহ অভিমান। তার একান্ত মনের কথা। সৃষ্টির শুরু থেকে তার বংশের হাজার বছরের সংগ্রামের লড়াইয়ের টিকে থাকার একটি চিহ্ন। ভাবি আর নেশা লেগে যায়। শরীরে শিরশিরানি লাগে। রোমগুলো খাড়া হয়ে অভিবাদন জানায় যেন আমার। 

       হে মহান ফুল, তুমি তোমার বিস্ময় দিয়ে আমার বিস্ময় জাগিয়ে তুলেছ। তুমি তোমার বেদনা আর আনন্দ দিয়ে আমার বিশ্বাস ফিরিয়ে এনেছ। তোমাকে প্রণাম। তোমার দিকে তাকালে আমার বিষণ্নতা কেটে যায়। আমার মনখারাপের মাথায় ঐ রকম আরেকটি ফুল ফোটে। আমি সেই ফুল মাথায় করে ঘুরে বেড়াই সারা শহর। ভিড়ের মধ্যে যাই। নির্জনতায় যাই। গভীরতর কোনো কাজের ভেতর, দোকানে, মিছিলে, বক্তৃতায়, চাকুরিতে, শ্মশানে, মন্দিরে, অপরিচিত কারো বাড়িতে, হাসিমুখে পরিচিতদের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে বেড়াই। আমার মাথার উপর সেই ফুল ফুটে আছে টের পাই। সেই ফুল। গাঢ় বেগুনী রঙের। মাঝখানে হলুদ একটি ফোঁটা। খুব ভেতরে নিভৃতে নাভীর মতন একটি ছোট কুঁড়ি। আমি কাউকে বলতে পারি না সে কথা। আমার নিভৃতে সেই ফুল বড় হয়। কখনো ইচ্ছা হয় সে ফুল মাথায় করে নির্জন কোনো নদীতীরে ফুটে থাকি। হাওয়ায় দোল খাই। দূরে হয়তো কুয়াশা। আজকের মতন কোনো সকাল। পৃথিবীতে যেন কোনো মানুষের আবির্ভাব হয়নি তখনো। অসীম প্রতীক্ষা চারদিকে। নদীর শীতল জল বয় এক মনে। আর একা একা আমার মনে হয়, কী অপূর্ব শোভা চারদিকে। কী অনিন্দ্য জগৎ। বিস্ময় আর কাটে না। ঘোর আর কাটে না।




মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ