গঙ্গা নামক জ্বিন

 


চোখ বুজলেই আপাতত যে ছবিটি ভেসে ওঠে, আমরা বলতাম 'গঙ্গার বাড়ি'। লোকালয় ছাড়িয়ে যেতে যেতে হঠাৎ বনের মধ্যে। দুটি মাত্র কাদা লেপা ঘর। লম্বাটে ঘরটি হয়তো থাকার। এক পাশেই শেষেরটি রান্নার। উপরে মাটিতে মিশে যেতে উদগ্রীব ধূসর রঙের ঝুঁকে থাকা ছনের চালা। ছোটো দাওয়া। স্থানে স্থানে বৃষ্টির জলে ক্ষয়ে ভেতরের কাঁকর মেশা লাল মাটি বেরিয়ে এসেছে। দাওয়ার এক পাশে বাঁধা দুটি ছাগল। অন্যপাশে তেল চিক্ চিক্ হলুদ বাঁশের খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বসা গঙ্গা। বলা ভালো, 'গঙ্গা' কোনো স্ত্রী-বাচক শব্দ নয় এখানে। 'গঙ্গা' একজন পুরুষের নাম। মূল নামটি গঙ্গারাম বা গঙ্গাপদ বা গঙ্গাচরণ বা গঙ্গেশ যা-ই থাকুক না কেন তিনি প্রচারিত শুধু 'গঙ্গা' নামেই।

            চারদিকে হামলে পড়া গভীর জঙ্গল। লুটকি থেকে শুরু করে নানা অজানা বুনো গাছের ঝোঁপ, রিফিউজি লতা, হলুদ, আদা, শটি। আছে বড় বড় গাছ– গর্জন, গামাই, চাম কাঁঠাল, পিচণ্ডি, জারুল, আগর, শিমুল, লুকলুকি আর লক্ষ্মী আম– এক সঙ্গে দু তিনটি আঁটি মুখে নিয়ে চোষা যায়। এদিকেই পথ। ঘরের সামনে দিয়ে। উঠোন নেই। জঙ্গলে মিশে থাকা সীমাহীন বাড়িটিতে গোড়ালি ডুবে যাওয়া ঘাস সবদিকেই। তবে ঘরের ঠিক সামনের ঘাসগুলো কিছু ছোটো। চোরকাঁটা কম। আমরা বলতাম ল্যাঙরা। সবুজ সবুজ আর সবুজ। দিনের বেলায়ও কেমন ছমছমে গাঢ়। ছায়া ছায়া। যেন মেঘ করেছে, এক্ষুণি বৃষ্টি নামবে। একটা দরোজা। ঘরের ঠিক মাঝখানে। খোলা থাকলে এক টুকরো আয়তকার অন্ধকার। আর রান্নাঘরের একটি। রান্নাঘর না বলে পাকঘর বললে মানানসই। রান্নাঘর কথাটিতে যেমন আধুনিকতা আছে, নানা দিকে বাঁশ বেরিয়ে থাকা কালিঝুল মাখা পাকঘরে তেমন নেই। অথবা অপ্রচল শব্দ বলেই হয়তো। পরিপাক থেকেই কি পাকঘর! ঘরের পেছনে উদ্ধত বাঁশঝাড়ের শিখা সূর্যকে দিনের মধ্যেই বেঁধে ফেলার ষড়যন্ত্র করছে। ঘরের এক পাশে বেতবন, অন্য পাশে জঙ্গলে সেঁধিয়ে যাওয়া একফালি জমিতে অজস্র ভাঁটফুলের গাছ।

           সমস্ত অঞ্চলটিই রহস্যে ভরা। সে কি জঙ্গলের জন্য! জঙ্গল একটা আবহ ঠিকই। লক্ষ্মী আম খেতে আসা বালকের বুকে হৃদয় আর কতটুকু! সারাদিন নানারকম পোকার কটরমটর কিচকিচ ধ্বনি, পাতার শব্দ, গাছের মটমট– এ ছাড়াও আলোছায়াময় কারুকাজ বালকের চোখে শঙ্কামিশ্রিত বিস্ময় ছাড়া কিছুই তৈরি করে না। এই বুঝি কোনো জন্তু বন থেকে বেরিয়ে এল। এমন একটা পরিবেশে ঘুমছুট ভরদুপুরে একা যেতে যেতে মনে হয়, কেবল জন্তু নয়, আরো কিছু আছে। কী সেটা! মাঝেমাঝে পেছন ফিরে এদিকে ওদিকে তাকালে শুধু জঙ্গলের নানারকম শব্দ। একটা জঙ্গলে কত ধরনের আওয়াজ যে হতে পারে! কেমন একটা পতঙ্গের তীব্র ডাক সারাটা বন জুড়ে। অজানা আশঙ্কায় মন আরো দমে যায়। চারদিকের গাছগুলি বেশিরভাগই অস্তিত্বহীন নাম না জানা জীবের চেহারা নিয়েছে। বাঁশঝাড়কে মনে হয় দানবীয় কোনো ভাল্লুক। রিফিউজি লতা বেয়ে ওঠা জারুলগাছটিকে ভীষণদর্শন রাক্ষস। শিমুল গাছ থেকে নেমে আসা মোটা মোটা লতাগুলো সাপ আর দূরের লুটকি বনের ওপাশে নিশ্চিত ভয়াল কোনো প্রেত। সারা দেহে শিরশিরানি, এসব পেরিয়ে যেতে যেতে হঠাৎই পথে পড়ে যেত গঙ্গার বাড়ি।

              আমার লাগত গঙ্গা লোকালয় থেকে দূরে এই দুর্ভেদ্য বনে আটকা পড়ে গেছে বা গুম হয়ে গেছে। বেরোবার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। বেরোবার ইচ্ছাও এখন আর নেই। অথচ বেরোলেই সে হয়তো নদীর মত খোলা আকাশের ঠিকানা পেত। গায়ের রঙ কালো। প্রায়ান্ধকার অঞ্চলটিতে তার উপস্থিতি যেন আরো দূরাগত কোনো রহস্যের হাতছানি। সে প্রতিদিন বসে থাকে দাওয়ায় আর বিড়ি খায়। বিড়ির সঙ্গে গাঞ্জাও। যেতে যেতে গঙ্গার বাড়ির সামনে এসেই প্রতিদিন পা যে কেন থেমে যেত। না তাকিয়েও বুঝতাম আকাশ ঢেকে যাওয়া জনমানবহীন জঙ্গলের মাঝে বসে এক জোড়া চোখ আমার দিকেই শুধু এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আর কাউকে না, আমাকেই দেখে! এই এক চিন্তা মেরুদণ্ডে শীতল স্রোত বয়ে আনে। কেন এই ভয়! ততদিনে জেনেছি, গঙ্গার ঘরে অনেক জ্বিন বোতলবন্দি করে রাখা। অনেক ভূত অনেক পেত্নি। ব্রহ্মদৈত্য থেকে শুরু করে মেছো ভূত। সে ভূত নামায়। মড়া মানুষের পেটের ভেতর থেকে বের করে আনে কথা। তার হাড় জিরজিরে হাতের মুঠোয় নাকি সব। দাওয়ায় বাঁধা ছাগলের চোখের মত তার চোখ। সে কিছু করে না। কেবল নির্দেশ করে। সব তার নখদর্পণে। মাঝে মাঝে লাগে, এসব করে করে সেও বুঝি ভূত হয়ে গেছে। এই আড়াল এই গোপনতা তাই তার দরকার। দিনের বেলা সে স্থির, যত সন্ধ্যা ঘনায়, রাত হয়, কার্যকলাপ বেড়ে যায়। চারপাশের দুর্ভেদ্য জঙ্গল থেকে নাম না জানা প্রেতেরা বেরোতে থাকে এক এক করে। ঘোরাফেরা করতে থাকে। গঙ্গার আলাদা কোনো সত্ত্বা আছে কি! কখনো তাকে আলাদা করে ভাবতে পারিনি। গভীর বনের মধ্যে গঙ্গাও যেন বনের কোনো অংশ। রহস্যের কোনো অংশ। একটি গাছ বা একটা শুকনো লতা। দিনে সে নড়ে না। কথা বলে না। শুধু চেয়ে থাকে। তার চোখের মধ্যে কি আছে জানি না। উদাসীনতা, না কৌতূহল! আমাকে কি পুরোটা পড়ে ফেলতে পারছে! গাঁজার গন্ধ আর বিড়ির ধূঁয়া উড়ে যায় আঁকাবাঁকা হয়ে। সেই মুহূর্তে বিশ্বগ্রাসী একাকীত্বের মধ্যে, মানুষের চলাচলহীন নীরবতার মধ্যে মনে হতো শুধু গঙ্গা নয়, আশপাশের সবাই যেন আমাকেই দেখে। ভুলক্রমে যেন ঢুকে পড়েছি অন্য কোনো সময়ে। গাছগুলি যেন গাছ নয়, আড়ালে আরো কোনো কিছু। শাপগ্রস্ত।  গঙ্গার মতন অপেক্ষমাণ তারাও স্থির তাকিয়ে আছে। কীসের অপেক্ষা! অপেক্ষা, দিন মুছে রাত হবার। মুহূর্তে বদলে যাবে সব। এখন আমি কীভাবে পা ফেলি, কীভাবে যাই, আমার চোখমুখ, প্রকাশ সব সন্তর্পণে বুঝতে চাইছে। একজন জ্যান্ত মানুষের অভিব্যক্তি! চতুর্দিকের এই তীব্র তাকিয়ে থাকার মধ্যে আছে প্রচণ্ড অস্বস্তি। মনে হয়, এতক্ষণ সব ছিল আপন মনে। হঠাৎ আসায় পাল্টে গেছে কিছু। আমি যেন তাদের কোন গোপনতায় ঢুকে পড়েছি। নষ্ট করে দিয়েছি কিছু একটা। আমি যেন বহিরাগত কেউ। কেবল মনে হয় হঠাৎই গঙ্গা উঠে দাঁড়াবে আর ঠা ঠা করে নীরবতা ফাটিয়ে জিজ্ঞেস করবে 'এখানে এসেছ কেন'? কী উত্তর দেব আমি! আরো যেন অন্ধকার নেমে আসে। হঠাৎই দৌড় দিই। প্রাণপণ। মনে হয় সমস্ত জঙ্গল ছুটে আসছে আমার পিছু পিছু। অথবা সব ভেদ করে দু পায়ে মাড়িয়ে দলে পিষে হু হু করে ছুটে আসছে গঙ্গাই। ইতোমধ্যেই তার আকৃতি অনেক বড় হয়ে গর্জন গাছের মাথায় উঠে গেছে। আমার পিঠ প্রায় ছুঁয়ে ফেলল রবারের মত অন্তহীন লম্বা হতে থাকা তার শীর্ণ হাত।

               অথচ গঙ্গাকে কখনো তার ঐ আসন ছাড়া কোথাও দেখিনি। গ্রামের কোথাও না। সে কী করে? এই জঙ্গলে থাকে কীভাবে! কেনই বা সেখানে বাড়ি! সে কী খায়? আমাদের মতন ভাত, ডাল? নাকি হাওয়া, বা প্রেতদের দিয়ে আনানো উৎকৃষ্ট কিছু উপাদেয়। এমনও তো হতে পারে, গঙ্গা ক্ষুধাতৃষ্ণাহীন কেউ। আর কেউ কি আছে তার ঘরে! যদিও সেই আয়তাকার আলকাতরার মত অন্ধকার দরজা থেকে কাউকে বেরোতে বা ঢুকতে কখনো দেখিনি। 

         


  চোখ বুজলে মনে হয়, এ যেন গত শতকের কাহিনি। সেই ভূতেরা এখন কোথায়! সেই মেছো ভূত, ব্রহ্ম দৈত্য, জ্বিন কেউ আর এ শতাব্দীর বুঝি নয়! আজকের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষিতে এদের জন্ম নেওয়াও হয়তো অস্বাভাবিক! সেই খেতে না পারা বাংলার লোকেরা, সেই কলেরা-ওলাওঠা-মহামারী-দুর্ভিক্ষ-দেশভাগের বলি মানুষেরাই হয়তো রূপান্তরিত হয়েছিল ভূতে। আমি যে গঙ্গাকে দেখেছি, সে হয়তো ছিল কোনো সন্ধিক্ষণে! যখন যন্ত্র ঢুকে পড়েনি কোথাও। বিদ্যুৎহীন আঁধার। গঙ্গা সম্পর্কে পরে জেনেছি, সে আসলে অন্যের জমি পাহারা দিত। অনেক কম বয়সে বউ মারা গেলে থাকত একাই। পড়ো ঘরটিও জমির মালিকই তুলে দিয়েছিল অনেক আগে। ভাবি, সেই যে ভয়, এখন কি সে আছে! সেই অতি কল্পনার পরিসর এখন অনেক ছোট। ভয় জিনিসটাও কালে কালে পাল্টে যায়। গত শতকে যার রঙ ছিল সবুজাভ কালো, আজ ভিন্ন। ভূতেরা কোথাও এখন নেই আর। অথবা তাদের রকম সকম পাল্টে গেছে। অথচ এরা তো ছিল আমাদের স্থানীয় ভূত, মাটির ভূত। এদের আলাদা করে কোনো পরিচয় নেই হয়তো। বেঁচে থাকতে তারা কে ছিল, কেউ এখন আর জানতে চায় না। সামান্য মাছের লোভে পর্যন্ত তারা পেছনে ঘুরঘুর করত। অভাবী, দরিদ্র এসব ভূতেদের বাসা অদ্ভুতভাবে লোকালয়ের বাইরে, বনে। পরিত্যক্ত কোনো স্থানে। এমনকি গাছে! প্রকৃতির সঙ্গেই লগ্ন হয়ে থাকতেন তারা। ইওরোপীয় ভূতের মতন ঘরে নয়। এখন সেই প্রকৃতি কমে এসেছে। সেই অরণ্য কোথায়! নেই। আজ মনে হয় সত্যিই কি গঙ্গা নামের কেউ কোথাও ছিল! সে যেন না-মানুষ না-ভূত। মহাকালচক্রে ভ্রাম্যমাণ হঠাৎই যেন আমিও তাকে দেখে ফেলেছি। সেই বনের ভেতর একাকী মানুষের একটি ঘর। পরিত্যক্ত। গত শতাব্দী আর এই শতাব্দীর মাঝখানে।

               গঙ্গা আসলে সময়ের সেই ভাঁজে আটকে যাওয়া মুক্ত মানুষ, যার কথা বলার কেউ নেই। এখন ভাবি, হয়তো সে কোনো জ্বিন ছিল। কল্পনায় দেখি, তার মৃত বউ এখনো আসে কোনো জোছনা রাত্রে। তখন তার ঘরের চারদিকে আলো করে ফুটেছে ভাঁট ফুল। তার তীব্র মিষ্টি গন্ধে মাথা ঝিম ঝিম করে। আমি স্পষ্ট দেখি আকাশে যেদিন একটি দুটি তারা ফুটেছে গাছের ফাঁকে। তার কম বয়সী বউ এসে বসে দাওয়ায়। জোছনার নরম আলোয় গঙ্গা বলে কেন এসেছ এখানে? সে কিছু উত্তর দেয় না। তার বউয়ের সঙ্গে তার বয়সের যে তফাৎ, আমার সঙ্গে গঙ্গার সেই তফাৎ। 

             চোখ বুজে দেখি, অচেনার কুহকে মেশা জোছনার ভেতর সেই ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি আজ আমিও। আমার সামনে আয়তাকার অন্ধকার। অথচ আশ্চর্য ভয় করছে না আমার। ভালো লাগছে। ভেতরে প্রবেশ করব। এই দরজা গত শতকের। গঙ্গার বউ, গঙ্গা আর আমার মধ্যে কোনো তফাৎ আছে কি! বনের নির্জন এই ঘরে বোতলবন্দি জ্বিনেরা যেন ফেলে আসা সময়ের এক একটি বেদনার মত! একবার তার মুখোমুখি হব না! গঙ্গা মিটিমিটি হাসে। আমিও। ভাঁট ফুলের উগ্র গন্ধে আচ্ছন্নের মত লাগে।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ