গাছের মেঘ, মেঘের পাখি
গাছের সঙ্গে থাকে পাখি। পাখির সঙ্গে মেঘ। মেঘের সঙ্গে থাকে ছায়া। একদিন ছায়া বড় হয়। ক্ষেত খামার নদী বন লোকালয়, সমস্ত জনপদ ঢেকে যায়। নামে বৃষ্টি। দিনভর রাতভর অবিরাম বৃষ্টি। মনে হয় কোনো নাম নেই, ঠিকানা নেই। বৃষ্টির জলের মতন আমরা সবাই গৃহহারা, উদ্দেশ্যহারা। ঝরে গেলেই সার্থক জীবন। গাছ ভেজে। পাখি উড়ে যায় না। কেবল উঁচু ডালে বসে বসে ভেজে।
বাঁশের ঘর। বরফি কাটা জানালায় বসে আছি। আমার সমুখে কালো টেবিল। টেবিলে খোলা রুলটানা খাতা। কিছু কি লিখছি! গভীর মেঘের ছায়ায় আচ্ছন্ন দিন। অবিশ্রাম ধারাপাতে ক্লান্ত অবসন্ন দিন। এখন সকাল না দুপুর, কে জানে! জানালা দিয়ে দেখা যায় কালো পুকুর। চারদিক ঘিরে অনেক রকম গাছ। পুবদিকে সুপুরি, লুটকি,বেত ও ডুমুর গাছের জঙ্গল, উত্তরে আম, কাঁঠাল, নারিকেল, লুকলুকি ও কচু বনের বিস্তার, পশ্চিমে বড়ই, জাম, কামরাঙা আর বাঁশবনের দুর্ভেদ্য মায়াজাল। যেন অরণ্য। বৃষ্টি পড়ছে। কোথাও একটুকু ফাঁক নেই। সমস্ত পৃথিবী জুড়েই যেন বৃষ্টি। এমন একটানা বৃষ্টি দেখলে নির্জন মৌনী তপস্বীর মত মনে হয়। যেন বাইরে চোখ বুজে বসেছেন ধ্যানে। আর কোনও প্রবাহ নেই। আর কোনো চিন্তা নেই। শুধু একাকী ঝরে যাওয়া। মৌনী, কেন না বৃষ্টিজাত এই ধ্বনি এখন বুঝি অন্তরের সম্পদ হয়ে গেছে। বৃষ্টির শব্দ যেন সত্ত্বার অংশ হয়ে গেছে। আর কোনও বিরুদ্ধ শব্দ নেই। নিবিড়তা ভঙ্গ হবে এমন কোনও আয়োজন নেই। আমি যেন আমিতে নেই।
বৃষ্টির কথা ভাবলেই এই যে ছবি ভেসে ওঠে, এ কি আমার শৈশবের! না গত জনমের। যেন স্মৃতির ওপার থেকে সে আসে। আর বড় হয়ে পড়া বিদ্যাপতির পদটি স্মৃতিবাহী মনে পড়ে।
'সখি হে হামারি দুখের নাহি ওর
এ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর
ঝম্পি ঘন গরজন্তি সন্ততি
ভুবন ভরি বরিখন্তিয়া
কন্ত পাহুন কাম দারুন
সঘনে খর সর হন্তিয়া
কুলিস কত শত পাত মোদিত
ময়ূর নাচত মাতিয়া
মত্ত দাদুরি ডাকে ডাহুকি
ফাটি জায়ত ছাতিয়া'।
ভাবি, এই জলছবি এখনও রয়ে গেল কিনা! সময়ের কোনও এক ভাঁজে এখনো কি আছে! সেই বরফি কাটা বাঁশের জানালা দিয়ে দেখা ভ্রমরকালো পুকুর, সেই প্রায় অরণ্য, দিগন্তবিস্তৃত মেঘের ছায়া আর সারাটি ভুবন জুড়ে বৃষ্টি। প্রকৃতি কত কাছে। মনে হয় আমি তার সন্তান। সে আমার মা। মাঝেমাঝে জলের গুঁড়ো গুঁড়ো কণা আমার খাতার পাতা ভিজিয়ে দেয়। রুলটানা খাতা দেখে মনে হয় সদ্য আল দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টির অপেক্ষা ছিল। এখন জমি প্রস্তুত। বীজ লাগানো যাবে। বিদ্যাপতির পদটি ভাবি। সারাটি ভুবন জুড়ে বর্ষা। সে কি সত্যিই সম্ভব! সারা পৃথিবী জুড়ে একসঙ্গে বৃষ্টি! মাঝে মাঝে প্রচণ্ড গর্জনে বিদ্যুৎ চমকায়। এক অতিজাগতিক মহাজাগতিক লীলা। প্রকৃতিই এখন প্রধান। মানুষের সব কাজ সব কৃতি তুচ্ছ হয়ে যায়। বিদ্যাপতি বলছেন আনন্দে ময়ূর নাচে। না, ময়ূর নেই কোথাও। তবে ডাহুক আছে, আছে কাক বক চড়াই আর শালিখ। আর আছে দৃশ্যধ্বনিময় শুধু এক বিস্ময়ের বোধ। অবিরাম শ্রাবণে কি দুঃখবোধ আসে! আমি কি দুঃখিত। শূন্যতাও কি জাগে! বৃষ্টি কি মনে করিয়ে দেয় তুমি অপূর্ণ, তুমি অসম্পূর্ণ। নইলে বিদ্যাপতি এমন লিখবেন কেন! সেই মুগ্ধ বালকের মনে কি সেই বোধ আসা স্বাভাবিক? না কি এই ভাবনা আমার পরবর্তী সময়ে রচিত। হতেই পারে। কিন্তু সেই অতিশৈশবে বর্ষণরূপমুগ্ধ বালকের বিস্ময় তো আর সারা জীবনে কাটল না।
একটি অ্যাকুরিয়ামের মত ঝা চকচকে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। সুসজ্জিত পোশাক পরিহিত যুবক যুবতীরা ভেতরে ঘোরাঘুরি করছে। একালের ডাহুক ডাহুকি। হাতে মোবাইল। কানে ইয়ার ফোন। কেউ তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। ড্রেন থেকে গল গল করে উঠছে কালো ময়লা জল। ভেসে যাচ্ছে রাস্তা। ভেসে যাচ্ছে পুরানো চিপসের প্যাকেট থেকে শুরু করে প্ল্যাস্টিকের কৌটা, ছেঁড়া জুতা, বোতল। এখানে কোথাও ছিল সেই বন। এখানে কোথাও ছিল সেসব গাছ। উড়ত নাম না জানা পাখিরা। শঙ্খ ঘোষের কবিতাটি মনে পড়ে।
'আমার দু:খের দিন তথাগত
আমার সুখের দিন ভাসমান
এমন বৃষ্টির দিন পথে পথে
আমার মৃত্যুর দিন মনে পড়ে।
আবার সুখের মাঠ জলভরা
আবার দু:খের ধান ভরে যায়
এমন বৃষ্টির দিন মনে পড়ে
আমার জন্মের কোনো শেষ নেই।'
কে আমার ব্যথার কারণ বলে দেবে? এই তাপিত জীবনের কোথায় সেই দুঃখবোধের উৎস। আমি কি হারিয়েছি? কাকে হারিয়েছি? কে ছিল আমার? শ্রীরাধার মত আমারও কি কোন প্রেমিক ছিল? টুকরো টুকরো হয়ে বুঝি বেঁচে আছি! বিছিন্নতার বোধ আমাকে কাতর করে তুলছে। নাড়িছেঁড়ার যন্ত্রণা আমাকে আমার থেকে দূর করে তুলছে! হ্যাঁ আমার মৃত্যুর দিন মনে পড়ে। হ্যাঁ আমার জন্মের কোনো শেষ নেই।
দূর দূর থেকে আসে মেঘ। আমার তো পূর্বমেঘ উত্তরমেঘ কিছুই নেই। শৈশবের জলকণাগুলো কোথায়! সেইসব ঝুরি নামানো দিন এখন স্মৃতি। গাছ থাকলে বৃষ্টি আসে। প্রায় অরণ্য হয়ে থাকা সেই মফস্বলে গাছ এখন আর নেই। ক্ষেত, পুকুর ভরাট করে উঠছে উঁচু উঁচু ম্যানসন। সেখানে বড় কোনো গাছ নেই। সেই ছায়া নেই কোথাও। তবু বৃষ্টি আসে। পাখি বলতে কাক। তবে বড় বড় ঘরের দেওয়াল ভেদ করে সেই ধ্বনি আর ভেতরে প্রবেশ করে না। কখন বৃষ্টি আসে, কখন চলে যায় কেউ বলতে পারে না। দু তিন গণ্ডার জীবন। কোথায় লাগানো যাবে গাছ। কোথা থেকে আসবে সেই ছায়া। গাছ বলতে বাড়ির সামনে এখন বড়জোর ভিন্ন প্রজাতির আম- আলফানসো, আম্রপালি, দেবদারু। সিমেন্টের বাঁধানো বেদি। তবে ফুল আছে নানা প্রজাতির। ডালিয়া, গ্ল্যাডিওলাস, পিটুনিয়া থেকে শুরু করে কত জাতের অর্কিড। রঙ বেরঙের। নাম শুনলেই বুঝা যাবে সব বিদেশি। এ এক বড়সড় পরিবর্তন। দেশি কুকুরের জায়গা যেমন নিয়েছে ঘরে ঘরে বিদেশি কুকুরেরা, তেমনি গাছের জগতেও এসেছে বনসাই কত শত গাছ। নেই সেই দেশি নাম- লুকলুকি, ডুমুর, জাম। সরতে সরতে হারাতে হারাতে সে যেন কোন গভীর অরণ্যে মুখ বুজে নির্জন দাঁড়িয়ে আছে।
বৃষ্টিরও কি কোনো পরিবর্তন হয়েছে! বিদ্যাপতির বৃষ্টি আর আমার বৃষ্টি কি এক! আমার শৈশবের বৃষ্টি আর যৌবনের বৃষ্টি কি এক! আজ যে বৃষ্টি পড়ে, সে কি বিদেশি! দৈত্যাকার অট্টালিকা থেকে মনে হয় সেই তাল তমালের দিন শেষ। সেই বনটিয়া, ডাহুকের দিন শেষ। সভ্যতার আদি থেকে মত্ত দাদুরি শুধু ডেকে যায় কোথাও। জলের তো কোনো রঙ নেই। শুধু বৃষ্টি এলে কোথাও জানালায় খুঁজি কোনো অতর্কিত মুখ। তিনতলার জানালায় এখন যেমন মুগ্ধ বালকটি। আমার যেমন ব্যথার বোধ জেগে উঠছে, তারও কি তাই! আমার যে শৈশবের স্মৃতি ভেসে আসছে, তার কোন সময়ের! আমি যেমন পূর্ণ হতে পারলাম না, সেও কি অনুভব করতে পারছে তার অপূর্ণতাগামী আসন্ন জীবনের ব্যথা। তার জানালার সামনে বড় ডালিয়াটি যে আমি। তার দিকে তাকিয়েই আছি বিস্ফারিত চোখে। বিস্ময় তবু কাটে না।


দারুন
উত্তরমুছুন