সরস্বতী

সবই ধ্বনিময়। তবু সব তো আর ধ্বনি নয়। কেউ কেউ অনেক জোরে কথা বলে। খুব চাপ দিয়ে। আমার এক মামা আছেন, এত জোরে কথা বলেন যে, পাশের লোকটিকে অনেক সময় সবার সামনে লজ্জায় পড়তে হয়। তার আস্তে কথা বলাটিও এত হাই ডেসিবেলে যে, সবাই শুনতে পায়। তিনি প্রায় রাতে বাজার থেকে আমার বন্ধুর বাসার সামনে দিয়ে ফিরতেন। বন্ধুটি অন্যমনস্ক থাকলেও ঘরে বসে দু'শো মিটার দূর থেকে মামা কী বলছেন, শুনতে পেত। পরদিন মামার জীবনে ঘটা নানা তথ্য বন্ধুটির কাছ থেকে জেনে, তাকে শুনিয়ে চমকে দিতাম। মামা হা হয়ে যেতেন। এটা সে সময়ের ঘটনা, যখন টেলিফোন ছিল শুধু থানা বা ফায়ার সার্ভিস সেন্টারে। সেই নম্বরে আঙুল রেখে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ডায়েল করতে হতো। আর অফিসারকেও দেখতাম প্রায়ই চেঁচিয়ে বলছেন। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে শোনা কম গেলে কারও চিৎকার স্বাভাবিক। কিন্তু, বাস্তবে দুজন মানুষ কাছাকাছি থাকলেও কেউ কেউ অত্যধিক চেঁচিয়ে বলেন। 


      আমার পূর্বপুরুষ নোয়াখালির বাসিন্দা ছিলেন। নোয়াখালির লোকেরা নাকি চেঁচিয়ে বলেন আর সিলেটের লোকেরা অপেক্ষাকৃত মৃদু। এই দুই স্থানের বলবার আরও যেসব বৈশিষ্ট্য আছে, সে আমার বক্তব্যের বিষয় নয়। যেমন শুনেছি নোয়াখালির লোকেদের কথা বলার ভঙ্গি নাকি কর্কশ, আর সিলেটের লোকেদের কথায় নাকি আছে সুরেলা ভাব।  খাইবায়, যাইবায়, আইন, যাইন, তাইন, লায় লায়, অয় অয়, নায়নি ইত্যাদি ছোটোবেলা থেকে শুনতে শুনতে মনে হয়, যেন কথাগুলো খুব পলকা। বাতাসে ঢেউ খেলে খেলে অবিরাম এদিকে ওদিকে যায়। 


           সমুদ্র তীরবর্তী পরিশ্রমী নোয়াখালির লোকেরা তীব্র বাতাসের ভেতর কথা বলতে যতটুকু চেঁচিয়ে বা জোরে বলবেন, সুজলা সুফলা শ্যামলিম হাওর বা উর্বর সিলেটের মানুষদের তত জোরে কথা না বললেও চলে। স্বভাবতই আরামপ্রিয় শ্রীহট্টীয়রা কথার ভেতর সুর অনুপ্রবিষ্ট করতে ঢের সময় পায়। নোয়াখালির লোকের সে সময় নেই। চাষের জন্য তাদের অঞ্চলটি ততদূর উপযোগি নয়। কথায় ঢেউ খেলানো অপেক্ষাকৃত অলস, খাদ্যে স্বনির্ভর মানুষের কাজ। যাদের মেধা বেশি, অর্থাৎ মাথা খেলাবার সুযোগ আছে। তবু এ তো গেল ভৌগোলিক বিষয়। কিন্তু এসব পেরিয়ে কোনও কোনও ব্যক্তি যখন কথা বলেন জোরে, সিলেট বা নোয়াখালির ঐতিহ্য নয়, হঠাৎ যখন একদল স্থানিক লোক, জোরে চাপ দিয়ে কথা বলেন, তখন সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। পাহাড়ে কথার ভেতরে ইশারা, ইঙ্গিত, নানান প্লুত ও তীক্ষ্ণ ধ্বনি বেশি। এক পাহাড় থেকে আরেক পাহাড়ে জোরে কথা বলার চাইতে ইঙ্গিত, ইশারা, এই রকম ধ্বনি আরও বেশি কার্যকরী।


           যিনি বলেন অত্যধিক জোরে, তার ভেতর একটি প্রবণতা কাজ করে, যে অপরপ্রান্তের লোকটি হয়তো শুনছে না। একটা ভয়। গুরুত্ব হারানোর। সত্যিই তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করছে তো! নেতারা অনেকেই মাইকের সামনে দাঁড়িয়েও জোরে কথা বলেন। জোরে বলতে বলতে নিজে তেতে ওঠেন। যারা শুনছে তারাও তেতে ওঠে। এবং সকল বিপ্লব গলার শিরা উপশিরায় ফুলে ফেঁপে ওঠে। বাংলাদেশের ওয়াজ মেহফিলে কিছু বক্তা এইভাবে 'ঠিক কি না', 'ঠিক ঠিক', 'কথা কন না কেরে', বলে চিৎকার করে ওঠে। এবাদত বা প্রার্থনা নয়। সমস্ত পৃথিবীর বিরুদ্ধে শ্লেষ, ক্ষোভ, বিষোদ্গারের ভেতর নিজেরাও যে অস্তিত্বের সংকটে, বুঝা যায়। আত্মবিশ্বাস কম। ভীত। সন্ত্রস্ত। তাই আক্রোশ। গেল গেল রব। দেশভাগের পর যারা এপারে এলেন, তাদের মধ্যেও একটা ভয় আপাদমস্তক। আবার হারাবার ভয়। আত্মবিশ্বাস তলানিতে। সুতরাং জোরে হাসা বারণ। জোরে কথা বলা বারণ। একটা ম্রিয়মাণ জাতি। 


         আমরা যে সময়ে কৈশোরে পা দিচ্ছি, সে সময় একটা বাক্যাংশ প্রায়ই চোখে পড়ত। '...প্রতিবাদে গর্জে উঠুন'। বামপন্থীদের এই গর্জে ওঠার পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার কত যে দেখেছি। সে সময় 'গর্জন' শব্দটির দিকে তাকাতে তাকাতে তন্ময় হয়ে যেতাম। আপাতত 'তন্ময়' শব্দটি যদিও 'গর্জন' শব্দের পরিবেশের সঙ্গে যায় না। কিন্তু ভাবনায় যে পড়ে যেতাম, তা ঠিক। বিশেষত, বর্গীয়-জ এর উপরে রেফ চিহ্নটি ছিল আকর্ষণের কেন্দ্রে। মনে হত বর্শা কাঁধে চলেছে কেউ। সে কে? জ। জ বর্ণটির মধ্যে তারুণ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। কেমন জ্যাঠা মহাশয় ভাব। যেন হাঁটু ভেঙে বসেছে, আয়েশি বা অলস টাইপের কিছু একটা। কুঁড়ে। অথচ তার মাথার উপর বসিয়ে দেওয়া বর্শা। যেন অসংখ্য কিলোওয়াটের বিদ্যুৎপ্রবাহ। এবার তাকে উঠে দাঁড়াতে হবে। গ এর পর জ ধ্বনি উচ্চারণ করা যাচ্ছে না। মাঝখানে আছে অ। ঠিক তেমনি জ এর পর ন উচ্চারণের ফাঁকে আছে অ ধ্বনি। যেন পৃথক অবস্থান। গ এর পর অ এর দ্বারা যেন সময় নেওয়া হচ্ছে জ কে জাগানোর জন্য। কিন্তু র ও জ একসঙ্গে একই ক্ষেপে উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ তৈরি হল, আঘাত তৈরি হল, তা গিয়ে বাজল একটু দূরে ন ধ্বনিতে। গর্জন শব্দটি উচ্চারণ করতেও বেশ লাগত। ‘গর্জন’ না বলে ‘গর্জে উঠুন’ বললেও ন ধ্বনি থাকে। মানে ধ্বনি সৃষ্টি হবেই। পরে জেনেছি, গ, র, জ এবং ন চারটি ধ্বনিরই আবহ এক। পঞ্চপ্রাণময় সর্বশক্তি ত্রিগুণ সত্ত্বার প্রকাশ। ভেতরে আছে চিৎকার। অস্তিত্বের সমূহ প্রকাশ।



        সে যাক, এইসব ভারী ভারী কথা নয়, চিৎকার প্রসঙ্গে মনে পড়ে, ছোটোবেলা শোনা একটি ডাক। বর্ষায় জল ভরে যেত খেত খামারে প্রায়ই। কলাগাছের মান্দাস ঠেলে ঘুরতাম যত্রতত্র। আমরা বলতাম ভুর। কলার ভুর। সারাদিন ঘুরে হয়তো জমিনের পাশেই লাঠি গেঁথে আটকে রাখা হত। পরদিন প্রায়ই এসে দেখতাম কলার ভুরে বসে আছে জলচর কোনও সাপ। আমাদের মাঝখানে যিনি ইন্দ্রনাথ, তিনি এইসব কখনও পাত্তা দিতেন না। হনহনিয়ে ওঠা মাত্র সাপ বাবাজি ভ্যানিশ! যদিও মামার বাড়িতে আমি কয়েক দিনের অতিথি। তো ঘুরতে ঘুরতে একসময় সূর্য অস্ত যেত। চারদিকে ঘন কালো সবুজ। বড় বড় গাছের গা বেয়ে নেমে আসত সন্ধ্যা। অব্যর্থ। অভাবনীয়। সাবলীল। ধীরে কালো হয়ে উঠত দিন। যেন বিপুলা ধরণীর কোথায় হারিয়ে যাচ্ছি। ডুবে যাচ্ছি। আলো যেন সুদূরপারের কোনও ঘটনা। সবুজ যে কীভাবে কালোতে ডুবে যায়! কেবল জেগে থাকত আকাশের নিচে আকাশ। ঘষা কাঁচের আভা নিয়ে চারদিকে নিস্তব্ধ স্থির জল। আকাশ থেকে ঠিকরে আসা অস্পষ্ট আলোয় পৃথিবীকে কেমন অচেনা মনে হত। ঠিক সে সময় অনুভব করতাম বুকের ভিতর তেমন একটা চিৎকার। আকাশ বিদীর্ণ করা। মনে হত, যেন একে জন্ম থেকে বহন করে চলেছি। জমাটবাঁধা পাথরের মত ঠাণ্ডা তার অনুভূতি। মনে হত, এই আকাশ বাতাস অবাক করা জলরাশি গাছপালা অন্ধকার ভেদ করে ঊর্ধ্বে উঠে আমার চিৎকারটাকে কোথাও যদি পৌঁছে দেওয়া যেত, অথবা চিৎকারের কম্পনে যদি সব ভেঙে যেত। কিন্তু কোথাও কিছু নেই। কেবল আমাদের বাঁশের লগি ঠেলার অস্পষ্ট শব্দ।


             ঠিক সে সময় পূর্বদিকে খেতের ওপারের অস্পষ্ট কালো-সবুজ জঙ্গেলের ছায়ায় দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে চিৎকার করে তার হাঁসদের ডাকত। 'আয় চৈ চৈ চৈ চৈ চৈ চৈ চৈ চৈ'। কী অদ্ভুত ছন্দে আটবার চৈ উচ্চারণে সমস্ত আকাশ বাতাস তাবৎ অন্ধকার ফাটিয়ে সে ডেকে উঠত। এক বার, দু বার, তিন বার, চার বার। একটু পরেই শোনা যেত জল ভেদ করে অজস্র পাখার শব্দের স্রোত ছুটছে। একটু কাছে এসেই হাঁসগুলি ডেকে উঠত। কোথায় ছিল এরা! আসন্ন অন্ধকারের ভেতর যেন তারা ঐ চিৎকারের ভেতর দিয়ে পথ খুঁজে পেত। আমি কখনোই মেয়েটিকে দেখিনি। দেখিনি তার হাঁসদেরও। কেবল জলের ভেতর দিয়ে পাখা ঝটপট ওদের এগিয়ে যাওয়া শুনেছি। মনে হত সমস্ত পৃথিবীর উপর কালোর পর্দা লহমায় ফাটিয়ে যেন জগৎ প্রাণ পেয়ে উঠেছে। পঞ্চপ্রাণময় ত্রিগুণ শক্তি কি একেই বলে নাকি! জানি না। মনে হয় প্রতিটি চৈ ধ্বনি যেন দুঃখ, মলিনতা, নীচতা, বিষণ্নতাকে খান খান খান করে দেয়। বাইরে বেরোবার রাস্তা দেখায়। আমিও যেন প্রাণ পেতাম। আসন্ন অন্ধকারের ভেতর একটি ডাকে এই যে ধ্বনির স্রোত পথ পেয়ে যেত, এই বিশ্বে সে এক অপূর্ব লীলা মনে হত। 


            আজও মনে হয়, চিৎকার শুধু ভয় নয়, অথবা শুধু জানান দেওয়াও নয়, চিৎকার অন্ধকারে প্রাণময়। মাতৃগর্ভের ভিতরে যেমন শিশু মায়ের ডাক অনুভব করে ঠিক তেমনি। ধ্বনি দিয়েই ধ্বনিকে জাগানো। এখনো যখন মন খারাপ হয়, দুঃস্বপ্ন দেখি, কখনো স্বপ্নের ভেতর শুনি সেই ডাক,'আয় চৈ চৈ চৈ চৈ চৈ চৈ চৈ চৈ'। মনে হয় পাখা ঝটপট ছুটে যাই। কিন্তু আমি তো আর হাঁস নই। আমার তো পাখা নেই। 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ