না কেনা বাদামি বিস্কুট

  

আট নয়ের দশকে প্রতিটি চায়ের স্টলই ছিল ওই জায়গার ছোট্ট সংস্করণ। ছোটো বড় মফস্বল শহরে ভাঙাচোরা সে সব স্টলগুলো ছিল এক একটা সম্পদ। মনে হয়, সে সময়ের প্রতিটি শিশুরই মনে সে রকম একটি স্টল থেকে যায় আজীবন, যাকে দেখে দেখে সে কিশোর হয়, যৌবনত্ব পায়। একদিন এখানে এসে প্রতিবাদের মন্ত্রও শেখে। কোনায় বসে ছোট্ট শীর্ণ কাগজ থেকে পড়ে শোনায় কাউকে তার লেখা প্রথম কবিতা। শহর বড় হলে, ঝা চকচকে হলে সে সব স্টলগুলো গুটি গুটি পায়ে কবে যে সরে যায় গ্রামের দিকে, খেয়ালই থাকে না কারো। তখন তার জায়গায় রেস্টুরেন্ট, ক্যাফের ভিড়। কাঠের দরজার জায়গায় লোহার পাতের শাটার। 

           অথচ বিশ্বায়নের প্রভাব তখনো জাঁকিয়ে বসেনি। এত বিচিত্র স্ট্রিট ফুড আসেনি। এত ধরণের খাবারের সরঞ্জামও বেরোয়নি– সেই সময় সেই সব চায়ের স্টলগুলি ছিল একেকটা বিপ্লবের আঁতুড়ঘর। 

        মনে হয়, এই পরিবর্তন যেন সমাজতন্ত্র থেকে ধনতন্ত্রে বদলে যাবার। গ্রাম গ্রাম গন্ধ থেকে শহুরে হয়ে ওঠার। ক্রেতার দিকে তাকালে মনে হয়, তার চরিত্রও বদলেছে বেশ। এখন আর যেকোনো পোশাকে সে আর বেঞ্চিটি দখল করে বসে না। বেঞ্চিও নয়, এখন সুদৃশ্য আধুনিক চেয়ার টেবিল। টেবিলের মাঝখানে রাখা সুদৃশ্য কাঁচের জারে নানারকম গাছ– ব্যাম্বো প্ল্যান্ট, মানি প্ল্যান্ট, অথবা লাল নীল মাছ। দেওয়ালে বিদেশীদের আঁকা বড় বড় ছবি। সুদৃশ্য টি পট, কাপ। কর্পোরেট চেহারা। আজকের যেকোনো হাসপাতাল স্কুল ব্যাঙ্ক দোকানের ভেতরের ছবিটি প্রায় একই। যেকোন বড় শহরের আজকের ছবি যেমন সমান। প্যারিস হোক বা গুয়াহাটি এক দৃশ্য। তার মৌলিকতা, তার নিজস্বতা খুঁজতে হলে যেমন আমরা পুরানো স্থাপত্যের দিকে চোখ ফেরাই, তেমনি ছোটো ছোটো মফস্বল বা শহরে যেখানে সবাই সবার পরিচিত, সেখানেও ঘুমিয়ে আছে কত ইতিহাস। সেসব বায়বীয়। কেবল উড়ে উড়ে যায়। মুছে মুছে যায়। কত যে চক্রান্ত, কত যে রাগ গলে জল হয়েছে, কত যে বেদনা, ক্ষোভ সুখে বদলে গেছে, কত যে রহস্য তার আড়াল খুলে প্রকাশিত হয়েছে। সেসব কাহিনি তো আর কোথাও লেখা থাকে না।

           ছবির মত মাঠ। মাঠের পাশে ছোট্ট চায়ের দোকান। বিশ শতকের মফস্বল। রিকশাওয়ালা, ঠেলাওয়ালা, দা-কামলার ভিড়। সকালে পরোটা, দুপুরে রুটি। তরকারি একটাই, হয় কখনো ঘুঘনি, কখনো ডাল বা শব্জি। সকালে চোট গেলে দুপুরের পর ঠাণ্ডা তরকারির সঙ্গে শীতল পরোটা কয়েক পিস হয়তো মলিনভাবে পড়ে থাকে কাঁচের বাক্সের ভেতরে। যেন যুদ্ধে হারের পর বেঁচে যাওয়া বিজিত গোষ্ঠির কোনো সৈনিক। লুকিয়ে থাকতে পারলে বাঁচে। 

             কার তেমন বুকের পাটা, দোকানীকে বলে, ‘গরম হইবনি?’ নাঃ, সেই সৎ সাহস কোনো খদ্দেরেরই দেখিনি! চা চলে সারাদিনই। ছোটো ছোটো কাচের গেলাসে। পেছনে লাকড়ির চুলা রাবণের চিতার মতন সারাক্ষণ দাউদাউ। সমস্ত দেওয়াল কালো। বেঞ্চি কালো, চেয়ার কালো, কাঠের ছোটো আলমিরাটি কালো এমনকি ক্যালেন্ডারও কালো। দোকানীও ঘরের সঙ্গে মানানসই। শীতের দিন ছাড়া কখনো শার্ট পরা দেখিনি। ধোঁয়াচ্ছন্ন ঘর। চল্লিশ বা ষাট পাওয়ারের মলিন বাল্ব। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কে কে বসা। গাঁও প্রধান থেকে শুরু করে পাতি নেতা, স্কুলমাস্টার থেকে অফিস কেরানি, রাজমিস্ত্রি থেকে ফেরিওলা অনেকেই আসে। সারাক্ষণ গুজগুজ, ফিসফাস, হো হো নানারকম প্রবাহ। দেওয়ালের গায়ে সাঁটা ‘বিপুল ভোটে জয়ী করুন’ লেখা গত ইলেকশনের পুরানো পোস্টার। বাইরে এলোমেলো ছড়ানো সাইকেল রিকশা, দু একটি ঠেলা। খদ্দেররা অতি সাধারণ এবং আন্তরিক। তাদের কারো কানে গোঁজা আঁধখানা বিড়ি। কথা চলে বিড়বিড়। 

     এর মাঝে কখনো উচ্চগ্রামে দোকানীর গলা শোনা যায়, ‘এই ভোলা, অখনো ইখানো চা দিলে নানি? পোলা ইগু পাইছি আমি অতো অলস! যেই কামো যাইব, আটকি থাকব।’ 

তারপর ভোলা বিষয়ক আলোচনা শুরু হয় খরিদ্দারের সঙ্গে দোকানীর। 

‘কই পাইতায়! ইগুরে যে পাইছি ঔটাই ভালা। আগেরটা তো না কইয়া ভাগি গেছে।’

            চার আনায় পাওয়া যাবে বিস্কুট। তবে সে তেমন স্বাদ নয়। আমাদের পছন্দ বাদামি বিস্কুট। দাম আট আনা। একটু লম্বা, এক পিঠে বাদামের গুঁড়ো ছড়ানো। দোকানীকে বলে অপেক্ষার দাঁড়িয়ে থাকা। মাথার চাইতে উঁচু শোকেসের উপরে রাখা গোল গোল কাঁচের বয়াম। দূর থেকে দোকানীকে দেখা গেলেও আমাদের উচ্চতার জন্য শোকেসের সামনে দাঁড়ালে তাকে পুরো দেখা যায় না। তবে বাড়িতে কাকুতি মিনতি করলেও প্রতিদিন কি জোটে! জোটে না। আট আনা মানে পঞ্চাশ পয়সা তো রীতিমত অভিজাত ব্যাপার। আট আনায় পাওয়া যায় ম্যাচ বাক্স, আট আনায় লম্বা কলমের রিফিল। চার আনায় বিস্কুট, ছোট কলমের রিফিল। দামী চকোলেট মানেই পঞ্চাশ পয়সা। মোটামুটি চকোলেট চার আনা। কমলা চকোলেট কুড়ি পয়সা। পাঁচটা কমলা চকোলেটের দাম এক টাকা। আট আনায় আইসক্রিম। আমরা বলি জলবরফ। খেলেই জিহ্বায় রঙ লেগে যায়। এক, দুই, তিন, পাঁচ, দশ, কুড়ি পয়সা তখনো বাজার বহাল তবিয়তে চলে। সুতরাং দোকানের বড় বড় গোল গোল কাঁচের বয়ামের দিকে লোলুপ দৃষ্টি থাকলেও সাধ্য নেই। কোনো একদিন হয়তো বা মাঠের পাশে রাস্তায় পেয়ে গেলাম একটি পঞ্চাশ পয়সা। খেলার শেষে মাঠ থেকে বাড়ি ফিরবার সময় বাদামী বিস্কুটের সুবন্দোবস্ত। এরপর থেকে হৃৎকমলে ধুম লেগে গেল পথে পয়সা খোঁজার। বিশেষত চায়ের দোকানের সামনে। প্রায়ই পাওয়া যেত সিকি বা আধুলি।

         কোনো একদিন শিঙ্গা বাজিয়ে সাধু এলেন পাড়ায়। তার পরনে লাল পোশাক। মাথায় জটা। গলায় হাতে রুদ্রাক্ষ মালা, কপালে সিঁদুর, ছাই দিয়ে উল্কি আঁকা, এক হাতে কমণ্ডলু আরেক হাতে ত্রিশূল। সিকি বা আধুলি নেবার পর গৃহস্থকে দিলেন আশীর্বাদের লাল জবা ফুল। কেমন যেন ভয় ভয় করে। আগাগোড়া রহস্য মোড়া। তার চোখ দেখি লাল। সে যে গাঁজা খেয়ে, সে কি আর জানি তখন! মনে হতো রাগী রাগী। কে যেন বলল, ওরা মানুষের মাংস খায়। খুলিতে করে রক্ত পান করেন। তাদের ঝোলায় নাকি ভর্তি মড়ার খুলি, নানা অলৌকিক পাথর, মন্ত্রপূত ক্ষমতাবান শিকড়। নিমেষেই মানুষকে গায়েব করে দিতে পারে। এক্কেবারে ভ্যানিশ! অথবা যে কারো আকার ছোটো করে হাতের কমণ্ডুলুতে ভরে নিয়ে চলে যেতে পারে চোখের সামনে। কেউ কিচ্ছু টের পায় না। শুনলাম, শ্মশান কালিবাড়িতে নাকি থাকেন তিনি।


        সে সময় ‘খোঁজকর’ (ছেলেধরা) বেরিয়েছে বেশ। কোথাও নাকি কাঠের ব্রিজ বানানো যাচ্ছে না। কে নাকি স্বপ্ন দেখেছে ছোটো ছেলের শরীর চায় সেই স্থান। বাচ্চা চুরি হয়ে যাচ্ছে। ভীত সন্ত্রস্ত সবাই। বাড়িতে পাড়ায় অচেনা সাধু দেখলেই সবার ভয়। নির্জন রাস্তায় কোনো সাধু দেখলেই খোঁজকর বলে ধারণা। বিভীষিকা। খোঁজকর নাকি সাধুর বেশে ঘুরে বেড়ায়। নানা গাল-গল্প। ভয় আর কাটে না। শ্মশান কালীবাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় গলা উঁচু করে দেখি। জায়গাটা এমনিতেই অন্ধকার। গা ছমছম করে। প্রায়ই দেখা যায় কোনো না কোন মড়া পুড়ছে। কোন মড়া না থাকলেও ভয়। সামান্য গাছ দোল খেলেও ভয় ধরিয়ে দেয়। মনে হয় চিতার ধোঁয়া লেগে মৃতদেহের রস পান করে এই গাছগুলো যেন আরো সবুজ হয়ে উঠেছে। সাধুকে দূর থেকে দেখি বটের ছায়ায় চুপ করে বসা। রাত দিন এখানেই থাকে! ভাই বলল, মৃতদেহের অপেক্ষা করে। মৃতদেহ নিয়েই নাকি সাধনা। গল্পের শেষ নেই। মনে হয় তিনি যেন অমানুষিক জীব। 

        একদিন সেই সাধুকে দেখলাম ফের ভরদুপুরে। দুপুর থাকতেই সেদিন চলে গেছি দোকানে। হাতে পঞ্চাশটি পয়সা। সকালে ঘর থেকে দিয়েছে। দুপুর আসতে আসতেই আর সহ্য হচ্ছে না, কখন নেব বিস্কুট। অনেক পীড়াপীড়িতে ঘর থেকে অনুমতি পেয়ে চায়ের স্টলে এসে দেখি ভেতরে সেই সাধু। চা খাচ্ছেন। তার ঝোলা ত্রিশূল, শিঙ্গা অসহায়ভাবে এক পাশে ঠেস দিয়ে রাখা। রক্ত নয়, এক কাপ চা। মড়ার খুলিতে নয়, কাঁচের গেলাসে। সামান্য এক কাপ চা আর একটি বাদামি বিস্কুট! বিশ্বাস হয় না। বোকার মতন তাকিয়ে থাকি। তার শরীরের কটকটে লাল রঙ চুলার ধোঁয়ায় কালো মনে হয়। তাকিয়ে থাকি। এই প্রথম তার চোখ মুখের দিকে ভালো করে তাকাই। ভয়ের কিছু দেখতে পাই না তাতে। শরীরের ওই লাল রং সরিয়ে নিলে হতে পারে সংসারে অতিষ্ঠ জর্জরিত যেকোনো মানুষ। এই ভারতের গ্রামীণ মানুষ, যার অনেক লড়াই বাকি আছে এখনো। অনেক দূরে যেতে হবে তার। একা একা।

              চা পান শেষে সাধারণ মানুষের মত দোকানির হাতে পয়সা ধরিয়ে ঝোলা কাঁধে বেরিয়ে পড়লেন। যাবার সময় শিঙ্গা বাজিয়ে আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন তার আশীর্বাদের লাল জবা। আমার আর বাদামি বিস্কুট কিনতে মন চায় না। তার কমুণ্ডলুতে ঢেলে দিলাম আধুলিটি। তিনি মৃদু হাসলেন। হাতে দিলেন একটি নকুল দানা।     

         মনে হল একটি চায়ের স্টল সব রহস্য ফাঁস করে দিতে পারে। স্টলের মালিককে ভগবান বলে মনে হয়। তিনি যেন সব জানেন। সবার গোপন, সবার আড়াল, সবার ভেতরের মায়াজাল। বাড়িতে ফিরতে থাকি। এখন আর ভয় নেই। সারাদিন যে বাদামি বিস্কুটের জন্য মন উচাটন ছিল তার চাইতে অনেক বড় কিছু যেন সঙ্গে যাচ্ছে আমার। 




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ