সেই জোছনা-ধুতি
এখন রাত বারোটা। পৌষ মাস। দূরে কোথাও কীর্তন শোনা যাচ্ছে। আমার সামনে সাদা পৃষ্ঠা। বাইরে অপ্রাকৃত জোছনা। বাইরে নিবিড় কুয়াশা। বাঁশির সুরেলা ঢেউ ক্ষেত খামার কাঁপিয়ে, বড় রাস্তা পার হয়ে সুপুরি নারকেল গাছের আঁকাবাঁকা পথ অতিক্রম করে নির্জন গলির এই ঘরে প্রবেশ করছে। অপার্থিব। চেনা জগত অচেনা হয়ে যায়। সাদা কাগজের দিকে তাকাতে তাকাতে মনে হয়, অনন্ত শূন্যতার মাঝে অজস্র রেখার কারিকুরি। সাদা কাগজের রঙ যেন সব জোছনার। তার ভেতর দিয়ে তাকানো যেন, জোছনার ভেতর দিয়েই তাকানো।
এমনই সাদা রঙ ছিল দাদুর। জোছনার মত। যেন প্রান্তর থেকে উঠে আসা। তার ধুতি- ধবে ধবে। পৌষ এলে কীর্তনে চলে যেতেন। ক'দিন পরে জোছনা-ধুতি হয়ে যেত হলদে। যখন ফিরতেন, দেহে ক্লান্তি, মুখে সজল শ্যামল ভাব। হাসি। জোছনারই যেন সে হাসি। মনে হত জোছনার সন্তান যেন। পৌর্ণমাসি রাতে কৃষ্ণ এসেছেন পেছন পেছন এগিয়ে দিতে। গুলঞ্চ গাছের তলা দিয়ে সেই পথ।
এখন আর সে ধুতি নেই। ঝটপট বদলে গেল সব। সে এক সময় ছিল। একটা ক্লাস তখনও পরত ধুতি। বিশেষ করে গাঁও-গঞ্জ থেকে উঠে আসা দাদু শ্রেণিটি। হাটে বাজারে পথ চলতে, নয়ের দশকের শুরুতেও সে ছিল প্রায় স্বাভাবিক। বিশেষত আমাদের রাজ্যে। তবে সে সময় শিক্ষিত শ্রেণিটির অধিকাংশই স্যুট পরতে শুরু করেছে। স্কুল জীবনে এক দু'জন শিক্ষক ছাড়া আর কাউকে ধুতি পরতে দেখিনি। তবে যারা পরতেন তারা ছিলেন আমাদের চোখে প্রবল ব্যক্তিত্ববান। কেন এমন ঠিক জানি না। ওরা কি ধুতির কারণে অন্যদের থেকে আলাদা, নাকি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে, কে জানে। ধুতি থেকে তাদের আলাদা করে ভাবা যে যায়, সে বোধ কাজ করেনি। শিক্ষক ছাড়াও ছিলেন কয়েক জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক না বলে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বললে ভালো। তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিও ছিল উঁচু দরের। দৃঢ়, ঋজু, সটান ব্যক্তিত্ব। তাদেরকে মনে হত লীডার। পরিবার ছাপিয়ে একটা পাড়া, মহল্লা বা অঞ্চলকে তারা প্রভাবিত করতেন। এই শ্রেণিটি গ্রামীণ কোনো দাদু নয়। শিক্ষিত। রুচিশীল। মেজাজী। ধুতির ব্যক্তিত্বকে তাঁরাই হয়ত মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সে সময় শিক্ষিত শ্রেণিটি ধুতি পরলেও কালেভদ্রে স্যুট যে পরতেন না, তেমন নয়। অর্থাৎ মিশ্র অবস্থা।
মূল ব্যাপারটি হয়তো অর্থনৈতিক। পরিবারের দিকে তাকালে দেখি, পরিবারে একজন কর্তা থাকতেন। তিনি পরতেন ধুতি। ধুতির মতই ব্যক্তিত্ববান ছিলেন তিনি। মার্জিত। শোভন। তার কথায় পরিবারের সবার ওঠা-বসা। বাড়িতে নতুন আসা বউ থেকে শুরু করে মা ছেলে। পরিবারের মূল চালিকাশক্তি তো তিনি। পরিবারে সন্তান উৎপাদনে সে সময় রাষ্ট্রীয় নির্দেশ আসেনি। ছোট পরিবার সুখি পরিবার এই আপ্তবাক্যটি চালু হয়নি। সুখ বিষয়টি এত সস্তাও ছিল না। সুতরাং পরিবার পরিকল্পনাহীন সমাজে গণ্ডায় গণ্ডায় ছেলে-মেয়ে। বিষটি খুবই স্বাভাবিক। সুতরাং দুই সংখ্যার পরিবারে কর্তা বাবাটি ছিলেন মধ্যমণি। বসতেন পরিবারের মাঝখানে। তাকে ঘিরেই যাবতীয় ডিসিশন বা অ্যাকশন। জমি ছিল অর্থনীতির কেন্দ্রে। কৃষিভিত্তিক রাজ্যে এই কর্তাব্যাক্তির ছিল অসীম মর্যাদা। তাই অসংখ্য ছেলেপিলের সংসারে ত্যাজ্যপুত্র বিষয়টি ছিল অতি সাধারণ একটা ব্যাপার। মানে জমি থেকে শুরু করে সম্পত্তির অধিকার হারানো। পড়াশোনার তত বালাই নেই। রবীন্দ্রনাথের সুভা গল্পের প্রতাপ বা শরৎচন্দ্রের দেবদাস শ্রেণিটির তখন বেশ রমরমা। অর্থাৎ ভ্যাগাবন্ড হলেও মর্যাদার আসন। কর্মেরও সুযোগ কম। চাকুরি বলতে মূলত সরকারি। সেই ভয়েই পিতৃপুরুষের জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হবার রিস্ক কেউই নিতেন না। ফলত কর্তাব্যাক্তির হাতের মুঠোয় ছিল সব। বিবাহে মত দেওয়া থেকে অন্নপ্রাশন, শ্রাদ্ধ থেকে ছোটখাটো ব্যক্তিগত বিষয়ে। ব্যক্তিগত কোনো বিষয় কতদূর ব্যক্তিগত, সেটাও ভাবার। সুতরাং কর্তাব্যক্তিটিরও মাথার ব্যায়াম নিশ্চিতরূপে বেশি করতে হতো। অনেক সময় ভুল সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়ে যেত। তা অবশ্য মেজাজ দিয়ে গাম্ভীর্য দিয়ে পুষিয়ে নেওয়া যেত।
তারপর তো জীবনের গতি দিনকে দিন বেড়েই চলল। নয়ের দশকের শেষেই সে হয়ে গেল হাতে গোনা। ইন্ডাস্ট্রির দিকে ঝুঁকছে দেশ। এ রাজ্যে যে জায়গাটি নিয়েছে পাইকারি ও খুচরো বাণিজ্য। কৃষি থেকে অর্থনীতির ভরকেন্দ্র সরে গেলে জমিও তার উপযোগিতা হারাতে শুরু করেছে। বেশিরভাগ জমি বসত বাড়ির জন্যই কেনাবেচা হতে শুরু করল। বিশেষত এ রাজ্যে কৃষিনির্ভরতা স্বল্প। সবই পূর্বস্মৃতি। দেশভাগের আগের আলোচনা। জমি যেহেতু উপযোগিতা হারাল, সুতরাং কর্তারও গুরুত্ব কমতে লাগল। সেই তোয়াজ করে রাখা, সেই অখণ্ড অবসর আর নেই। কেবল ছোটো। আগে যেখানে গ্রামই ছিল অর্থনীতির ভিত্তি। শিল্প বা বাজারমুখী সমাজে শহর হয়ে গেল অর্থনীতির কেন্দ্র। জমির সঙ্গে লগ্ন মানুষ গেল পিছিয়ে। জমিতে না পড়ে থেকে শহরমুখী হতে লাগল মানুষ। এ সময় তথাকথিত অশিক্ষিত অল্পশিক্ষিত শ্রেণিটি প্রথমেই হোঁচট খেল। যে ছিল জমিতে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত, উঠতি শহরে সে হয়ে গেল শ্রমিক, একজন দিনমুজুর। ঝা চকচকে নগরে একজন আগন্তুক। আর শিক্ষিতটি চাকুরি নিয়ে ভাড়াবাড়িতে উঠে এল। বিশাল আকাশ আর অঢেল জমি নয়। এক চিলতে উঠোন, বা ছোট্ট ঘুঁপচি ঘর। গ্রাম খালি হতে লাগল। সেখানেই ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, চিকিৎসা। কর্তাব্যাক্তির মসনদ ভেঙে গেল। ধুতি পরিহিত অল্প শিক্ষিত কর্তাব্যাক্তিটিও এই দ্রুতগামী শহরে একজন বোকাসোকা মানুষ। পাশাপাশি ততদিনে পরিবার পরিকল্পনার ফল ফলতে শুরু করেছে। হাম দো হামারে দো। অসংখ্য ছেলেমেয়েদের সংসারে যেমন সব সন্তানের প্রতি পিতা-মাতার নজর থাকত না। একজন হয়তো পড়াশোনা করল, একজন হল ব্যবসাদার, একজন জমিতে গেলে, একজন হয়ে গেল সন্ন্যাসী বা করল রাজনীতি, এর মধ্যে একটা হয়তো ভবঘুরে। এই অনাগ্রহ, দেখা শোনার অভাব, এই উদাসীন কর্মহীনতার ভেতরে এক ধরনের স্বাধীনতা আছে। সন্তানরাও আপন মনে বড় হয়ে উঠত নিজের ভেতরে মুক্তির বোধ নিয়ে। শাসন ছিল দূরে। অর্থনীতির ভরকেন্দ্র সরে যাওয়ায় জীবনের গতি বাড়তে লাগল। ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পাল্টে যেতে থাকল। প্রচুর পরিমাণ বাইক ঢুকতে লাগল শহরে। যে গ্রাম ছিল দূরে, সে এখন ধীরে ধীরে নিকটে। বিয়েতে পণের দাবি হয়ে আসতে শুরু করল বাইক। ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা পাল্টে গেলে ঋণ দেওয়ার বিষয়টি আরেকটু শিথিল হলে অবশ্য বিয়েতে বাইকের দাবি গ্রহণযোগ্যতা হারায়। এবং এর পাশাপাশি ধুতি কমে আসতে থাকে। এক সময় একমাত্র বিয়ে ছাড়া সে আর কোথাও টিকে রইল না। কারণ গতির সঙ্গে তা মানানসইও নয়। সুতরাং ধুতি থেকে প্যান্টে সরে যাবার পেছনে অর্থনীতির ভয়ঙ্কর বদলে যাওয়া। রেশন কার্ডে কর্তা শব্দটি থাকলেও পরিবারের কর্তা শব্দটির বৈশিষ্ট্য ততদিনে বদলে গেছে।
পৌষ মাস। এখন রাত বারোটা। দূর থেকে শোনা যায় বাঁশির শব্দ। দাদু আর এখন কোথাও নেই। সেই ধবধবে জোছনা-ধুতি দেখি না। এখনো কীর্তন হয়। যারা গান করেন, তাদের কারো হালকা বাবরি চুল। আসরে ওঠার আগে তারা কোথাও আড়ালে তাদের পোষাকটি পাল্টে নেন। হলুদ, কমলা, সবুজ। নানা রঙের। সেই ধুতি নেই। একজনও বয়স্ক নেই। তারা সিনেমার গানের সুরে গান করেন। তাদের চোখ মুখ দেখি। নতুন। সেই জোছনা কোথাও নেই। আলোয় ঝলসে যাচ্ছে শহর। এই তীব্র আলোর ব্যারিকেডের ভেতর জোছনা প্রবেশ করতে পারে না। ধুতির মতই সে যেন বেখাপ্পা, আগন্তুক। ভোর হলে দেখি হাতে খৈনী ডলে গতরাতের কৃষ্ণ জিন্স প্যান্ট পরে পিঠে খোল নিয়ে দলবলসহ টুকটুকের অপেক্ষা করে। আজ আবার তার ছাদ ঢালাই আছে। বাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন