কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ

  বিয়েপর্ব শেষ। স্ক্রিন খোলা হচ্ছে। এতদিন সমস্ত বাড়িটায় সূর্যের আলো ঢুকতে পারেনি। আজ হঠাৎ যেন বেশি আলো। আত্মীয় স্বজন যারা এসেছিলেন, ফিরে যাচ্ছেন এক এক করে। রজনীগন্ধার থ্যাতলানো কুঁড়ি পড়ে আছে যত্রতত্র। গোলাপের কয়েকটি লালকালো পাপড়ি। আজ সকাল থেকেই মুখ গোমড়া আকাশ। এখন টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। অসময়ে বৃষ্টি! ফাল্গুন মাসের শুরুতেই। সবাই বলছে আবার ঠাণ্ডা পড়বে। প্রকৃতি যে নষ্ট হয়ে গেছে, এ তার প্রমাণ। কিন্তু কিরণ বিশ্বাস করে তার মন যেমন হয়, আকাশও তেমন। আজ তার মন খারাপ। 

               মন খারাপ হলে কিরণ রবীন্দ্রনাথ শোনে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা। রবীন্দ্রনাথ তার কাছে আসে। চুপিচুপি। এমন দিনে তারে বলা যায়, এমন ঘনঘোর বরিষায়। এইসব দিনে বর্ষায় একাকী হলে রবীন্দ্রনাথ তার পাশে বসতেন। তার সৌরকান্তি মুখ দেখে কিরণের শরীর মন শির শির করত। সে উত্তেজনা অনুভব করত। একদিন দরোজা খোলা। বাইরে বসন্তের পাগলা হাওয়া। কিরণ ঝুঁকে ঝুঁকে ক্যামিস্ট্রি পড়ছিল। দুদিন পর পরীক্ষা। খুব টেনশন। তিনি এলেন। সারাঘর কেমন একটা অপূর্ব গন্ধে ভরে গিয়েছিল। কিরণের চোখ বুজে বসেছিল। একটু পরে তিনি কাঁধে হাত রাখলেন। পেছনে তাকিয়ে দেখে , মৃদু হাসছেন। কিরণ যথারীতি উত্তেজিত। তার দরবেশের মত পোশাক। মসৃণ আধপাকা দাড়ি তার ঘাড় ছুঁয়ে আছে। কিরণ নির্লজ্জের মত প্রশ্ন করে আপনি আমাকে ভালোবাসেন? তিনি কিছু বললেন না। মৃদু হাসলেন। যদি নাও বাসেন আমি কিন্তু বাসি। আর শুনুন যে ভালোবাসার কোনো কারণ থাকে না, সেটাই শুদ্ধ। আর শুদ্ধ ভালোবাসায় ভালোবাসাটাই মুখ্য, আর সব… আপনিই তো বলেছেন’-- মাঝেমাঝে কিরণ ভাবে এটা কি তার রোগ! এই যে কবির সঙ্গে তার নিয়ত দেখা হওয়ার ঘটনানা! কিন্তু এ তো কল্পনা নয়, বরং আরো বেশি বাস্তব।

                    এ বাড়িতে আসা অবধি তার মনে শান্তি নেই। শহর থেকে বেশি দূরে নয়। গ্রাম গ্রাম ভাব। সবচেয়ে বড় কথা, অজস্র পাখি ডাকে এখানে। পাখি তার ভালো লাগে। বিশেষ করে উড়ে যাওয়া পাখিদের। কিন্তু যখন কোনো পাখি একা উড়ে উড়ে ডাকে তখন তার খুব কষ্ট হয়। কেন হয় সে জানে না। গতদিন বিকেলে অজস্র বক উড়ে যাবার পর হঠাৎ ঠিক এমনই একটি পাখি ডেকে ডেকে যাচ্ছিল। কিরণ রাতে ঘুমোতে পারেনি। ঘুমের ভেতর সে শুনতে পেয়েছে কোটি কোটি পাখির ডানা ঝটপটানির ভেতর সেই একাকী পাখির আর্তনাদ। সারাটা আকাশ রক্তাক্ত হয়ে উঠছে। কেন সে এমন স্বপ্ন দেখল? স্বপ্ন মানুষ কেন দেখে ! তার মনে হয়, এমনি এমনি নয় নিশ্চিত এর অর্থ আছে। কথাগুলোর উত্তর জানার জন্য সে মনে মনে চাইছিল তিনি আসবেন। কিন্তু এ বাড়িতে বিয়ে হয়ে আসার চারদিন হয়ে গেলেও, একবারের জন্য তিনি এলেন না। এটা তার কাছে অদ্ভুত লাগছে। তবে তিনি কি আর আসবেন না ? বিয়েতে তার মতও সে নিতে চাইছিল। কিন্তু তিনি এলেন না। ভেবেছে সে নিদেনপক্ষে একটি কবিতা তো তিনি লিখে দেবেন। কিন্তু না, দিলেন না। তাই তার মন খারাপ। একা বক। উড়ে উড়ে সীমানা পাচ্ছে না।

             শ্বশুরমশাই পাশের ঘর থেকে মাঝেমাঝেই কেশে উঠেছেন। এ বাড়িতে আসা অবধি তাকে সে দেখেনি । কোথাও মাঝে মাঝে হাসির ঢেউ উঠছে। কোনো একটা ঘরে বসেছে আসর। সম্ভবত রান্নাঘরের সামনে। সব্জি কাটা চলছে। অনুষ্ঠানে রয়ে যাওয়া সব্জিগুলি। শাশুড়ি মা’র গলা শোনা যাচ্ছে। মৃদুস্বরে কিছু বলছেন। পার্থ, তার বর বেরিয়ে গেছে সেই আটটায়। তাকে যেতে হবে কুমারঘাট। বাইরে টিন খোলা হচ্ছে। একটু পর পরেই ধড়াম করে উপর থেকে টিন ফেলার শব্দ আর কামলাদের উচ্চস্বরে কথা শোনা যাচ্ছে। কিরণ ধীর পায়ে নূপুর বাজিয়ে রান্নাঘরের সামনে গেল। শাশুড়ি মা গ্যাসের ওভেনের সামনে দাঁড়ানো। মাসিরা গোল হয়ে বসেছে। সব্জি কাটা চলছে। ‘এসেছ কিরণ, এসো এসো। ঘুম হলো? দেখো আবার কিছুতে হাত লাগিয়ো না যেন। আমরা কদিন আছি আমরাই করব’ এক মাসি বলে উঠল। ‘আমরা চলে যাবার পর তোমার সংসার তুমি দেখো’। 

                কিরণের কেন জানি মনে হচ্ছে, সংসার তার জন্য নয়। সে নিজেকে আপনভোলা কিশোরী ভাবতেই পছন্দ করে। সবাইকে সংসার করতেই হবে! এ বাড়িতে আসার পর কোথাও একটা রবীন্দ্রনাথের বই বা ছবি কিছুই সে দেখতে পায়নি। রবীন্দ্রনাথ কি কোথাও নেই! 

তার কেমন জানি দমবন্ধ লাগে। এখানে আসার সময় গীতবিতানটা নিয়ে এসেছিল। সন্তর্পণে। ফাঁকে ফাঁকে ঝোলায় হাত দিয়ে সে অপূর্ব স্পর্শানুভূতি লাভ করে। মনে হয় রবীন্দ্রনাথের হাত ছুঁয়ে আছে। কিরণ ধীর পায়ে বারান্দার দিকে এগোয়। ওদিকে শ্বশুর মশাইয়ের ঘর থেকে কাশির জোর আওয়াজ। উফ্ কাশতে কাশতে মুখে রক্ত উঠে যাবে নাকি! কিরণ গান ধরে ‘দাঁড়িয়ে আছো, তুমি আমার গানের ওপারে’। ধড়াম করে শব্দ। আরেকটা টিন পড়েছে উপর থেকে। কিরণের সুর কেটে যায়। স্বামীর সঙ্গে প্রথম রাত্রিতে একটা ভিন্নতর অভিজ্ঞতা ঘটে তার। কিরণ দাঁড়িয়েছিল জানালার পাশে। বৃষ্টি পড়ছিল ছুপ ছুপ। কিরণ গান ধরেছিল জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে বন্ধু হে আমার।… বিরক্ত হয়ে উঠেছিল সে। বাদ দাও তো এসব। কাল ভোরে বেরোতে হবে। কেমন একটা বিচিত্র বিস্ময় সে অনুভব করছিল। গভীর রাতে একা দাঁড়াতে দাঁড়াতে ভেবেছিল রবীন্দ্রনাথ আসবেন। না এলেন না তিনি।

                রবীন্দ্রনাথ তার কে ? স্বামী ? প্রেমিক ? নাকি সে-ই তার প্রেমিকা ? নাকি পিতা ? এই সম্পর্কের কী নাম হতে পারে ? সব সম্পর্কের কি নাম হয়? কলেজে একটা ছেলেকে সে ভালোবেসেছিল। তবে ব্রেক আপ হয়ে যায়। ঠিক সেই সময় খুব ভেঙে পড়েছিল সে। তখন রবীন্দ্রনাথ প্রথম এসেছিলেন তার কাছে। গান বা কবিতা হয়ে নয়, রঙ হয়েও নয়। একেবারে সশরীরে। বাড়িতে মাকে বললে তারা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছিল। শেষে সে আর মাকেও বলতো না। হয়তো সে পাগল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু একবার নয়। এরপর থেকে প্রায় রোজ তিনি আসতেন নিয়ম করে। বসতেন। কথা শুনতেন ধৈর্য ধরে। মনে হতো বাবা। মনে হতো প্রেমিক। নিজেকে মনে হতো প্রেমিকা। একটা জেদী মেয়ের সব অত্যাচার সহ্য করতেন। এক সময় মনে হতো, আসলে কোনো সম্পর্ক নয়। ওরা আসলে আবহমান পুরুষ এবং নারী।


                    কিরণ হাঁটতে হাঁটতে একটা বন্ধ ঘরের সামনে এগোয়। ভাল্লাগছে না। বিয়ের পর মনে হচ্ছে উনি হয়তো রাগ করেছেন। এখন তার বর আছে, বাড়িতে নানা লোক জন। তাই বোধহয় তিনি আসছেন না। আচ্ছা, স্পেস দিচ্ছেন তাকে। এত যখন যন্ত্রণা, উল্টোটাও তো হতে পারে। সে নিজেই স্পেস দিতে পারে। কিরণ ঘরটির সামনে দাঁড়ায় অনেকক্ষণ। কোথাও কাশির শব্দ শোনা যাচ্ছে দূরে। কিরণ দরজার হাতল ধরে চাপ দেয়। দরজা খুলে যায়। ভেতরে সার সার বই। উহ এটা লাইব্রেরি। ছাদ থেকে মাটি অবধি তাক। ওধারে ওসব কী! রবীন্দ্র রচনাবলী। একটা একটা খণ্ড! কিরণের সারা শরীরে পুলক। হলুদাভ বইগুলি যেন হঠাৎ নড়েচড়ে ওঠে। কিরণ এগোয়। হাত দিয়ে ছোঁয়। একটি খণ্ড বের করে গালে ঘষে। তারপর আরেকটি খণ্ড বার করে। চুমু দেয়। বুকে জাপটে ধরে। আরেকটি খণ্ড বের করে সমস্ত দেহে বুলাতে থাকে। আহা। আরে ওদিকে ইজি চেয়ারে আশ্চর্য কে বসে আছেন! রবীন্দ্রনাথ! কিরণ উল্লাসে ফেটে পড়ে। তবে তুমি আছো। যাওনি। এখানেই আছো।

রবীন্দ্রনাথ উঠে দাঁড়ান। তার মুখে মৃদু হাসি। একটু কাশছেন। বললেন বৌমা একটু আদা দিয়ে চা খেলে ভালো হতো। চা করে দেবে? তার পায়ের তলায় রজনীগন্ধার ফুল , গোলাপের পাপড়ি কালো হয়ে পড়ে আছে।

তুমি এসেছ। এখন এখানে কেউ আর আসে না। তুমি এসেছ। সকাল থেকে কাশি উঠছে। দমকে দমকে কাশি। একটু চা খেলে ভালো হতো। কিরণ দেখল রবীন্দ্রনাথ নয়, তার শ্বশুর মশাই। আসা অবধি এই প্রথম তাকে দেখল সে। তার দীর্ঘ দেহ। ঝুঁকে আছে একটু সামনের দিকে। মুখে দাড়ি। সৌম্যকান্তি নয়, তবু চোখদুটো জ্বলছে। বললেন, এই কবিতাটা কতদিন ধরে লিখছি, তোমাকে শোনাব বলে। হচ্ছে না কিছুতেই। কিরণ অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে। সেই মৃদু হাসি। বললেন, আমাকে কেউ ভালোবাসে না। পাগল বলে। কিন্তু জানো আমি পাগল নই। একটা কবিতা লিখলে পড়াতে চাই শুধু। একজন পাঠক চাই। আর কারো কোনো ক্ষতি করি না। খুব স্বল্প পরিসরে বেঁচে থাকতে চাই। বৌমা আমাকে একটা গান শোনাতে পারবে না



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল