হারানো স্কুটার
দু'টি বাঁশের চোঙা। বাদামী রঙের তেল চিক চিক। একটা মোটা, একটা সরু। একটা চুলার মুখে, অন্যটি উপরে ডেকচি বসানোর জায়গায় ৪৫° এঙ্গেলে বসিয়ে কাঠের গুঁড়ো দিয়ে ভালো মতন জাঁক দিয়ে তারপর ধীরে আলগা করে বের করে আনা হত চোঙা। একটু এদিক সেদিক হলে ভেঙে পড়ত জাঁক। কাগজ বা শুকনো বাঁশপাতায় আগুন লাগিয়ে মাঝে ছেড়ে দিলেই ধিকিধিকি ধরত আগুন। এসব জটিল শিল্পকাজ ও রোমাঞ্চকর অভিযানের ভেতর দিয়ে রান্নাপর্ব সমাধা করতেন মা। কাঠের গুঁড়ো আনা হতো বস্তা দিয়ে কেবিনেট থেকে। পেছনে ডাঁই করা থাকত। করাতের গুঁড়ো। মায়ের সঙ্গে আমিও। ছোট হাতে যতটা সম্ভব। কাঠের গুঁড়ো ছাড়া আরেকটা ছিল 'রান্দার চেলি' বলতাম অর্থাৎ কাঠ পালিশ করার জন্য র্যাঁদা দিয়ে ঘষলে কাঠ থেকে যেটা বের হয়। ঘরের ভেতর শক্তিপদ ব্রহ্মচারীর ‘মনসামঙ্গল’ কবিতার সাতনরি শিকা। আমরা বলি ছিক্কা। রান্নাঘরে বিদ্যুৎ ছিল না। কুপিবাতি। সে যেন আলতামিরার পরিবেশ। বড় ঘর বলতাম যেটাকে– মূলত রান্নাঘর ছাড়া একটাই ঘর, তার জানালা বলতে বেড়ার গায়ে বরফি কাটা। বাঁশ দিয়ে ঠেলে উপরের দিকে তার ডালা উঠিয়ে দিলে খুলে যেত। দূরে কালো জল পুকুর। বাঁদিকে বাঁশবন, পিচণ্ডি, লুটকি, ডুমুর গাছের দুর্ভেদ্য জঙ্গল। ওপারে কচুবন। এরপরে ক্ষেত। আকাশ নেমেছে দূরে।
দূরে মানুষের বাড়িঘর। তাকাতে তাকাতে মন উদাস হয়ে যায়। কত কী যে ভাবে! চোখ ফেরালে ঘরের ভেতর দেখা যায়, জানালার উপরে ক্যালেন্ডার। সতী কাঁধে নিয়ে শিব। অথচ তার চোখেমুখে আশঙ্কা কিংবা ক্রোধের লেশমাত্র নেই। বরং আরো কীসব ভাবনায় উদ্বেল। চেয়ারে উঠে দাঁড়ালে সতীকাঁধে শিবের ছবিটি ঘিরে দেখা যায় ছোটো ছোটো আরো অজস্র ছবি। একান্ন পীঠের নানা জায়গার নাম ও তার ছবি। তবে ফটোগ্রাফ নয়, সবই আঁকা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। ত্রিপুরেশ্বরী দেবীর মন্দিরের কথা পাই কি না! হ্যাঁ ঐ তো লেখা, সঙ্গে পায়ের ছবি। আমার রাজ্যের নাম ক্যালেন্ডারে লেখা, সেটাই যেন বেশ বড় কিছু। উদ্দীপনায় বসে পড়ি। চেয়ারটি নড়বড়ে। টেবিলটিও। তার গায়ের রঙ কালো। গামাই কাঠের টেবিল। পুরনো। মাঝখানের তক্তা ওঠানো যায়। ড্রয়ারে কলম, রিফিল, ছবির সংগ্রহ, কয়েকটি পয়সা ছাড়া আরো কত কী। ড্রয়ার না খুলে তক্তা তুলে রেখে দিই, যা রাখতে চাই।
টেবিলে খোলা মধুসূদনের কবিতা ‘রসাল ও স্বর্ণলতিকা’। বেশ মনে আছে, কবিতাটিতে আছে ঝড়ের ছবি। রসালকে স্বর্ণলতিকার পাশে কি অসহায় লাগে! রসাল যেন পুরুষ, স্বর্ণলতা মেয়ে। মনে হতো বিপর্যস্ত মহাদেব পড়েছেন যুদ্ধের পরে মাটিতে মাথা লুটিয়ে, আর গৌরী মানে কালী তখনো অজেয়। পা রেখে দাঁড়িয়ে, অথবা জড়িয়ে আছেন।
উঠোনের এককোণে বড়ই গাছ। টুস টুস করে থেকে থেকে পড়ত। রাত্রি বেলায়ও। পাকা টসটসে হলুদ। উৎসারিত সেইসব স্বর্ণের বিস্ময়। বাড়িতে ঢোকার মুখেই একটা করবী গাছ। হলুদ করবীসখীরা দিনমান ফুটে থাকত। তার নোয়ানো ডালের নিচে একটা চাকাহীন ভাঙা সবুজ স্কুটার। গদিহীন। বসার সিটটি আছে। সেখানে বসে ভো ভো করে চলে যাও যেখানে ইচ্ছা নিরুদ্দেশে। সেই চাকাহীন স্কুটারটি যে কোথায় না গেছে! উল্টোদিকে সেলফিশ জায়েন্টের সেই ফুলবাগান। যদিও ফুলহীন। তবু আলো-আঁধারি, শীতল ছায়া আছে কোথাও। পা ছড়িয়ে বসে যাও। সাদা সাদা কীসব ফুল পড়ে আছে নিচে। শুয়ে থাকো তার পাশে যতক্ষণ মন চায়।
দুপুরের রোদে শীতের আগে মা, পাড়াতুতো মাসিরা মিলে নানা রঙের ওলের বল নিয়ে কাঠি চালাতে ব্যস্ত। সেইসব অবসরে বিকেলে এলোমেলো ঘোরা। রাত্রিতে কাগজ কেটে আঠা লাগিয়ে ঠোঙা বানানো। মায়ের সঙ্গে আমিও। মাঝেমাঝে কাগজে নানা রঙের ছবি, গল্প পড়া। সে এক অপূর্ব দিন। রাতে কখনো খড়ের চালের উপর ধুপ করে পড়ত বন বিড়াল। সারাবাড়ি ভরে যেত পায়েসের গন্ধে। দূরে শোনা যেত শেয়ালের ডাক। ক্ষেতের ভেতর। একটি, দুটি, তিনটি। পুকুর থেকে অবিরাম ব্যাঙের ঘেঙর ঘেঙর, ক্র্যাক ক্র্যোয়াক। কেমন ভয় ভয় করত। হঠাৎ ঝপাস করে পুকুরে পড়ত ডাব। নির্জন রাস্তায় বাজার ফেরত লোক চিৎকার করে কথা বলতে বলতে যেত। কেউ হয়ত সাইকেল ঠেলে সঙ্গীদের সঙ্গে। মধ্যে ক্রিং ক্রিং করে বেল বাজিয়ে চলে গেল কেউ সুর তুলে গান গেয়ে। কোনো একটা অজানা সুর। জোরে রেডিও বাজিয়ে যাচ্ছে কেউ হেঁটে হেঁটে। খবর শুনছে। আমরাও উৎকর্ণ হয়ে অপেক্ষা। বাবা এখনো আসেনি। চমৎকার সব আয়োজন। সেই অদ্ভুত পৃথিবী এই জীবনের নয়। দ্রুত ধাবমান। নক্ষত্রপথে ফুরিয়ে যাওয়া।
বেশ রাতে বাইরে গেলে দেখা যেত অন্ধকারে নীরবে জোনাকি উড়ছে। উড়ছে তো উড়ছেই। পৃথিবী থেকে কতদূরে একপ্রান্তে যেন এই ছোট্ট জীবন। পাখির মতন। সেই রন্ধন শিল্প, সেই নিস্তব্ধ পথঘাট, হ্যারিকেন দোলানো চলা, বুঝি বিগত শতাব্দীর। এইসব ছবির কুশীলবরা আজ কোথায়! সবই যেন কালের গর্ভে বিলীন। আজ কোথাও তার কোনো চিহ্নই নেই। কেবল স্বপ্নের ভেতর দেখি রয়ে গেছে চাকাহীন উদাসীন ওই স্কুটার। ছুটছে তো ছুটছেই। ছায়াপথ পার হয়ে।



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন