গোধূলির সোয়েটার
ছোটোবেলায় গোধূলি ছিল। আজকের মতই হয়তো। তবু ভাবি, আজকের গোধূলি আর তিরিশ পয়ত্রিশ বছর আগের গোধূলি কি এক? কোনো বদল হয়নি তার? শরৎ পেরিয়ে এসেছি। শীত আসন্ন। আমি দুপুরে খেয়েদেয়ে ঘুমের সঙ্গে বাধ্য হয়ে ডুয়েল লড়ছি। পশ্চিমের বেড়ার উপরের দিকে ছনের চালার নিচে বাঁশ পুরনো হয়ে আরো বড় ফাঁকের সৃষ্টি হয়েছে। সেদিকে দিয়ে আলো এসে পড়ছে আমাদের ঘরের মাটির মেঝেতে। মেঝেতে মায়ের নানা কারুকাজ। সুপুরির খোল কেটে নানা রকমের ডিজাইন করে কাদামাটি দিয়ে ঘর লেপার সময় মা সমস্ত মেঝেটিকে সাজিয়েছেন। কোথাও জলের ঢেউ। কোথাও মাছের ঝাঁক, কোথাও লতা, ফুল, পাতা, কোথাও ধানের শীষ। সবই অস্পষ্ট। হাল্কা ছাপ। শুকিয়ে সেগুলো যেন আরো অস্পষ্ট। এখন এক পাশ থেকে আলো পড়ায় সেই গোপন ছবিগুলি তার সমূহ জগৎ নিয়ে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে। এমন আশ্চর্য তো আগে দেখিনি। তাকাতে তাকাতে তন্ময় কিশোরের মুখে পড়ছে আলো। তার বিছানার প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে নানা আকারের আলোর টুকরো। টুকরোগুলো আরো হলুদ হতে হতে এখন কমলা রঙ। কাঁপছে। পশ্চিমের নারিকেল গাছের ঝালর টুকরোগুলোকে সজীব করে তুলেছে।
বাইরে মা তার পাড়ার সঙ্গীদের নিয়ে রোদের দিকে পিঠ রেখে পাটির উপর বসেছেন। মুখে পান। সারা দিনের পর তৃপ্তির বৈঠক। হাতে দুটো কুরুশ কাঠি। সোয়েটার বুনছেন আর গল্প করছেন। দুটো ওলের বল গড়াতে গড়াতে মাটিতে। সুতোর টানের সঙ্গে অস্থির ওলের বল দুটো এদিকে ওদিকে ছোটাছুটি করছে। ওলের বল দুটোর রঙ কী? আমি বেড়ার ফুটোয় চোখ লাগিয়েও ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না। হয়তো লাল সবুজ। হয়তো গোলাপী নীল। হয়তো সাদা আকাশী। গোধূলির রঙ লেগে তাদের চেহারা প্রায় এক। উঠোনের এক কোণে বড়ই গাছ। মরে যাওয়া আলোয় তার ছোট ছোট পাতায় দীঘল উঠান জুড়ে ঝিলিমিলি সৃষ্টি করেছে। আর পারি না। বাইরে আসি।
গোধূলি একটি রহস্যময় কাব্যগ্রন্থ। যখনই এর মুখোমুখি হই, একটা অজানার বোধ, আবিষ্কারের আনন্দে মন শিরশির করে। মনে হয়, এর না জানি কত পাতা। এক একটি পাতায় গোধূলির এক এক রকম অদৃষ্টপূর্ব ছবি। প্রতিটি পাতাই আসলে এক একটি স্তর। এক একটি পর্যায়। এই যে সোনালি রঙ, সে ঐসব অপঠিত আশ্চর্যময় পাতার ভেতর দিয়ে অজস্র পথ অতিক্রম করে বাইরে ঠিকরে পড়েছে। চারদিকে ছড়ানো এই যে প্রকৃতি, আকাশ, গাছপালা, মানুষ সব আলোর ভেতর দিয়ে কেমন সুরেলা সুদূর হয়ে উঠেছে। তার সব পৃষ্ঠা কি আমি পড়তে পারব? সেসব পৃষ্ঠায় সাংকেতিক ভাষায় লেখা পৃথিবীর সবচাইতে আশ্চর্য কবিতাগুলি কি আমি বুঝতে পারব? কুহেলিময় সেসব কবিতার একটি ছুঁতে পারলেই জীবনের হৃত বিশ্বাস ফিরে আসে। একটি পৃষ্ঠা আবিষ্কারের আনন্দেই জগতকে ভালো লাগতে শুরু করে। মনে হয় এর ভাষা, এর অক্ষর আলাদা। কিন্তু তার আবেদন আমার মনের ভেতরে অনিঃশেষ যাত্রার সূচনা করেছে। প্রথম পৃষ্ঠা খুলেই কী দেখতে পাব? কার মুখ?
আমার গোধূলি হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। রাস্তার দু ফুট উপর দিয়ে আমি ভেসে চলি। ভাসতে ভাসতে সেই যেখানে সার সার সুপুরি গাছের মাথা সমস্ত শহরটিকে ঢেকে রেখেছে সেখানে গিয়ে থামি। সুতো কাটা ঘুড়ির মত হাওয়ায় ভেসে থাকি। সে কতক্ষণ জানি না। নিচে রিক্সা চলে যায় ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে। যাত্রিহীন। অথবা সাইকেল। ক্রিং ক্রিং। জনশূন্য রাস্তায় ধীরে সন্ধ্যা নামার আয়োজন। সে যেন গত শতাব্দীর কোনো শহর। ঐ যে দূরে মাঠ পার হয়ে কালভার্টের পাশে দোকান– সেখান থেকে বাজছে রেডিও। কৃষি সমাচার। আর কেউ নেই কোথাও। দলা দলা কুয়াশা দোকানের পেছনে প্রান্তর থেকে যেন বেয়ে আসছে। আসছে বললে ভুল। এখনো আসেনি। মাঠের উপরে যেন আলগোছে ভেসে আছে। যেহেতু এখনো সূর্য গোলাপি রঙের একটি বিশাল বলের মত ভাসমান, তাই সাহস করছে না শহরে ঢুকতে। কিন্তু দিন নিভে গেলে এর গেরিলা আক্রমণ থেকে বাঁচার আর কোনো পথ নাই।
ফিরে আসি। আমার মাথার ভেতর গোধূলি। যেন এই ছবি এই পৃথিবীর নয়। আমিও যেন এই গ্রহের নই। মাথা আমার অনন্তে। পা পাতালে, শরীর হাওয়ার শূন্যতায়। গোধূলির সোনা ঠিকরে ঠিকরে পড়ছে। কার সঙ্গে তুলনা হতে পারে এই অতিজাগতিক দিনান্তের!
তিরিশ বছর আগে দেখা সেই গোধূলি আজ ফের মনে পড়ে। আজ আমি ক্লদ মোনের আঁকা 'ডাস্ক' ছবিটি দেখছি। তিরিশ বছর আগে দেখা সেই ছবির সঙ্গে আরো আগে সৃষ্টি হওয়া শিল্পকর্মের যোগসূত্র কোথায়! আছে হয়তো। অথবা নেই। সবই আমার অতি কল্পনা। অথবা স্বপ্ন। স্বপ্নই তো। একদিন যে বেঁচে ছিলাম, সে এখন স্বপ্নই। একদিন যে পথে পথে সেই গোধূলির স্বর্ণ খুঁজে খুঁজে ফিরেছি, সে তো বাস্তবতা হারিয়েছে। সেই ধূলি, সেই গাছ, সেই ঘর, সেই জনমানুষ। কেউ কোথাও নেই। অথচ গায়ে সেই তিরিশ বছর আগের গোধূলি মিশে আছে। সেই গোধূলি কোথাও কি নেই! সে সময় যে মেয়েটি সবেমাত্র ফ্রক ছেড়ে শাড়ি ধরেছে, তারও সেদিন ছিল অবাক করা চোখ। সেও তাকিয়েছে আকাশের দিকে। এ গলিতে সেদিন হয়তো কেউ ছিল না। একটি প্রায়কিশোর হেঁটে হেঁটে গেছে গোধূলির ভেতর। যেতে যেতে তার অবাক করা চোখের ইশারায় হয়তো অর্থহীন তাকিয়েছিল। প্রকাণ্ড গোধূলির ভেতর তাকিয়ে সেই প্রথম হয়তো সুন্দরকে আলাদা করে বুঝতে চেষ্টা করেছিল। সে এখন কোথায়! সেই মেয়ে আর গোধূলি মিলে মিশে একটি অসীম ছবি। সেই ছবির ভেতর থেকে সোনালি রঙ ছেলেটিরও বাড়ি যাবার সারাটা পথ রাঙিয়ে দিয়েছিল।
এখন হয়তো আরও আরও ঘরবাড়ি, বহুতল উঠে তার রঙ শুষে নিয়েছে অনেকটা। আরো আরো গাড়ি, ধোঁয়ায় তার আভায় এসেছে মলিনতা। সেই নির্জন বিকাল ভেঙে এখন একাকী গলিতেও হয়তো বাইক আর গাড়ির অভ্রভেদী চিৎকার। কিন্তু তিরিশ বছর আগে দেখা সেই গোধূলি এখনো কাউকে ঘুমোতে দেয় না। এখনো বিকেলবেলা ঘর ছাড়তে বাধ্য করে। পাগলের মত ঘোরায়। তার রঙ এখনো স্মৃতি-উজ্জ্বল। মায়েরও হয়তো বয়স হয়েছে। তার সঙ্গীসাথীরা কে যে কোথায় সরে গেছে, জীবনের আরো কোনো জটিল সমস্যায় তারা হয়তো ক্লান্ত। অবসন্ন। সেই বিকালের কথা হয়তো কারো মনে নেই। কিন্তু দৃষ্টিমুগ্ধ কিশোরের স্মৃতিতে এখনো সজাগ সেই বিকাল। ঠিক, কেউ হয়তো এখন আর সোয়েটার বোনে না। দ্রুতগতির জীবনে এইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মায়ামাখা কাজগুলি হয়তো অর্থের বিনিময়ে শপিং মলের হাজারটা শীতবস্ত্রের ভেতর হারিয়ে গেছে। কিন্তু গোধূলিমাখা সেই ওলের বল দুটি আজও মহাকাশের গ্রহের মত ঘুরে ঘুরে চলেছে মালিকহীন। ঠিকানাহীন। কোনো নির্জন পথে একাকী কোনো কবি যখন একটু সুন্দরের খোঁজে বেরিয়ে পড়ে, তখন তারা গোধূলির সোয়েটার হবার আশায় পিছু পিছু ঘোরে। দুটো কুরুশকাঠির অভাবে, দুটো হাতের অভাবে সে কাজ আর হয়ে ওঠে না।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন