নৌকা

 




বুঝতে পারছি না কিছুই। হঠাৎই বন্ধ কোনো ঘরে ঢুকে পড়লে যা হয়। কথাটি বলেছিলাম, যদিও মনে আমার ঘরের কথা নেই। ভেতরে নদীর কথা। এখন নদী বলতে কার মনে কেমন জানি না। গঙ্গা পদ্মা যমুনা বা ব্রহ্মপুত্রের তীরবর্তী কারো মনে যে বিস্তার থাকা স্বাভাবিক, এখানে থেকে সেই ছবি ভেঙে যেতেই পারে। 

            জুরি নামক আপাত ছড়াসম জলপ্রবাহকেই আমরা নদী বলে বিশ্বাস করি। দুই ধার উঁচু তার, তবে পাড় ঢালু নয়। মাত্র সে পাহাড় থেকে নেমেছে। সারা বছরই শীতের শীর্ণতা, কেবল বর্ষা এলে ওনার যত হম্বিতম্বি। মা তো কথায় কথায় বলে এইট্টি ফোরের ফ্লাড। আমার বড় মামা আমাকে মাথায় করে গলাজল হেঁটে পার করেছিলেন। আমিও অবশ্য নদীর রাগ দেখেছি। স্মৃতিতে আছে এক রাত্রির কথা। টু বা থ্রিতে পড়ি। রাত্রি কত ঠিক জানি না। মায়ের ডাকাডাকিতে ঘুম ভেঙে দেখি হুড়মুড় করে ঘরে জল ঢুকছে। মুহূর্তেই বিছানার পায়া জলে ডুবে গেছে। সবার ভয় করলেও, আমার অবুঝ মনে বেশ ছিল আনন্দ। মাতৃ আদেশে বিছানাতেই কাটিয়েছি। পরদিন সকালে একটা বড় বাঁওশ মাছ ও একটা সুদৃশ্য প্লাস্টিকের কৌটা উপহার দিয়ে জল নেমে গেল দুপুর থাকতেই। 

           থাকতাম জুরির পাড়ে, একটা ভাড়াবাড়িতে। পর্ণ কুটির বলতে যা বোঝায়। পরে শুনেছি সেটা আশ্বিন মাস হবে। কোথাও হয়তো স্ল্যুইস গেট ভুলবশত খোলা হয়ে গিয়েছিল। তবে এমন নদী দেখে কখনোই নদী তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ ইত্যাকার জিজ্ঞাসা জাগে না। অথবা আমি তো আর বিজ্ঞানী জগদীশ বসু নই। জনপদটিরও সে বিস্তৃতি নেই। মানুষের মনের কি আছে! জানি না। তবে যে বন্ধ ঘরের ছবি ভেসে আসে! তা আসে। কখনো কখনো এক ছুটে কোনো অনন্ত প্রবাহিত নদীতীরে বসার ইচ্ছা হয়। কিন্তু নেই। মনে হয় বন্ধ। এদিকে কাঁটাতার, ওদিকে কাঁটাতার। এদিকে পাহাড় ওদিকে জঙ্গল। সর্বত্র না না। যাত্রা নিষেধ। এক প্রবল নাস্তির মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুর মধ্যে হীনন্মন্যতা স্বভাবগত। অতএব আত্মবিশ্বাসহীন, ভীত, শামুকসদৃশ চলমানতার মধ্যে থেকে কেবলি মনে হয় বন্ধ, সবই বন্ধ। কোথায় যে বন্ধ সে ততো বুঝিনি বহুদিন। সেই যেবার বহ্মপুত্র দেখে এলাম, ভিরমি খাবার অবস্থা। এত বড় হয়! হতে পারে! ঐ গিয়ে মাথায় এল, এজন্যই আটক আটক লাগে। মানে বন্ধ। কেবলি ঘর। ঘরের ভেতর সেঁধিয়ে থাকার মতন শহর। তো চতুর্দিকে বর্ডার দেওয়া শহর বলতে যেটা বুঝাতে চাইছি, সেটাও তো আদৌ শহর না। ছোটোবেলা থেকেই ঐ কয়েকটি দোকান, এলোমেলা গজিয়ে ওঠা আঙুর গুচ্ছের মতন– আশেপাশে গ্রাম থেকে সবাই বলত টাউন। মানে শহর। একটু সাইকেল প্যাডেলে চাপ দিলেই ধানক্ষেত। যদিও হাওর বলতে যে অসীমান্তিক কিছু বোঝায়, তা নয়। দূরে দূরে সবুজকালো জঙ্গল, মানে জীবনানন্দ কথিত আম জাম কাঁঠাল আছে, তবে হিজল নেই, বদলে জারুল, লুটকি, পিচণ্ডি। সে ভিন্ন প্রসঙ্গ। 

                 তবে নৌকা ছিল। আমাদের সবার কথায় কথায়, নানাভাবে নৌকা এসে যেত। পূর্বপুরুষরা মূলত জলজঙ্গল থেকে উঠে আসা, টান দিলে তো পূর্ববঙ্গ। জুরিতে নৌকা আসত, তা ততদিনে জনশ্রুতি। তবু পাহাড় থেকে বাঁশ যে আসে, তা দেখেছি আকছার। বিশেষত শৈশবে। নৌকা প্রথম দেখি সেই যে বার মনে হয় প্রথম, কোনো এক বর্ষায় মানে আনসিজনে নবদ্বীপের আমাদের গুরুদেব এলেন বারইগ্রামে। একদিনের সফর। মা, ছোটমামা যত রেখে যেতে চান আমাকে, আমি তো ঝুলোঝুলি। শেষে কিনা দয়াপরবশ হয়ে মা নিয়ে গেলেন। ট্রেনে সফর। হ্যাঁ, এই প্রথম। ধর্মনগর ছিল ত্রিপুরার রেলের একমাত্র স্টেশন। হৃদপিণ্ডে অনিয়ন্ত্রিত ভাবে ঢাস ঢাস ধ্বনি তুলে চলছি। আহা জানালা দিয়ে দেখা সে ছবি। জল জল আর জল। এত জলরাশি এই প্রথম। সে আমার জীবনের প্রথম অবাক জলপান। আর তখনই দেখা ডিঙি নৌকা। ছোট ছোট কালো কালো। অজস্র। নৌকাভর্তি করে সাইকেল টাইকেলসহ মিঞাভাই এসে উঠেছেন ৪৪ নং জাতীয় সড়কে। ঈশ্বরী পাটনীর আসনে থেকে পাকা বাঁশের লগি ও মাঝেমাঝে বৈঠা ঠেলছে আদুড় গায়ে একটি ছেলে। কেবল দেখছি। ঘাটের সঙ্গে জলের সঙ্গে যার আজন্ম সম্পর্ক থাকার কথা, সে এই প্রথম দেখছে এত জল। মনে হল সমুদ্র। ঘাটের সঙ্গে জলের সঙ্গে কেন সম্পর্ক থাকবে! আরে আমাদের অন্নপ্রাশন থেকে বিবাহ, বিবাহ থেকে শ্রাদ্ধ সবই তো জল আর ঘাটকাজের অনুষ্ঠানাদি ঠাসা। সে বেশ মনে আছে বাড়িতে বাড়িতে গঙ্গাজল থাকত শিশিভর্তি, অস্থি থাকে তুলসীতলায় মাটির নিচে সংরক্ষণ করে। এখনও এর ব্যত্যয় নেই। এই ছবি দু'টিই আমরা যে নদী থেকে দূরে অনেক দূরে আছি, মানে গঙ্গামাতা আমাদের আর খোঁজও জানে না তার প্রমাণ। 


         তো জলকষ্ট আমাদের প্রতিপদে। ঐ তো ঘোলাজলের নদী। দেখে দেখে নিজেকে গাধা বলেই মনে হতো। প্লাতেরোর গাধা নয়। আমাদের ছিল তাই মাঠ, খেত। কিন্তু কবিতায় পেতাম কেবল নদীর কথা। কত কত নাম; অজয় নদী, ধানসিঁড়ি, কপোতাক্ষ, জলেশ্বরী, ময়ুরাক্ষী, তোর্ষা। কতশত নাম। শুনে শুনে তৃষ্ণার্ত। বড় বড় কবিদের সবার সঙ্গেই আছে জড়ানো এক একটি নদীর নাম। নামের মধ্যেই মঙ্গলময়, পূণ্যবতীর ছাপটুকু আছে। আমাদের জুরি! জুরিকে মাতা না বলে ভগিনী হয়তো বলা যেতে পারে। যার সঙ্গে সিবলিঙ রাইভেলরি সম্পর্ক। জারিজুড়ি শব্দটির মধ্যে হয়তো জুরি আছে। সুতরাং মাতৃস্নেহ-আশ্রয়হীন সন্তান যেমন বড় হয়ে ওঠে, তেমনই। বুকের পাটা কম। পদে পদে ভয়, কী জানি কী হয়– অবস্থা। এর মধ্যে গোয়ালভরা গাই, গাইভরা দুধ, দুধভরা পুকুর অথবা পুকুরভরা মাছ, মাছভরা গ্রাম ইত্যাদি ইত্যাদি পৌরাণিক গল্পসমূহ ভাসমান থাকলেও অবস্থা বা সঙ্গতি কিছুই ভালো ছিল না। মানে দিন গুজরান। তবে কবিতা পড়তে গেলে, লিখতে গেলে হঠাৎই যখন অন্যমনস্ক ভাবে আসে নদীর কথা। তখন বুঝি নদী তো আসলে যতটা চোখে আছে, তার চেয়েও সংস্কৃতিতে আছে আমাদের। নৌকা যতটা না দৈনন্দিনতায় আছে, তারও চেয়ে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। থানার পুষ্করিণীতে জলের তলায় আগে ছিল এরা। ঐখানে সাঁতার প্র্যাকটিস করতে গিয়ে পাড় থেকে লাফ দিয়ে গোত্তা খেয়ে পরে জেনেছি ভেতরে অজস্র নৌকা। সবই জলের তলায়। বন্যাতে এগুলো কাজ করে। আমাদেরও বাইরে নৌকা নেই। সব বুকের ভেতরে, গভীরে আছে সেইসব অজস্র নৌকা। শ্যাওলা পড়া। কালো কালো। অজস্র কালের। কেবল বন্যা হলেই এসব বাইরে আসবে। আসে। 

    তবু কোনো স্থানের নামও যে হতে পারে নৌকা, সে কি আগে জানতাম! দীঘলবাঁক পেরিয়ে কালাছড়া যাবার পথে একদিন আবিষ্কার করলাম ধানক্ষেতের মাঝখানে। পুরো নৌকার মত বাঁকা জায়গা। একেবারে বঙ্কিম বলতে যা বোঝায়। দুদিক উঁচু, মাঝখানে জল জমে আছে। সাইকেল নিয়ে দ্রুত ফস করে এগোলেও চাকা আর যায় না। স্রোত আছে বেশ। যদিও এখন আর নেই। এই ছোট্ট নামটি আর কেউ বলে না। জায়গাটিও বেশ উঁচু করা হয়েছে। জল আর জমে না। 

               একটা বন্ধ ঘরে ঢুকে পড়লে যা হয়, নদীহীন থাকলে যা হয়। কচুরিপানার মত ভেসে আসা শহরের মানসে নদীর জন্য হাপিত্যেশ আছে, বেশ বুঝি। শ্রাবণে বর্ষায় সে স্মৃতি উথলে ওঠে। সে অবাক জলের স্মৃতি। সকল নাস্তির মধ্যে আছে চোখের এক ফোঁটা জলের মতন শহরের মাঝখানে দিঘি। ঘুরে ঘুরে এর পাড়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকা পিপাসার্ত যুবক। তাকাতে তাকাতে ফুরিয়ে আসা কৈশোর, আগুনের তাপে সেদ্ধ হওয়া ছত্রভঙ্গ যৌবন। রক্তের মধ্যে ঘুরে ফেরা উদ্দেশ্যহীন অসহায় অজস্র জলযান।




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ