দালির ঘড়ি

 




দালির ঘড়ির ছবিটি দেখছি এখন। সময় গলে পড়ছে। হ্যাঁ, এ সময় আমার সময়। গলে গলে যে পড়ল নিচে এই মুহূর্তে, সে ছবিটিতে সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টার কাঁটা সবই আছে, কেবল কোনো সংখ্যা নেই। দিন না রাত এখন! এই কমলা আকাশ, ধূসরাভ বাদামি ভূমি, সে কি সন্ধ্যা! মনে হয় অলৌকিক সব। কোনো নির্দিষ্টে বিশ্বাস রাখা যাচ্ছে না। কোনো ফ্রেমে না। কোনো টেক্সটে না। অথচ সে সময়টিতে প্রবেশের মুহূর্তটি কেমন ছিল! বাজার তখনও খায়নি মাথা। মানে আমরা তখন সে দৌবারিকের মুখোমুখি। যদিও সমস্ত বিশ্বে বাজার তখন মধ্যগগনে। সোভিয়েত ফল করবে। আমাদের স্টেটেও মার্ক্সবাদী দল। তবু ভেতরে তখনো সংস্কার। বিশ্বাস। কিংবা বলা যায়, এটাই বৈশিষ্ট্য। ইতিহাস যে মরে গেছে, অথবা ইতিহাস যে এমনই, সে বোধ তখনো আসেনি। সুতরাং টেক্সট তখনো মান্য। ঘটনার বহুস্বরিক ও বহুস্তরিক ব্যাখ্যার উপর ভাসমান ছবিটি তখনো মান্য। দালির ঘড়ির গলনশীল চেহারাটি পশ্চিম দুনিয়া ও মেট্রো শহরে বুঝা গেলেও, আমাদের কাছে আরোপিত। দিন চলে ঢিমে তালে। তখনও মূল্যবোধ ধুলোয় মিশে যায়নি। মানে স্মৃতিতে কারো কারো রয়ে গেছে। মাটিতে নিকানো ঘর দাওয়াগুলো মনোহর– এটা একটু হেঁটে গেলেই কোথাও না কোথাও দেখা যায়। সুতরাং টেক্সট যদি খুঁজতে যাই, তার অজস্র টোন রয়েছে। একমাত্রিক নয়। সেসব বহুমাত্রিক। মফস্বল শব্দটি অথবা শহর শব্দটি অথবা জনগণমন শব্দটির নানাহ ক্ষেত্র নানাহ ব্যাখ্যা, নানান পর্যায়। এইসবই প্রেরণা। এসবই জ্বালিয়ে দেবে সমগ্র জীবন। শ্রেণিগত চেতনা ছাড়াও আরো রয়েছে অনেক কিছু। তখনো দেখতে পাই, বহুদূরে কোনো কুঁড়ে ঘর। ঘরের সামনে অপার্থিব এক চিলতে উঠোন। উঠোনের এক পাশে ফুলের গাছ। কোন ফুল! তা ঠিক স্পষ্ট দেখা যায় না। একটি ছেলে আপন মনে সারাদিন দুর্গাহীন অপুর মত একাকী বাঁশের কঞ্চিতে গুনা তার বেঁধে ধনুক বানিয়ে ঘুরছে। প্রতিপক্ষে কে? নাম না জানা অজস্র যোদ্ধা। দূর দূরান্তে যাদের ছায়াও দেখা যায় না। তির আর তির। সেকেন্ডে দুইশ তিনশ তির। তিরের আঘাতে কেউ আর দাঁড়াতে পারছে না। কালো হয়ে এল সব। এক্ষুণি হয়তো বৃষ্টি নামবে। বেলা কত হল কে জানে!

               সে সময়টা যেন পৌরাণিক যুগ। টিভিতে মহাভারত, রামায়ণ, বিক্রম-বেতাল ইত্যাদি ইত্যাদি। এত চ্যানেল নেই। চ্যানেল বলতে ডিডি ন্যাশনাল আর বাংলাদেশের বি টিভি। সেই সময় যখন প্রায় পাড়াতেই থাকত বড়জোর একটা কি দুটি টিভি। আর মেঝেতে মাদুর বা পাটি পেতে রাখা হত কারো কারো বাড়িতে। একটা চব্বিশ ইঞ্চি টিভিকে কেন্দ্র করে গোল হয়ে জনা পনেরো লোক। টিভিতে মহাভারতের যুদ্ধ। বাণে বাণে আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে। ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট টিভিতেও সিনেমা হলের বিস্ময়। এটা সে সময়, যখন প্রতি পাড়াতেই সবাই সবাইকে চেনে। পাড়া বলতে কিছু একটা ছিল। বিয়ে থেকে শ্রাদ্ধ, অন্নপ্রাশন থেকে কীর্তন সবই ছিল যৌথ কাজ। ক্যাটারার ছিল না। সে সময় যখন 'হরি বোল হরি বোল' বলে ভিক্ষা গ্রহণ করতে প্রতিদিনই কারোর না কারো আগমন ঘটত। এরাও ছিল অভাবী তবে নির্লোভী। একমুঠো চাল দিলেই দুহাত ভরে আশীর্বাদ দিয়ে সরে যেতেন। এটা সেই সময়, যখন বড় বড় বাড়ি বলতে মূলত একতলা। টিনের চালা, আর ইঁটের ঘর মানে, পাকা ঘর। সেসব দিনগুলিতে রামায়ণ মহাভারত চলাকালীন সময়ে বাইরে হু হু করা মরুভূমির শূন্যতা। রাস্তায় বেরোলে মনে হতো, যেন সবাই হুটপাট এই গ্রহ ছেড়ে চলে গেছে অন্য কোথাও।

                   তো সেরকম পৌরাণিক যুগে পাশের বাড়ির এক কাকু, হঠাৎ করে অঙ্ক শেখানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। টাকা নেবেন না। এমনিতেই। ফ্রি সময়। একটু দেখালে চর্চা হবে তার। তো চেয়ারে বসেন প্রতিদিন, আর আমি বিছানায়। খাতার উপর হুমড়ি খেয়ে অঙ্ক করি, তিনি মাঝে মাঝেই আমাদের বিছানা আর বেড়ার ফাঁকে ঝুঁকে ঝুঁকে কিছু খোঁজেন। আবার মা ঘরে এলেই ফিরে যান চেয়ারে। কখনো ঘরের ভেতরে হেঁটে হেঁটে ঘুরে ঘুরে এটা সেটা, এ বাক্স ও বাক্স হাতড়ান। আবার মা এলেই চুপ। পাড়াতুতো কাকু। কোনো একদিন রবিবার দুপুরে গিয়েছিলাম ওদের বাড়ি মহাভারত দেখতে। 'যদা যদা হি ধর্মস্য'র পর সেদিন মহা ধনুর্ধর অর্জুন তীরের ফলায় কর্ণের গলা কেটে মাটিতে গাঁথলেন। সে এক পরম বিস্ময়কর দৃশ্য। এসব দেখে কি ঘুম হয়! সারা দুপুর ছটফট। ঘুম আর হল না। আরো দুদিন গেলেও বালকের বিস্ময় আর কাটে না। 

            এরপর থেকে অঙ্ক দেখান কাকু আর কিছু খোঁজেন। কি যে খোঁজেন সে তো আর বুঝি না। দুদিন পর শোনা গেল ওদের বাড়িতে একটি হাত ঘড়ি পাওয়া যাচ্ছে না। তন্নতন্ন করেছেন বাড়ি। নেই। যেহেতু আমাদের অবস্থা খারাপ, যাওয়া-আসা করি, সুতরাং আমাকেই সন্দেহ। বলা যায় না, ছোটো তো, যদি হাতে করে নিয়ে আসি! জানা গেল কে একজন গণনা করে বলেছে, এখন নখদর্পণ করলে পুরো বুঝা যাবে। মা তো ভীষণ রেগে গেলেন। আমাদের ঘরে ঘড়ি বলতে ছিল মায়ের বিবাহপূর্বের এইচ এম টির স্প্রিং দেওয়া একটি লেডিস হাতঘড়ি। তার সিলভার বডি, ডায়ালটি কালো রঙের। একদিকে ডেট ওঠে। কয়েকদিন মায়ের তরফে তবুও জিজ্ঞাসাবাদ। কী লজ্জা! কিন্তু সততার এক ধরনের সাহস থাকে, তেজ থাকে। শেষে মা বললেন হোক তবে নখদর্পণ। 

          নখদর্পণ একটি প্রাচীন বিদ্যা। বাটি চালান, নখদর্পণ এইসব এখন শোনাই যায় না। কিন্তু কিছুদিন আগেও মানে ছোটবেলায় এসব প্রায় দেখা বা শোনা যেত। পদ্ধতিটি চমকপ্রদ। একজন তুলা রাশির জাতক স্নান করে সম্ভবত শনি বা মঙ্গলবার শুদ্ধ বস্ত্র পরিধান করে শুভক্ষণে সূর্যালোকে বসবেন। এরপর মন্ত্রপাঠ করবে একজন আচার্যী। এক্ষেত্রে কোনো পুরোহিত বা ব্রাহ্মণ এই কাজটি করেন না। আর এ ধরণের মন্ত্র তুকতাক যারা করেন, তাদেরকে আচার্য না বলে, আচার্যী কেন বলে কে জানে! সম্ভবত এই ধরনের গণনা পদ্ধতি বৈদিক নয়, লোকজীবন থেকে উঠে এসেছে। সম্ভবত অস্ট্রিক বা অন্ত্যজ কোনো শ্রেণি থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে– যার জন্য এই ধরনের কর্মপ্রক্রিয়াকে মান্যতা দেওয়া হয়নি। এর ফলে এগুলো যারা পরিচালনা করেন, তাদেরকে আচার্য না বলে কিছুটা তাচ্ছিল্য করে আচার্যী বলা হতে পারে। কে জানে!


          সে যাক, সবাই ভিড় করে এল। তুলা রাশির এক জাতককে কোথা থেকে সম্মানের সঙ্গে এনে বসানো হল। স্নান করে তিনি বসেছেন। সামনে প্রদীপ, ধূপকাঠি জ্বালানো। কলাপাতায় ফুল। এরপর পুজোটুজো। আচার্যী তুলারাশির হাতের বুড়ো আঙুল দুটোকে একত্র করলেন। এরপর চুপ। প্রায় চার পাঁচ মিনিট। এরপর মন্ত্র আওড়ালেন। সবাই দেখছেন। হ্যাঁ, কে চুরি করল। শিশু নয়, মধ্যবয়স্ক একজন লোক। আঙুলে ছায়ার মত ভেসে উঠেছে সে ছবি। লোকটি দরজার বাইরে এক পা, আরেক পা ভেতরে ঢুকিয়ে টিভির সামনে রাখা হাত ঘড়িটি নিয়ে সরে গেল। সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে সে ছবি দেখলেন। পাড়াতুতো কাকুও দেখলেন। এরপর মায়ের কাছে ক্ষমা চাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। সভা ভঙ্গ। এরপর আর পাড়ার কাকু মুখ দেখাতে পারেন না পাড়ায়। একটা নির্দোষ ছেলেকে অপবাদ দেবার জন্য অনেকেই নিন্দামন্দ করেছেন। সেই ছবির এখানেই শেষ। এখন যখন ভাবি, মনে হয় গত শতকের ঘটনা। আজকের সঙ্গে যেন কোনো মিলই খুঁজে পাই না। অথচ এটা ঘটেছে নয়ের দশক ঢুকতেই। 

           নয়ের দশক কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। মানে যখন পণ্যের বিশাল মার্কেটে সবাই এই ঢুকব ঢুকব। আর আমাদের গ্রাম পাহাড় বন সমতলে যখনও প্রোডাক্ট শব্দটি তেমন পাত্তা পায়নি। ফুকো দেরিদা যখন অলরেডি সব বুঝিয়ে সুঝিয়ে সমস্ত বিশ্বকে নতুন চিন্তাজালে আচ্ছন্ন করে নিচ্ছেন, আমাদের তখনও পৌরাণিক কাল। বাজার তখনও শিথিল নয়। দৈত্যটি তখনো চেরাগের গভীরে। মানে আমাদের এখানে। কালেভদ্রে একটি মোটর সাইকেল ভটভট করে চলে যায়। খুচরো বাজার। তখনো তত সরগরম হয়নি। তেমন কিছু লোকে দেখেওনি। সে সময় একটি হাত ঘড়ি হারিয়ে যাওয়া মানে অনেক কিছু। পরে বুঝেছি সে ঘড়িটি হারিয়ে যাবেই। অথবা অনেকের বাড়িতেই অবহেলায় পরে থাকবে। সময়টাই ধ্বংস হয়ে যাবে ক বছর পর। হাতঘড়িই আর পরবে না কেউ এক সময়। পরলে স্প্রিংয়ের নয়, ব্যাটারি বা ইলেকট্রিক চালিত। অতএব সময় ভেঙে যাচ্ছে। টেক্সট বদলে যাচ্ছে। আমাদের ওখানে তখনো বিবাহে উপহার হিসেবে শরৎচন্দ্র, জীবনে বিভূতিভূষণের আরণ্যক। জেনারেটরহীন রাতে জোনাকি জ্বলে ঝাঁক ঝাঁক। হলুদ স্ট্রিট লাইটের ভেতর দিয়ে বাবারা বাড়ি ফেরেন নাইলনের ব্যাগে বাজার করে। পণ্যের প্রাচুর্য নেই।

         ঘটনাটির ভেতরে হয়তো ব্যক্তিগত অপমান ছিল। সে বয়সে ততো বুঝিনি। হয়তো আমার মা বাবা বুঝেছেন। এখন ভাবি, আজ যদি কোনো দরিদ্র ছেলেকে এই অপবাদ দেওয়া হয়, তবে তার অপবাদমুক্তির পথটি কী! নখদর্পণ? বাটিচালান? এই অন্ধবিশ্বাস এখন তো আর বেশিরভাগেরই নেই। অবশ্য এখন সি সি টি ভি আছে কারো কারো বাড়িতে। কিন্তু সে সময়কার সমাজে এই প্রক্রিয়াটির উপর অন্ধবিশ্বাস একটি কিশোর ছেলেকে মিথ্যা অপবাদ অসম্মানের হাত থেকে তো বাঁচিয়েছে। সে সময়কার সমাজও খোলামনে বিশ্বাস করেছে। অন্তত প্রশ্ন তোলাটাও সমীচীন মনে করেনি। আজ সিসিটিভি ছাড়া, ভিডিও ছাড়া কে বিশ্বাস করবে! সময় বদলে গেছে। সমাজ বদলে গেছে। অর্জুনের তিরের ফলায় সেদিন শুধু কর্ণের নয়, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে সেই কিশোরের বুকে যে ক্ষত হয়েছিল। আর বড় হয়েও সে অন্যের ঘরে টিভি দেখতে বা অকারণে যেতে ভরসা পায়নি। এইসব ফুরিয়ে যাওয়া বিশ্বাস, মধ্যযুগীয় সভ্যতার শেষ চিহ্নটি রক্ষা কবচের মত তাকে ঢাল হয়ে বাঁচিয়েছে। আজও যখন ভাবি, অবাক লাগে। সেই ছেলেটির মুখ দেখতে চেষ্টা করি। দেখি না। সেই মুখ দেখা যায় না। দালির ঘড়ির মত সময়ের খণ্ড খণ্ড অংশগুলি শুধু টুপ টাপ নিচে ঝরে পড়ে। এতে কোনো দৃঢ়তা নেই। এমনই তরল। শিহরণ জাগে। ঘড়িটি কি পাওয়া গিয়েছিল? কে জানে? সে সময় হারিয়ে গেছে। তবু তার দীঘল, মোটা, সরু কাঁটাগুলি আমাকে বুকেপিঠে গেঁথে ঘুরে চলে। আমি যত ভুলে যেতে চাই। সে কেবলি বলে টিক টিক। গাঢ়তম ধূসর কোনো মহাভারতের পৃষ্ঠা যেন উল্টে যায়। সেই কুরুক্ষেত্র প্রান্তরে শুধু কর্ণ নয়, নিজেকেও দেখি অপমানিত, রক্তাক্ত ধুলোয় মাখামাখি।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ