চাঁদের আঁচল

 

    আজ পূর্ণিমা। অপ্রত্যাশিতভাবে মনে পড়ছে ঠাকুরমা দিদিমার কথা। আমাদের ঠাকুরমা বা দিদিমাদের কথা যখনই মনে পড়ে, মনে হয় এমন আর হবে না। ওরা ছিল লাস্ট জেনারেশন। আমরা মানে যাদের জন্ম আটের দশকে তাদের ঠাকুরমা বাবা দিদিমারা, সে এক আলাদা জেনারেশন। প্রাচীন বাংলার চিহ্ন, নিজস্ব ঘ্রাণ নিয়ে তাদের কাছেই শেষতক বেঁচে ছিল। এরপর পাল্টে গেছে অনেক কিছু। অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তি, দেশভাগ থেকে বিশ্বায়ন সব বদলে দিয়েছে। সেই লাল পাড় শাড়ি সেই সাদা রঙের মাহাত্ম্য এখন আর নেই। তারা নিজেদের জন্ম-অঞ্চলটিকে কেমনভাবে স্বভাব, কথা বলার ধরন, স্বর ও সুর, আদব কায়দা, রন্ধনশিল্প, ব্রত, বিয়ে, পুজো থেকে আরো কত না বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে আকড়ে ধরে থাকতেন! 

              তাদের ছিল অজস্র শ্লোক, কথা, রূপকথা, গল্প, আখ্যান, কাহিনির ভাঁড়ার। আলো আঁধার, বিশ্বাস অবিশ্বাস, স্বপ্ন সংস্কার, বাস্তব অবাস্তব মিলিয়ে এক মায়ার রাজ্য। তাদের ভেতর দিয়ে অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যেত প্রাচীন বাংলায়। সেই জলজঙ্গলের দেশে। হয়তো তার কোনো চিহ্নই তখন নেই। তবু তাদের কথায়, চোখের চাওয়ায় যেন বেঁচেছিল তা। গোপন কোনো কৌটোর ভেতর রয়ে যাওয়া নানা ধরনের কড়ি, দুর্মূল্য মুদ্রা, পুরনো শেকড়, রত্ন জহরতের মত তারা সমস্ত জীবনে বহন করতেন কত যে প্রাচীনতার চিহ্ন!

              আমার ঠাকুরমা হবিগঞ্জের সিলেটের আবার দিদিমা কুমিল্লার। দুজনের রান্না চলাফেরা কথা বার্তা চাল চলন সবই ছিল আলাদা। দু জনের রান্নার ঘ্রাণ শুনলেই ঠিক বুঝা যেত কোনটা কার রান্না। এরা যেন একটা পরম্পরা। প্রত্যেকেই একেক জন রন্ধনবিদ্যা বিশারদ। বুঝতে পারি, বাংলার প্রতিটি অঞ্চলেই যে পৃথক রন্ধনশিল্প গড়ে উঠেছিল তা এক দুদিনের বিষয় নয়। এ থেকেই তার সুদীর্ঘকালীন ঐতিহ্য ও নিজস্ব শক্ত পরম্পরার আঁচ পাওয়া যায়। 

          কত না সংগ্রামের ভেতর দিয়ে তাদের আসতে হয়েছে। কত ধরনের লড়াই। আমার দিদিমা ও তাঁর পিসিকে সেই কিশোরী বয়সে বাড়িঘর আত্মীয়-স্বজন ফেলে আসতে হয়েছে। এখানে এসে আমার দাদুরা দুই ভাইকে পিসি ভাই ঝি বিয়ে করেছেন। ত্রিপুরায় এসে তাদের বিয়ে হয়েছে। দিদিমা আর কোনোদিন নিজের বাপের বাড়ির লোকদের দেখতে পারেনি। একটা জীবন কেটে গেল, আর কখনো বাড়ি যেতে পারেননি। শুধু এই বিষয়টি ভাবলেই গায়ের রোম খাড়া হয়ে যায়। অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। শুনেছি এক সময় আমার দিদিমার একটাই ছিল বাড়িতে পড়ার শাড়ি। স্নান করার পর, এক অংশ গায়ে প্যাঁচিয়ে আরেক অংশ রোদে মেলে দাঁড়িয়ে থাকতেন। কিছুটা শুকোলে অন্য অংশ পড়তেন। শুনেছি মুড়ি বা বিভিন্ন সবজি নিয়ে দাদু বহুদূর সেই আজকের বাংলাদেশের ফুলতলা বা কুলাউড়া স্টেশনে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যেতেন। দিদিমারও বয়স কত আর! সঙ্গ তো দিয়েছেন। সেসব এখন ইতিহাস।

            কুমুদিনী নামটি যখনই ভাবি, কল্যাণী নামটি যখনই ভাবি, বুঝি এ ধরনের নাম আর রাখা হবে না। আমরা ইচ্ছা করলেও আর সে জায়গায় পৌঁছুতে পারব না। সেই জগত এখন ভেঙে গেছে। নামগুলির ভেতর যে পবিত্রতা যে মঙ্গলবোধ, যে সৌন্দর্য রয়েছে, সে আমরা আর বিশ্বাস করতে পারব না। কুমুদ মানে তো পদ্মফুল। কুমুদিনী মানে পদ্মশোভিত পুষ্কুরিণী। আজ পূর্ণিমা। ভাবি, এমন নান্দনিক নাম কী হতে পারে! জোছনার ভেতর সেই সরোবরটি আমার চোখের সামনে যেন তার অপার সৌন্দর্য নিয়ে ভেসে ওঠে। কল্যাণী নামটির মধ্যেও আছে মঙ্গলচেতনা। সবার ভালো চাওয়ার ইচ্ছা। 

              চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছি। আমার জানালা থেকে দেখা যায় তাকে। পুবের আকাশ। হলুদাভ বিশাল চাঁদ রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো ফরসা হয়ে যায়। চাঁদ একটি উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট, অথবা চন্দ্রযান-৩ এর সফল অবতরণ, এসব খবর পাশে রেখে আপাতত নির্বোধের মত তাকিয়ে আছি। নীল আর্মস্ট্রংয়ের চাঁদে যাবার খবর যদি সত্যি হয়, নরম আলোর এই জাদু তিনি কি চাঁদে গিয়ে অনুভব করতে পেরেছিলেন! আমাদের দৃষ্টির দূরত্বে থাকা সেই অপ্রাকৃত সুন্দর, অপার রহস্য কি চাঁদে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন! সেটা পৃথিবী থেকেই সম্ভব। কাছে গিয়ে চাঁদের এবড়ো খেবড়ো জমি গর্ত ধুলো প্লাজমার সন্ধান বিজ্ঞানের কাজ, কিন্তু দার্শনিক থালেস যে চাঁদ দেখতে দেখতে গর্তে পড়ে গিয়েছিলেন, অথবা হাজারো কবিরা যে সেই অধরা আলোর ভেতর তাদের দয়িতকে খুঁজে পেয়েছেন, অথবা চাঁদের পাহাড়ের শংকর যে জোছনাময় আফ্রিকার সুবিশাল তৃণভূমির দিকে তাকিয়ে পুলকিত হচ্ছিল, এসব তো পৃথিবী থেকেই সম্ভব। দূরত্বের মধ্যেই আছে সেই অনির্দেশ্য অনিরূপিত অনির্বচনীয় অপ্রাকৃত জগত। কাছে গিয়ে দেখা আর দূর থেকে দেখা, দুটোর মধ্যে তাই অনেক পার্থক্য। দিদিমাদের সময়কে দেখাও যেন তা।        

         এই পৃথিবীতে চাঁদের আলো একটি অত্যাশ্চর্য ঘটনা। এই মুহূর্তে সেই ঘটনা ঘটে চলছে আমার জীবনে। এর চেয়ে বড় সত্য নেই। ঘরের আলো নিবিয়ে দিই। আলো নেবানোর সঙ্গে সঙ্গে বাইর ভেতর একাকার। আর কোন ফাঁক নেই। এতক্ষণ তবে ঘরের ছোটো আলো দেওয়াল তুলে আমার চোখকেই ফাঁকি দিচ্ছিল। এতক্ষণে কবি সুজিত সরকার কথিত দেওয়াল তুললেই ঘর, ভেঙে ফেললেই পৃথিবী যেন নিবিড় সত্য হয়ে দেখা দিল। 

            চাঁদের দিকে তাকাতে তাকাতে এই যে নানা অনুভূতি জাগে, এর কি কোনো মানে আছে! মানে যে নেই, তা জানি। তবু মনে হওয়াটা তো আর মিথ্যা নয়। আপাতত মনে হচ্ছে সেই পাখিটির কথা। জোছনা রাতে যে প্রান্তরে উড়ে উড়ে অবিরাম ডেকে যায়। তার নাম কী ঠিক জানি না। কেউ বলে টিট্টিভ, যার ইংরেজি নাম রেড ওয়েটলড। আমি বহুদিন তার ডাক শুনে আমূল কেঁপে উঠেছি। একটা যেন কী আশঙ্কা আছে তার ডাকের ভেতর, একটা কষ্ট। কী যেন সে খোঁজে। কাকে সে ডাকে? সঙ্গীকে? সে নারী না পুরুষ জানি না। এই ডাক কামনার, বিরহের, উল্লাসের, না বেদনার,  জানি না। কিন্তু নির্জন প্রান্তরে অনন্ত নীরবতার মাঝে এই ডাক অদ্ভুত এক রোমাঞ্চ জাগায়। দিনের বেলায়ও হলুদ ধান খেতের ভেতর উড়তে উড়তে সে ডাকে। কিন্তু রাতের বেলায় সেই ডাক অপ্রাকৃত হয়ে ওঠে। আমার খুব শঙ্কা হতে থাকে, কেন কে জানে! মনে হয় কাকে যেন কথা দিয়ে রাখতে পারিনি। মনে হয়, কোথায় যেন যাবার কথা, যেতে পারিনি। এই বৃহৎ পৃথিবীতে আমি যেন একা। শেষতম মানুষ। আর কেউ নেই।  অজানা, অনির্দেশ্য কোনো ভবিষ্যত যেন পাখিটির ডাকের ভেতর। বুঝি তারই সংকেত। ঠিক যে ভয়, তাও ঠিক নয়, রহস্যময় এক অনুভূতি। নিজের হৃদয়কে নিজেই চিনি না। একটা পাখির ডাক সত্যিই এমন প্রতিবেশ বা আবহ সৃষ্টি করতে পারে! কিন্তু পারে। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে সেই শৈশবে জোছনার ভিতর তেমনই একদিন শুনেছিলাম সেই ডাক। সেই আর্তধ্বনি। মাঠের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটে যাওয়া এই একাকী ডাক যেন ঘরহীন, অনিকেত।

            সেই হারিয়ে যাওয়া কোনো শৈশবে একদিন ফিরে আসছি গ্রামের পথ দিয়ে। বড়দের কারো সঙ্গেই। কে আছে মা? ভাই? বাবা? ঠিক মনে নেই। তবে গ্রামের আঁকাবাঁকা পথ। ডানদিকে ধানক্ষেত বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। বাঁ দিকে পিচণ্ডি, লুটকি, শ্যাওড়া, ভাট গাছের জঙ্গল। এমনই কোনো ভাদ্র মাস। বেশ মনে আছে কিছুদিন বৃষ্টি শেষ হয়ে আকাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মেঘ। চাঁদ একবার তাল গাছের ওপাশে মেঘের আড়ালে চলে যাচ্ছে একবার, ফের প্রকাশিত হচ্ছে। আড়ালে যখন যাচ্ছে তখন কেমন যেন মলিন বা ঘষা কাঁচের ভেতর যেন। যখন বেরিয়ে আসছে, লহমায় উজ্জ্বল হয়ে উঠছে সব। আকাশে তাকিয়ে দেখি মেঘগুলো যেন নদীর জল চলে গেলে পলির মত। চাঁদ যখন তার আড়ালে চলে যাচ্ছে তখন তার অন্য একটা রূপ। পূর্ণিমার আলোর যে কত বৈচিত্র্য রয়েছে, সেদিন বুঝেছিলাম। যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের ২২ শে শ্রাবণ ১৩৪৮ কবিতাটির কথা মনে আসে। যার প্রথম লাইন ছিল 'মেঘচাপা পূর্ণিমা'। শব্দটির মধ্যে যে এক বিভা রয়েছে, যেন সেদিন বুঝতে পারছিলাম। চাঁদের আলোরও যে কত রূপ, কত রঙ।


            এই মুহূর্তে 'চাঁদ দেখতে গিয়ে যার কথা মনে পড়ল, তিনি হলেন সেই চরকা কাটা বুড়ি। আমি অবশ্য বহু চেষ্টা-চরিত্র করেও সেই বুড়ির সন্ধান করতে পারিনি। ঠাকুরমার দিদিমার দিকে বহুদিন তাকিয়েছি। কার যে কল্পনা জানি না। তবে চাঁদ তার লাবণ্যের জন্য, তার মোলোয়েম নরম শীতল আলোর জন্য যুগে যুগে কবি শিল্পী দার্শনিকের আকাঙ্ক্ষার ধন। বাউলের সাধনার জিনিস। প্রতীক সে। রূপক সে। তা 'চাঁদের গায়ে চাঁদ' লাগুক বা 'চাঁদের কপালে চাঁদ টি দিয়ে' যাক। তবে চরকা কাটা বুড়ি নিঃসন্দেহে এই ভারতীয় চিত্রকল্পটি মনে হয় আমাদের মা মাসিদের কল্পনা। গ্রামীণ ভারত।  চাঁদের গায়ে দাগ দেখে চরকা কাটা বুড়ির সঙ্গে মেলানো ভারতের চিরন্তন গ্রামীণ ঐতিহ্যের ছবি। ভারতবর্ষ প্রাচীনকাল থেকেই বস্ত্রে স্বয়ংভর। শোনা যায় যীশুও ভারতীয় কাপড় পড়েছেন। ভারত মহাসাগর হয়ে থেকে ভূমধ্যসাগর ভারতের বস্ত্রের বাজার ছিল। আমাদের ঘরে ঘরে লোকে চরকা কাটে। সুতো তৈরি করে। কাপড় বানায়। গান্ধীজী সেজন্যই চরকাকে জাতীয় পতাকায় বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ঘরে ঘরে সবাইকে চরকা কাটার নির্দেশ দিয়েছিলেন। বাংলা তো এ ব্যাপারে সর্বাগ্রে। বাংলার ঘরে ঘরে তাঁতশিল্প প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। যদিও ইংরেজ আমলে আমেদাবাদের কাপড় কল তৈরির পরে বাঙালির তাঁতশিল্প বড়জোর গামছাতে এসে ঠেকেছে। তবে দেখা যায় মণিপুরী থেকে শুরু করে প্রাচীন জনজাতি গোষ্ঠীরা এখনো নিজেদের ঐতিহ্যবাহী কাপড় নিজেরাই তৈরি করে। তবে এসব ক্ষেত্রে যারা ঘরে প্রতিনিয়ত সেলাই, ফোঁড় করতেন, চরকা কাটতেন, তারা মহিলা। সোয়েটার বানানো থেকে শুরু করে কাঁথা বানানো, সেলানো, সুতো তোলা, কাপড় বানানো সমস্ত কাজই হতো তাদের হাতে। সেলাই ফোঁড়ের কাজ হয়তো চোখের সমস্যার কারণে বুড়ি মায়েদের দ্বারা হতো না, তবে সুতো তোলা, চরকা কাটা কাজটি তারা ঘরে ঘরে স্বচ্ছন্দেই করতেন। চরকা কাটা বুড়ি কি সে থেকে এসেছে! তবে চরকা কাটা বুড়িকে চাঁদে দেখার প্রতিভাসের মধ্য দিয়ে, বাংলার তাঁতশিল্প ভারতের তাঁত ব্যবস্থা কতদূর উন্নত ছিল তা বোঝা যায়। চাঁদকে দূরে থেকে দেখলে যেমন আনন্দ লাগে, তেমনি সেই সময়কে আজ দূর থেকে দেখে যেন বিস্ময়ের সীমা থাকছে না আমার। সেই টিট্টিভ পাখির মতই জোছনায় উড়ে উড়ে যেন তারা ইশারা করছেন।

             আজ এতদিন পরেও সেই মহীয়সীদের বিস্তৃত আঁচলের পরিসরটি যেন অনুভব করা যায়। আঁচলের ঘ্রাণ কথাটি আমরা প্রায়ই শুনতাম। কথাটির কি সত্যিই কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে! আঁচলের ঘ্রাণ কি আলাদা করে অনুভব করা যায়! হয়তো সেই ঘ্রাণ আঁচলে লেগে থাকা হলুদ বা জিরের ছিঁটের। হয়তো সে পেরিয়ে অন্য কোনও প্রাচীনতার! তবু তার মধ্যে রয়েছে তাদের স্নেহ ভালোবাসা করুণা ও মমতার সেই দীঘল বিস্তার। চাঁদে চরকা কাটা বুড়ি না দেখলেও প্রতিনিয়ত লাল পাড় শাড়ি পরা ঠাকুরমা দিদিমাদের দেখেছি। এখন যদিও লাল পাড় শাড়ি পড়া সেই দিদিমা ঠাকুরমাদের আর কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। আক্ষরিকভাবেই তারা যেন চাঁদে চলে গেছেন, দুর্লভ প্রার্থিত বস্তু হয়ে উঠেছেন, তবু তাদের আঁচলটি যেন এখনও আকাশ ও মাটির ব্যবধানে স্নেহ ও মমতার প্রতীক-পতাকা হয়ে উড়ছে। 




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ