রাত্রির পাহারাদার

 

পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক বিখ্যাত পাগলদের নাম আছে। তালিকাটি নেহাত ছোটো নয়। আকর্ষনীয় তো বটেই। সক্রেটিস থেকে শুরু করে বামাক্ষ্যাপা কে নেই সেই তালিকায়। কবি, দার্শনিক, শিল্পী, ধর্মগুরু। পাগলামি নিয়ে কত বড় বড় তত্ত্ব রয়েছে। মিশেল ফুকো তো তার ইতিহাস লিখেছেন। এর ভেতরে রাষ্ট্র ও সমাজের উদ্দেশ্য, দৃষ্টিভঙ্গি ও ষড়যন্ত্রের সন্ধান করেছেন। এসব বড় বড় চিন্তাকে পাশ কটিয়ে আমাদের ছোটো ছোটো শহরগুলিতে আছে অনেক অখ্যাত পাগল। যাদের সবাই চেনে, ভালোবাসে। শহরের পরিচয় যেন ওরা। কোথাও যেন মায়ায় ঘেরা। যখন থাকে এরা, কত গুরুত্ব নিয়েই থাকে। কবে যে হারিয়ে যায়। চেনা দৃশ্য থেকে বাদ পড়ে যায়! কে আর তার হিসেব রাখে! যখন চুপ করে বসি মাঝেমাঝে মনে পড়ে তাদের মুখ। সেই উদভ্রান্ত অনির্দেশ্য অনির্ণেয় চাহনি

            ছোটোবেলায় তাদের রাস্তার ধারে, দিঘির পাড়ে, বাজারে, দোকানের বারান্দায় খিল খিল হাসতে হাসতে চিৎকার দিতে দিতে অথবা নীরবে হেঁটে যেতে দেখেছি। কই এরা এখন! তাদের নানা জনের নানা নাম। শহরের সবাই সে নামেই তাদের চেনে, ডাকে। তারা ছিল পরিচিত জন। শহর বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে কোথায় যেন হারিয়ে গেছে এরা। তাদেরকে কি কেউ গুম করে ফেলেছে 'উলঙ্গ রাজা'র সেই শিশুর মতন! কোথাও যাতে শহরের ভেতরের নগ্ন রূপ ধরা পড়ে না, সেজন্য।     

        শহর যত বড় হয় পাগলের চরিত্রও বদলে যায়। পাগলের সঙ্গে মানুষের চরিত্রও। বিশেষ করে যে নামগুলি মানুষ পাগলদের সম্পর্কে দেয়, সেই নামগুলিতেও আছে শহরের একটা সময়ের মানসিকতার প্রকাশ। যেমন আজকের শহরে কেউ 'মার বারিন্দ্র চেলি উড়াইয়া' কথাটি বলবে না। তবে এই নামে এক পাগল ছিল আমাদের ছোটোবেলার গ্রামীণ শহরে। কেন বলবে না? আজকের শহুরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তো আর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছে না। বাইরে কেলো ভাষায়, বিদ্যালয়ে ইংরেজিতে। এই বাক্যবন্ধের ভেতর ভাষাগত কারণে যে রসবোধ আছে, তা এরা অনুভব করতে পারবে না। সুতরাং আজকের শহরের পাগলদের নাম হতে পারে আরো অন্যকিছু, অথবা হতে পারে সে নামহীন। নামহীন কেন হয় সে! এর উত্তর আছে 'শহর কীভাবে বড় হয়'-এর মধ্যে। শহর বড় হলে ব্যবসা-বাণিজ্য, আর্থিক ক্ষমতা বাড়ে। বাড়ে নানারকম সুযোগ সুবিধা। এর সঙ্গে যেটা হয়, বাইরে থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমন। তারা নানা জন নানা কারণে আসে। নানা উদ্দেশ্যে আসে। শহরের সুবিধা নিতে তো তারা আসে, কিন্তু শহরের প্রতি টান বা মায়া তখনও গড়ে ওঠে না। সেটা হতে লেগে যায় দীর্ঘ সময়। শহরকে ভালোবাসলে তো পাগলের প্রতি টান অনুভব করা! পাগলের পরিচয় জানা। সুতরাং যত মানুষ বাড়ে তত অখ্যাত নামহীন হতে থাকে পাগলেরা। 

         এই শহরও অনেক ধরনের পাগল দেখেছে। রাত যত গভীর হয় তত কোথাও দেখা যায় তাদের। মনে হয় পাগলরা এক একটা যুগের প্রতীক। কালের ইতিহাসে হয়তো তাদের নাম প্রায়ই থাকে না। কিন্তু তাদের জীবনশৈলী, কথা বলা, দাঁড়ানো, হাসা বা কাঁদা এগুলো সময়েরই প্রতিক্রিয়া। আমার মনে হয় শরীর নয়, একটা শহরের আত্মার সঙ্গেই থাকে পাগলদের যোগাযোগ।

           কিছুদিন আগেও দুজন পাগল দেখতাম, একসঙ্গে ওরা ঘুরত সারা শহর। একজন একটু বেঁটে, আরেকজন লম্বা। দুজনেরই চুলে দাড়িতে ভূতুড়ে অবস্থা। কেবলই হাঁটত ওরা। রাত হলে কখনো কোনো এ টি এমের ভেতরে ঘুমিয়ে পড়ত। কিন্তু একা থাকতে দেখিনি কখনো। কী যে বলত পরস্পরে, ওরাই জানে। অনেকদিন পিছু নিয়েও কোনো কথা শুনিনি। তবে কোনো একটা সূক্ষ্ম সুতো ছিল নিশ্চয়ই। আমার প্রায়ই মনে হত, এ শহরের জীবন, জগত, মহাবিশ্ব, মানব সভ্যতা, মহাজাগতিক ব্যাপার স্যাপার নিয়ে ওদের কোনো দার্শনিক উপলব্ধি আছে। এই গূঢ় তত্ত্বকথা জগতের কাছ থেকে গোপন করে সন্ধ্যাভাষায় একে অপরকে প্রতদিন এরা বলে যায়। রবিশঙ্করের দোজখনামার গালিব আর মান্টোর মত ওরা যেন এ শহরের সক্রেটিস আর বাশো। একদিন শুনলাম সক্রেটিসকে ধরে নিতে এসেছে তার বাড়ির লোকজন। ওরা আসামের বাসিন্দা। ট্রেনে করে নাকি এসেছে এখানে। বাশো সেদিন কেঁদেছিল খুব। এরপর বাশো যে কীভাবে কোথায় হারিয়ে গেল, কেউ বলতে পারে না। আমি আজও সক্রেটিসের সেই উশকো খুশকো ঝাকড়া চুল, বস্তাকে চাদরের মত করে পরে একটা আঙ্গুল দেখিয়ে অনর্গল সামনের দিকে হেটে যাওয়া দেখতে পাই। তার পাশাপাশি বাশো, যেন নির্জন অথচ অনুগামী পথিক। হয়তো আমাদের এই অসার সংসারের দুঃখের কোন মৌলিক তত্ত্ব আবিষ্কার করেছিলেন এরা। কেবল তেমন কোন সর্বশব্দগ্রাহী কান না থাকার কারণে আমরা তা আর শুনতে পেলাম না।


        আরেক পাগল যে মূলত গাঁজা খেত, সে প্রায়ই নানা সবজি বা স্টেশনারি দোকানের সামনে আচমকা লাফ দিয়ে এসে বন্দুক তাক করত। বলাবাহুল্য বন্দুকটি কাল্পনিক। শুধু হাতের আঙ্গুলের উপর ভরসা করে সে অনবরত গুলি চালাত। যে জিনিসটি তার চাই, সে জিনিসের দিকে আঙ্গুল তাক করে সে কেবল ফুশ ফুশ শব্দ করতো। পরে তার নাম-ই হয়ে যায় 'সল্টু ফুশ'। মনে হতো, পৃথিবীর যাবতীয় চাওয়া-পাওয়ার জিনিস সে যেন বন্দুক দিয়ে শিকার করে নিতে চায়। তাকে দেখতে দেখতে মনে হয় কোথাও যেন আমরা কোন গভীর অরণ্যে ঢুকে গেছি। এই বাজার আসলে বিশাল অরণ্য, যেখানে বাঘ ভালুক থেকে শুরু করে বড় বড় ভয়াল সব জন্তুরা রয়েছে। শিকার ছাড়া সেখান থেকে কিছুই পাওয়া যাবে না। 

           ২০১৮ নির্বাচনের আগে আরেক পাগলকে আবিষ্কার করলাম, সে শহরের বিভিন্ন মোড়ে ট্রাফিক পয়েন্টের মাথায় উঠে বা ভেতরে দাঁড়িয়ে অনর্গল ভাষণ দিয়ে যায়। 'বন্ধুগণ, আজ আমরা এসেছি…' অদ্ভুতভাবে সে তখন ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন নেতা মন্ত্রীর নাম উচ্চারণ করে কথা বলে যায়। ন্যায় অন্যায়ের কথা বলে। এমন কি যে কথা বলতে কেউ সাহস করে না সে কথাও। পাগল বলেই হয়তো তাকে কেউ খেয়াল করে না, বা প্রশ্রয় দেয়। 

       ইদানিং তার জায়গা নিয়েছে আর এক গায়ক পাগল। অদ্ভুত তার কণ্ঠস্বর। মেলোডিয়াস। তার বাড়ি নাকি পদ্মপুরে। শোনা যায় কিশোর বয়সে সে নাকি বিভিন্ন ব্যান্ডের সঙ্গে গান গাইত। এখন সেসব স্মৃতি। একসময় পাগল হয়ে যায়। তার বাড়ি ঘর পরিবার সব থাকলেও এসবের দিকে তার নজর নেই। কিন্তু সব ভুলে গেলেও গানটা সে ভোলেনি। নয়ের দশকের গানগুলো, সেই কুমার শানু বা উদিত নারায়নের গান সে যখন চিৎকার দিয়ে গায় তখন পথচারীর সবাইকেই একবার ঘুরে দেখতে হয়।

      শৈশব থেকে শুরু করে পেছনের দিকে তাকালে, আমাদের বয়সের বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে সে সব পাগলেরা রূপকথার নায়কের মত অথবা কোন রহস্যপূর্ণ চরিত্রের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। পাগল চরিত্রটি একটা অদ্ভুত চরিত্র। আমি মাঝে মাঝে ভাবি সেক্সপিয়ারের নাটক থেকে শুরু করে সুমনের গান সব জায়গাতেই পাগলের একটা বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তারা যেন দেখিয়ে দেয় আমাদের বাঁধা জীবনের বাইরেও অন্য একটা জগত রয়েছে। রাষ্ট্র বা সমাজ তাকে বুঝতে পারে না। তারা হঠাৎ করে এসে রবীন্দ্রনাথের 'ভুল স্বর্গে'র নায়কের মত রাষ্ট্র বা সমাজের মধ্যে অনিয়ম তৈরি করে, শৃঙ্খলাকে ভেঙে ফেলে। দেখায়, কতটুকু অসার মানুষের বানানো পৃথিবী। 

          মস্তিষ্ক বিকৃতির সঙ্গে আসলে পাগলের সম্পর্ক সব সময় থাকে না। একটু এলোমেলো পোশাক, একটু বিশৃঙ্খল অবস্থা, আচরণে একটু ভিন্ন রকম একাকী মানুষকে সমাজ চিন্তাহীনভাবে পাগল আখ্যা দিয়ে দেয়। যেমন শৈশবে দেখা নিবারণ পাগলা। ভারী শরীর নিয়ে তিনি খুব সন্তর্পণে হাঁটতেন। তিনি আসলে পাগল নন, তার সঙ্গে কথা বলা যেত। আমরা কথা বলতাম, তিনি উত্তর দিতেন। নিবারণ তার শরীরের ঝুলিয়ে রাখতেন কুলো থেকে শুরু করে পুরানো ডিবি, ছাতা, লাঠি থেকে সংসারের কাজে লাগা যাবতীয় সরঞ্জাম। কী নেই সেখানে! ইচ্ছা করলে যেমন প্রাচীন পুঁথির টুকরা পাওয়া যেতে পারে, তেমনি পাওয়া যেতে পারে সাধারণভাবে রক্ষিত পরশ পাথর, কোনো অনামা গাছের বীজ, ছাল। প্রায় উলঙ্গ। এইসব জিনিসেই হতো তার লজ্জা নিবারণ। যেন চলমান সংসার।  তাকে দেখে মনে হতো তিনি যেন সব জানেন। যেন এই সভ্যতার লোক নন, মহেঞ্জোদারো হরপ্পা থেকে উঠে এসেছেন হয়তো বা বটবৃক্ষের মত কেউ। তার ঝুরি নেমে গেছে অজস্র। মাঝে মাঝে মনে হতো এই শহরের পুরনো দলিল পুরানো নথি তার হাতেই আছে। সব যেন তার নখদর্পণে। তিনি যেন সমস্ত শহরটি তার বিশাল শরীরের মধ্যে নিয়ে নিয়ে ঘুরছেন। মৃদু হাসতেন তিনি। কথা বলতেন অল্পই। হয়তো উপযুক্ত শিষ্য খুঁজতেন। যদি পেতেন তবে হয়তো তিনি তার যাবতীয় মন্ত্র যাবতীয় অনুসন্ধান দিয়ে যেতে পারতেন। তিনি যদিও অন্ধ, সমস্ত শহরটিকে চিনতেন হাতের তালুর মত। এমনকি শহরের অনেক মানুষের নামও জানতেন। পিতার মতন নাম ধরেই ডাকতেন। সামনে এসে কথা বললে ঠিক বলে দিতেন, 'রমেশ?' সারা দিন ঘুরে বেড়াতেন গলি থেকে রাজপথ, বস্তি থেকে বাজার। 

         শহর অনেক বদলেছে। সেই পুরানো গ্রামসুলভ চেহারা ঘুচে যাচ্ছে এক এক করে। অনেক কিছুই নেই। অনেক কিছুই নতুন। এখনও মনে হলে ভাবি, তার শরীরে ঝোলানো যাবতীয় জিনিসপত্রের কথা। হয়তো এসব বাতিলের খাতায় চলে গেছে অনেক আগেই। এই শহরও হয়তো ভুলে গেছে তার নাম। বাল্বের হলুদাভ আলো পেরিয়ে আমরাও চলে এসেছি সাদা আলোর ভেতর। এত ঝা চকচকে স্ফটিক আলোতে তিনি থাকলেও হতেন বেমানান। এখন অজস্র গাড়ি বাইকের ভিড়ে তার সেই ধীর হাঁটাও হয়তো অস্বাভাবিক হতো। তবুও গভীর রাত্রে কখনো সুনসান পথে একাকী বাড়ি ফিরে যেতে যেতে কাউকে ধীর পায়ে এমনভাবে হাঁটতে দেখলে মনে হয় নিবারণ নন তো! কেন জানি মনে হয়, পাগলেরা মরে না। রাত্রি গভীর হলে সুন সান পথে একাকী বেরোন তারা। পাহারা দেন। সবাই ভুলে গেলেও শহর তাদেরকে ভোলে না। কারণ একটা শহরের বেদনার উৎস সে-ই হয়তো জেনেছিল।




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ