তেরা কেয়া হোগা রে কালিয়া

 


খেয়াল করলে দেখা যাবে শ’ দেড়শো বছরের কোনো পুরানো বাড়ি নেই। ইতিহাস কি কেবল ইট-কাঠ-পাথরে! ইতিহাস তো থাকতে পারে পুকুরেও। পুষ্কুনি মানে পুষ্করিণীতেও। নামটির মধ্যেই রয়েছে সৌন্দর্য। কেমন নববধূর কাঁকন পরা হাতের বালা চুড়ির ঠিন ঠিন ধ্বনি। নদী নেই তো কী হল, সবার বাড়িতেই আছে কাকচক্ষুর মত কালো আম-কাঁঠাল-জাম আর সুপারি-নারকেল-পিচণ্ডি-গুলঞ্চ-ভাঁট ফুল ঘেরা নিবিড় পুকুর। এটা তার মানস গঠনে কতটুকু অবদান রেখেছে বিচার করা যেতে পারে। 

           তো বাড়ি বলতে তো শুধু ইট-পাথর-সিমেন্টের নয়। মানে কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তি বা রাজা মহারাজা এ মাটিতে না জন্মালেও ছিল সাধারণেরা। ছিল ঘাট। পিচ্ছিল। শ্যাওলাকালো। বাঁশবন, আদা-হলুদ বন। বাড়ির বউ বাঁ হাতের চেটোয় এঁটো বাসন নিয়ে এলেন অথবা শীতের দুপুরে কেউ তেলটেল মেখে ঝুপ্পুস। বিকালে বড়শি। ধ্যানী বক। বালিহাঁস উড়ে যায়। হু হু করা হলুদ মাঠ। রাস্তায় রাস্তায় গাছ। কোথাও ভঙ্গি তুলে নাচের মুদ্রায়, কোথাও উদাসী বাউল। সেই দুপুরে 'হরি বোল হরি বোল' বলে বৈরাগী এসে দাঁড়ালেন। বড় রেড কাউয়ের বা এঙ্করের গুঁড়া দুধের ডিবির মুখে করে চাল এগিয়ে দিলেন মা। একটু বাতাসা, জল আর ঝিমধরা প্রহর। বাবুই, চড়াই আর শালিকের আয়ত চোখ। আর একটা পাখি, মা বলত সীতা পাখি। সাদা আর কালো দিয়ে। আর ছিল সপ্তাহব্যাপী অঝোর বৃষ্টি, সাপ, মনসার গান। ছিল শ্রীহট্টের নিমাই। এখন সে ইতিহাস নেই। সীতার অঙ্গ থেকে খুলে ফেলা ছিন্ন বিচ্ছিন্ন গয়নার মত কোথাও কোথাও হয়তো আছে। সুপারি বাগান নেই। তার বদলে ফুল। ছাদভর্তি পিটুনিয়া, ডালিয়া– যেকোনো বড় শহরের ছাদ যেমন। জায়গার যে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য– গায়েব। কেবল ঠুক ঠুক, ঠাস ঠাস, দ্রুম দ্রাম শব্দ। প্রায় প্রতি গলিতেই। প্রাসাদসদৃশ আধুনিক বাড়িঘর আকাশপথে ধাবমান– পুকুর, মাঠ, শ্মশান, ডোবা, ময়লা ফেলার জায়গা ভর্তি করে। চাঁদে জায়গা কেনার দাম। হঠাৎ এই উল্লম্ফন! মনে হতে পারে ইন্ডাস্ট্রি ফিন্ডাস্ট্রি অথবা বড় বড় কোম্পানি, আর্থিক বুনিয়াদ। কিন্তু না, এসব কিছুই না। 

             শেষ যে উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা, তা ওই একাত্তরের যুদ্ধ। মুক্তিসেনা, ফাইটার প্লেন, আর্মি, ট্রেনিং, কামান, মাটিতে বাঙ্কার করে শুয়ে পড়া ইত্যাদি বহুবিধ মাইথলজির বাইরে এটাও ঘটনা অবৈধভাবে লুটপাট, তছরূপ, সরকারের হিসেবে গোলমাল, রেশন, কালোবাজারি করে টাকা বানিয়েছেন অনেকেই। তারাই শহরের বনেদি মানে প্রথম উঠতি নামী লোক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-মন্বন্তরে ওই লঙ্গরখানার মালিকের মতন। বাংলা নাটকে এমন বেশ আছেন। খেপ মেরে এই যে শ্রম-নিষ্ঠাহীন, ধৈর্য-মেধাহীন হঠাৎ আকাশচুম্বী বড়লোক হয়ে ওঠা, এই দালাল চরিত্র মানস গঠন করেছে কী না, ভাবা যেতে পারে। সহজে বিত্তবান হবার নেশা আর সঙ্গে আছে বর্ডার। চুরি ডাকাতি। মালপাচার। সমতলে লুঠতরাজ শুরুর পাশাপাশি পাহাড়ে রাহাজানি মুক্তিপণ দাবি, উগ্রপন্থী। তা জাতিগত বিদ্বেষ বপন করা গেছে আগে থেকেই। এটা একটা অনুশীলনও। বিভিন্ন দলই সুযোগ বুঝে ফায়দা তোলে। তো পাহাড়ে অশান্তি শুরু হলে সমতলে বেড়ে গেল জায়গার দাম। ঐ যে খেপ মানসিকতা। অতএব সাহায্য করা দূরে থাকুক, যারা আগে থেকেই দখল করে বসে আছে, তারা এবার চড়া দামে বেচল নিজের গোষ্ঠির লোকের কাছেই। সুতরাং ‘দেশভাগ’-এর 'আমাগো দ্যাশ'-সংস্কৃতি, জোর ধাক্কা খেল। মানে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা জনমনে জাতীয় ঐক্যের তার কেটে গেছে আগেই। যে যেমন পালিয়ে এসেছে, এখন যে যেমন পারে মেরেকেটে এস্টাব্লিশড হতে চাইছে। গাইভরা দুধ, মাছভরা পুকুরের স্বপ্নে ফিরে যাবার জন্য মরীয়া জাতির কাছে শর্টকার্ট রাস্তা এটাই। নিজের লেজ নিজে গেলার অবস্থা। ব্যবসা বলতে পাইকারি আর খুচরা বাজারের বাণিজ্য। তো একাত্তরের ঢেউয়ের পর আরেকটা ঢেউ এল যখন পাহাড় গরম হল। জায়গার দাম বাড়ল। এতদিনের কালো টাকা, তছরূপ করা টাকা, ফাটকার টাকা, ঠিকেদারির টাকা এবার লেগে গেল কাজে। ঝা চকচকে বাড়িঘর উঠতে লাগল। শুধু থাকার জন্য নয়, সে দিন শেষ। কিছুটা দেখানোর জন্য, আর বাকিটা ভাড়া বাণিজ্য। ব্যাপার একই। সহজে টু পাইস। বড়সড় কলকারখানা বা প্রজেক্ট নয়, বা নতুন কিছু করা নয়। ভৌগোলিক অবস্থাও প্রতিকূল। তবে ভৌগোলিক অবস্থা প্রতিকূল হলে জাতির ভেতরে লড়াইয়ের শক্তি বাড়ে। প্রতিরোধ বাড়ে। আরো ক্ষমতা আসে। ইয়োরোপের ইতিহাস সেকথা বললেও সে বুঝি ভিন্ন গোলার্ধের কথা। জাতিসত্ত্বাই তো গড়ে ওঠেনি। বিভাজনটা কেবল জনজাতি-বাঙালি নয়। এটা বানানো। এটা অনুশীলনের মধ্য দিয়ে গেলানো গেছে। বিভাজনটা অবিশ্বাসের। হঠাৎই প্রবাসে দৈবের বশে যেন এক বাসে উঠেছে সবাই। সবাই মানে বিভিন্ন প্রান্তিক। আর বাস খাদে পড়ে গেছে। নিজে বাঁচতে গিয়ে যে যেমন পারছে। তো একের পর এক শহর গড়ে উঠছে শ্রমমেধাহীন খুচরো মানসিকতা নিয়ে। বিশাল বাড়ি, বড় গাড়ি, রাস্তা ছোট, উঠোন ছোট। আর এক শ্রেণি বাপ দাদার গ্রামের ভিটা ছেড়ে একটা চাকুরি বাগিয়ে বাকি  চার গণ্ডা, তিন গণ্ডার জীবন। সে যেন 'ঠাস ঠাস দ্রুম দ্রাম শুনে লাগে খটকা, ফুল ফোটে তাই বলো, আমি ভাবি পটকা'-র মতন অথবা দা-য়ের থেকে আছাড় মোটা থাকার মতন অবস্থা। কেবল খসখস। কেবল ঘিসঘিস। ভেতরে কবুতরের হৃদয়। ভীত। সন্ত্রস্ত। এই বুঝি কেড়ে নিল কেউ। অবিশ্বাসের ঋণ বেড়ে চলে দিন দিন। উদ্বাস্তু। শিকড়হীন। ম্রিয়মাণ। মায়াহারা।


        আসল কথা, সব আছে পুকুর নেই। পুকুর তো তার নিজের ছিল। সেটা সে হারিয়েছে, বলা যায় গলা টিপে হত্যা করেছে। সুতরাং গাছও কমেছে। ছায়া দেবার কিছু নেই। তা পাওয়া যায় পুরনো কারও বাড়িতে গেলে। সে বাড়ির টিনের চালা, বেড়া বা বেড়ার উপর সিমেন্টের পলেস্তারা, আম জাম কাঁঠাল শুধু নয়,  লুকলুকি ডুমুর নারিকেল খেজুর, কী নেই। আর বাড়ির পেছনে আছে আদ্যিকালের সেই ঘাট। জনহীন। পাতাঝরা। এ বাড়ির মানুষেরা দেশ বিদেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, ব্যাঙ্গালুরু, আমেরিকা। পাশেই বিশাল চারতলা বাড়ির সদ্য আসা ধনাঢ্য বাবুটি– যার সিস্টেমের টপ টু বটম চেনাজানা, হে হে করে হাসতে হাসতে উঁকি দিয়ে বলে – এঃ জায়গাটা পেলে মন্দ হতো না।

         একটা শহরের পুরনো মানুষেরা এখন আর নেই। থাকলেও সংখ্যালঘু। এখন সব নতুনেরা। এই হল নতুন ঢেউ। পুরনো যারা টিকে আছে জায়গা বেচতে বেচতে পেছনে। সুতরাং সব আছে। অভাব কমছে। একটা শহরের হাতে পয়সা আছে যথেষ্ট। হৃদয় তত বড় হয়নি। ছোটোবেলায় দেখা সেই মায়াভরা পুকুর তো আর নেই কোথাও। কাঠের গুঁড়ো দিয়ে মা রাঁধতেন। সারাদিনের কাজ সেরে মুখে চুলে কাঠের গুঁড়ো নিয়ে দুপুর ঢলে গেলে মা যেতেন পুকুরে। তখন সোনালি রোদ। গাছের পাতায় পাতায় ঠিকরে এসে পড়েছে ঘাটে। ঘরের পাশেই। টলটলে জল। কাকের চোখের মতন কালো। গা ছমছমে। মনে ভয়। বিস্মিত বালকের স্বপ্নরাজ্য। ওপারে কচুবন, সুপারি নারিকেল ঘেরা কালো জলের নিবিড় মায়া। সে সব আর নেই। রিকশার ক্যাঁচ ক্যাঁচ নেই। টিনের বাক্স গলায় ঝুলিয়ে বরফওলা। খালি গায়ে সাইকেলের টায়ার লাঠি দিয়ে চালিয়ে যাওয়া অথবা মার্বেল, ডাংগুটি খেলার কিশোরেরা অন্য কোথাও ভিড়ে গেছে। ঐ গলিতে যে মেয়েটি ভোর হতেই গলা সাধত সেও এখন অন্য কোনো শহরে নিজের বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছে। তার প্রেমিকটি এখন টুকটুক চালায়। একটা শহর সব গোপন রেখে দিয়েছে। সে এখন মাটির কয়েক ফুট নিচের ঘটনা। এখানে যে ঘাটের তলায় এ বাড়ির নতুন বউটির হাত হতে সাধের আংটি তলিয়ে গেছে সে খবর কেউ জানে না। নতুন ঢেউয়ে ঢুকে পড়া গলায় সোনালি চেনওলা লোমশ লোকটিও জানে না। সে আংটি কোনো মাছের পেটে যায়নি। এখন যেখানে দৈত্যাকার মাল্টিস্টোরেজ হা হা করে উঠছে, তারই তলায় কোথাও সে চাঁপার কলির মত আঙুলের বিরহজনিত বেদনা নিয়ে নিশ্চুপ হয়ে আছে।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ