নির্জন মাটির কলসী
নীরবতার ধ্বনি আছে। নির্জনতারও আছে জন। কোনো একটি শব্দ নিস্তব্ধতাকে প্রকট করে তোলে। বিশাল ক্যানভাসে এক জন লোকের উপস্থিতি নির্জনতাকেও করে প্রগাঢ়।
ভাবি, নীরবতার চরিত্র পাল্টে গেছে নাকি! আট-নয়ের দশকের নিবিড় অলস দিনপ্রবাহ কি এখন আছে! কত কিছুই তো পাল্টে গেছে। একাকী অখণ্ড অবসরে হাতে এসে গেছে জাদুযন্ত্র মোবাইল। সে কথা বলে সারাক্ষণ। চিৎকার করে। সর্বদা বলে, এখানে কিছু লিখুন। রীল বানান, ভিডিও করুন। সে নীরব হতে শেখায় না। চুপ করতে দেয় না। সব সময় সে কিছু বলে। কিছু করে। গান শোনায়। না হলে অন্তত ম্যাসেজ আগমনের শব্দ তোলে।
ছবিটি এখনো চোখে ভাসে। ঝা ঝা রোদ্দুরে আশপাশ যেন মিইয়ে গেছে। কোথাও ঝি ঝি ডাকে একটানা। ঘরের ভেতর ঘুণপোকার কিট কিট শব্দ। ঘু ঘু ডাকছে পাশেই কোনো এক গাছের ডালে বসে। প্রকৃতির এসব শব্দ কেমন যেন প্রকৃতির সঙ্গেই মিশে থাকে। বাড়তি মনে হয় না। অথচ মানুষের নানা কাজ, চিৎকার খাপ খায় না। রাস্তায় বেরোলে দেখা যায় মোড়ে রিকশাওলা হুড টেনে দিয়েছে ঘুম। দীর্ঘ বিটুমিনঢালা পথ একা। কেউ নেই। একটা সাইকেলও না। সার সার ছুটে যাওয়া ইলেকট্রিক তারে বাদুড় ঝুলে আছে উল্টো হয়ে। তার একটি ডানা ছেঁড়া, ভেতর দিয়ে আকাশ দেখা যায়। চার পাঁচ দিন আগে হয়তো আটকা পড়েছে সে। এমন ঝম ঝম রোদে সে আরও ঝাঁঝরা। এই যে লিখতে লিখতে রোদের সঙ্গে ঝম ঝম শব্দটি লিখে ফেললাম। কেন! রোদের কি এমন শব্দ আছে? তার পায়ে বুঝি নূপুর। নির্জন প্রান্তরে সে বুঝি ধ্বনি তুলে হেঁটে যায়! আসলে তীব্র রোদে শুকিয়ে সব টান টান। টোকা দিলেই বুঝি শব্দ হবে।
পরীক্ষা শেষ। মামার বাড়ি যাবার পথে ধু ধু হাওরের মাঝে বিশাল নাম না জানা গাছ। হাড়সাদা তার পাঁজর। মাটির গভীর থেকে সে প্রবল তৃষ্ণা নিয়ে উঠে এসেছে। কিছু একটা বলতে চায়। তার ভেতর অজস্র কালের হাহাকার। মগডালে বসে ঠোঁট শানাচ্ছে শকুন। ক্ষুরধার চোখ। মাঝে মাঝে গলা উঁচু করে, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে চারদিক। রোদে ভেসে যায় গ্রাম। কোনো শব্দ নেই আর। যেন পৃথিবীর এক প্রান্ত। সময়ের কোনো গোপন ভাঁজ। কোনো মোবাইল নেই, টাওয়ার নেই, কারখানা নেই, গাড়ি নেই, বাইক নেই। কেবল হাওর, গাছ, ছড়া, নিবিড় জনপদ আর অসীমান্তিক নীরবতা।
নীরবতা বা নির্জনতার কথা মনে এলেই ছোটোবেলায় দেখা মাটির কলসীর কথা মনে আসে। প্রতিটি মধ্যবিত্ত ঘরের মতন আমাদেরও একটি মাটির কলসী ছিল। সেটি থাকত ঘরের এক কোনে। সেখানে ছায়া ছায়া, আলো পড়ত না। বহুদূর থেকে রৌদ্রক্লান্ত কেউ এলে মা ঐ কলসী থেকে ঢেলে জল দিতেন। দৌড়ঝাঁপ করে এলে তার জল ঢক ঢক পান করে মনে হত আঃ শান্তি। কখনো 'হরিবোল হরিবোল' ডেকে রসকলি দেওয়া বৈষ্ণবী এসে দাঁড়াতেন ঘরের সামনে। পরনে তার সাদাটে মলিন থান। এক কাঁধে কাপড়ের ঝোলা, আরেক কাঁধে ভাঁজ করা গামছা। হাতে ত্যারাব্যাঁকা লাঠি। ঘরের পিড়ার একদিকে বসে ঝোলাটি নামিয়ে বলতেন, 'আছোনি গো'? 'গোওওও' ধ্বনিটি কেমন ছমছমে। মেঘের মত ভাসতে ভাসতে কোন গোপন গুহার আড়ালে যেন মিশে যায়।
ফাল্গুন মাসের শুরু। শীত শেষ। গাছে গাছে শুকনো পাতার ঝালর। এখনো বসন্তের হাওয়া শুরু হয়নি। ঝিমধরা সব। বাড়ি ঘর ফেলে যেন সবাই কোথায় চলে গেছে! ফাল্গুন মাস এলে কি মনে হয় কেবল যাই যাই! পাতা ঝরে পড়ার মতন বুঝি সব! অথবা সবাই যেন কোন মায়ামন্ত্রে ঘুমিয়ে আছে! সে ঘুম আর ভাঙবে না। শাপগ্রস্ত নগরী কোনো এক রূপকথার রাজপুত্রের জন্য বুঝি অপেক্ষমাণ! এমনই উদাসীন। কেবল 'কেউ আছোনি গো' স্বরতাড়িত এই ডাক ঘর থেকে ঘরে, গ্রাম থেকে গ্রামে, গাছ থেকে গাছে ঘুরে ঘুরে কোথায় গুম হয়ে যায়। তার আর কোনো প্রতিধ্বনি ওঠে না। এমনই নীরব। এমনই গোপন।
কিন্তু না। মা এসে দাঁড়ান। কথা বলেন। প্রথমে একটু জোরে, তারপর হাল্কা। শোনা যায় না। ঝিমধরা রোদের ভেতর মা আর বোষ্টমীর কথা মিশে যায়। রোদের গায়ে কোনো আঁচড় কাটতে পারে না। কোথায় ছিলেন মা! দুপুরের নির্জনতার ভেতর কোথা থেকেই বা এলেন তিনি! সবই স্বপ্ন মনে হয়। একটু পরেই সেই কলসী থেকে ঘটিতে জল ঢেলে নেবার শব্দ। বগ্ বগ্ বগ্ বগ্। কলসী থেকে জল ঢালার নানা শব্দ আছে। সব শব্দ সমান নয়। বেশি করে ঢাললে যে ধ্বনি ওঠে, কম করে নিলে তা নয়। সেই জল কিছু খেয়ে কিছু মুখে ছিটিয়ে বোষ্টমী বসলেন একধারে চুপ করে। তাকালেন চারদিকে। রোদে খা খা সব। হঠাৎ সুপুরি গাছের খোল পড়ে যায় সশব্দে। অনেক দিন বৃষ্টি না হওয়ায় ঘাসহীন শুকনো উঠোন। ঠনঠনে। কোথাও চিড় ফাটল। বোষ্টমী একটু আধটু তার আখড়ার কথা বলে। একটি পিঁপড়ে চলে যায় উদ্দেশ্যহীন। ফাটলের কাছে এসে দাঁড়ায়। তারপর থামে। তবু ফাটল পেরিয়ে যায় না। তার পক্ষে ফাটল অনেক বড়। বোষ্টমী বলে আখড়াতে এখন কেউ নেই, তিনি একা। এখন ভিক্ষান্ন সংগ্রহে বেরিয়েছেন। ফিরতে ফিরতে বিকাল। একটি কাঠবেড়ালি নেমে আসে কাঁঠাল গাছ থেকে নিঃশব্দে। উঠানের শুকনো পাতার ভেতর দিয়ে এক পাশে থাকা ইঁটের পাঁজার দিকে দ্রুত চলে যায় ঈষৎ গলা-লাল সুচিক্কণ সাপ। মা বলে, জিংলা পোড়া। ওদের শীতঘুম শেষ। এবার খাবার সংগ্রহের পালা।
কতদিন আর! এখন সে ছবি নেই। সেই নীরবতা, নির্জনতা নেই কোথাও। কলসীর রঙটি চোখে ভাসে। ঘন বাদামী রঙের। বহুদিন হল সেই মাটির কলসী কারো বাড়িতে আর দেখি না। সেই ঘটিও নেই কোথাও। বোষ্টমী আর আসে না। আর সেই শুকনো পাতার ঝালরের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা বোষ্টমীর 'আছোনি গো' আহ্বান হয়তো মাঠ হাওর পেরিয়ে চলে গেছে নিরুদ্দেশের বাড়ি। শূন্য আখড়ায় এখন আর কেউ বাস করে না। কোনো প্রভাবশালী দখল করেছে তার জমি। ঝিমধরা দুপুরে হু হু রোদে মাটির কলসীর নির্মল জল এখন আর কারো পিপাসা মেটায় না!
ব্যাপারটা হয়ে গেল ঝটপট। মহাকালের এই অভাবনীয় পরিবর্তনের কথা ভাবি। নীরবতার ভাষারও কত বদল হয়েছে। সেই প্রান্তিক পৃথিবী, সেই মায়ারাজ্য হঠাৎই উবে গেছে। মাটির কলসীর কথা ভাবলেই যার কথা মনে পড়ে সে হল সেই কাক। কলসীর জলে পিপাসা মেটাবার জন্য যে অবিরাম কলসীতে নুড়ি ভরে যায়। এই গল্পটির আবহে একটি নির্জনতার বোধ আছে। নীরবতা আছে। একটা মৃত্যুবোধ। যদিও এমন গল্প আজকের এই আধুনিক সময়ে আর রচিত হতে পারবে না। কল্পনা করাও দুঃসাধ্য হবে। সেই কাল পার হয়ে এসেছি আমরা। কাক আর কলসী দুটোই মৃত্যু সংক্রান্ত নানা বিধির সঙ্গে জড়িত। মারা যাবার পর শ্মশানে লাগে মাটির কলসী। জলভরা কলসীটি ছিদ্র করে ছেড়ে আসতে হয়। সেটি হয়তো জন্মের বন্ধন থেকে মুক্তিলাভের প্রতীকায়ন। আবার মৃত্যুর পর কাক ডেকে খাওয়ানো তো সাধারণ বিধি। সে যাক। তবে তীব্র রোদে মাটির কলসীর ভেতর শান্ত-তরল যে নির্জনতা সে আর নেই।
অথচ মাটির ঘড়ার সঙ্গে বা কলসীর সঙ্গে আমাদের পুরানো সম্পর্ক। শ্রীরাধা কলসী কাঁখেই তো যান ঘাটে শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সাক্ষাত করার জন্য। অথবা সেই ময়মনসিংহ গীতিকা– কোথায় পাইবাম কলসী কন্যা কোথায় পাইবাম দড়ি, গলায় কলসী বাইন্ধা জলে ডুইব্যা মরি। কলসী তো অনেক রচনায় নিতম্ব অথবা গর্ভবতী নারীর রূপক, অথবা সখি। প্রেম থেকে মৃত্যু, জীবন থেকে যৌনতা, কলসী থাকেই। আট-নয়ের দশকে বড়সড়ো পরিবর্তন হলো সেখানেই। একাকীত্বের চরিত্র পাল্টে গেল।
আমাদের রান্নাঘরটি পাল্টে গেছে অনেকটাই। ফিল্টারের সঙ্গে আগে থাকত মাটির কলসী। এখন তার জায়গা নিয়েছে ওয়াটার পিউরিফায়ার, ঘটি নেই অনেক বাড়িতেই। শিল নোড়া, আমরা যাকে বলি পাটা- পোতা, তার জায়গায় এখন গুঁড়ো মশলার প্যাকেট বা গ্রাইন্ডার মেশিন। দিনযাপনের অলস ভাব কেটে গেছে। শকুন নেই। বড় বড় হাওরে এখন ছোটো বড় বাড়ি। শহর বড় হচ্ছে। কাঠি দিয়ে সাইকেলের টায়ার চালানো বালকেরা আজ কোথায়! সেই হাফ প্যাডেল চালানো কিশোরেরা এখন অনেক বড়। ছোটো ছোটো মিনি সাইকেল বেরিয়েছে এখন। যার সঙ্গে দু পাশে ছোট করে অতিরিক্ত চাকা লাগানো থাকে। হাফ প্যাডেলের দরকারই নেই। সমস্ত বিষয়টি হয়তো অর্থনৈতিক বা শিল্পনৈতিক। দেশে ইন্ডাস্ট্রিয়াল বিপ্লব হয়েছে। যার ফলে প্রোডাক্ট বেড়েছে। জীবনের মান বেড়েছে অনেক। কিন্তু এর ভেতর দিয়ে একটি জনপদের মানসিক চরিত্র কি পাল্টায়নি!
নীরবতা আসে কোথা থেকে! সমস্ত গ্যালাক্সিতে যেমন অজস্র গ্রহ, গ্রহাণু, তারা, ধূলিকণার ফাঁকে ফাঁকে পরম শূন্যতা; মাঝে মাঝে মনে হয় নীরবতাও তেমনি শব্দের ফাঁকে ফাঁকে থাকা প্রলম্বিত শূন্যতা। আটের নয়ের দশকের সেই নীরবতাজালে এখন শত শত ছিদ্র। অসংখ্য বাড়িঘরের মত অসংখ্য শব্দরাজি, শব্দাণু। সুতরাং শুনতে শুনতে হাইপার হয়ে যাচ্ছে মানুষ। সদা উত্তেজিত। কিছু বললেই দু' ঘা লাগিয়ে দেবে। মোবাইল নামক ডিভাইসটি তার নীরবতাও খুন করে ফেলেছে। এই ফাঁকে এইসব জ্ঞান নিয়ে বেরিয়ে গেছে অগুন্তি মোটিভেটর। তারা ক্রমাগত ধ্যান করার কথা বলে। উদ্বিগ্নতা, দ্বেষ, দুশ্চিন্তা, বিষণ্নতা কমানোর প্রক্রিয়া বলে যান। হীল করার পরামর্শ দেন মোবাইলের মাধ্যমে। সুতরাং আরো বেশি জড়িয়ে যাওয়া। নিজের ব্যাক্তিগত পরিসর কমিয়ে আরো অজস্র জনের পরিসরের জঞ্জাল ঘেঁটে তোলা। সুতরাং নীরবতা আসে কোথা থেকে! হাঁটুর উচ্চতার সব গাছ। ছায়াহীন পথ। রোদের ভেতর প্রতীক্ষা নেই, আছে জ্বালা। বোষ্টমী যদিও আসে, কার সঙ্গে কথা বলবে! ভুলস্বর্গের ঘড়া রঙ করবার চিত্রীরা হয়তো আজ অপ্রয়োজনের। আজকের নীরবতাকে রূপ দেবার মতো ভাষা তার আর জানা নেই।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন