হরিণের ডালপালা

 





শিংয়ের ডালপালা মাথায়, হরিণ যেমন ঘাড় ঘুরিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সেরকম একটা দৃষ্টি টের পাই। কোনো বিশাল প্রান্তর, মাঠ বা হাওর বা নদী, নদীর চরের কাছে এলে বা পেরোতে গেলে, মনে হয় একটু দাঁড়াই। না হয় একটু বসি চুপ করে। মনে হয়, এদের সঙ্গে যেন আমার কিছু কথা আছে। নীরবে বসলে এদের কথাটি যেন আমি বুঝতে পারি। 

         মানুষ নিজেকে খুব বেশিই গুরুত্ব দিয়েছে, যার জন্য এই পৃথিবীতে তার হাত থেকে ক্ষতি হয়েছে বেশ। আর কোনও জীবের সেই দায় নেই। মানুষ পৃথিবী থেকে চলে গেলেও তার কৃতকর্মগুলি আবর্জনার মত রয়ে যাবে দীর্ঘদিন। এগুলো স্বাভাবিক করতে অর্থাৎ পৃথিবীপোযোগী করতে হয়তো অনেক বছর লেগে যাবে প্রকৃতির। ভেবে দেখেছি মানুষের কাজগুলো পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খায় না। মানুষের শ্রেষ্ঠ কাজগুলো, সেরা কাজগুলোও প্রকৃতিতে বেখাপ্পা বলে মনে হয়। কোথাও গগনচুম্বি উঠেছে ইমারত, কোথাও হু হু করে উঠেছে টাওয়ার, দুই দেশের বুক চিরে কাটাতার, নদীকে ঘুরিয়ে দিয়ে অন্যদিকে প্রবাহিত করা হয়েছে, সমুদ্রকে ছেঁকে তোলা হচ্ছে, তার তল দিয়ে গেছে রেললাইন– সভ্যতার প্রয়োজনেই হয়তো হয়েছে, তবে এসব করতে গিয়ে আমরা পৃথিবীর সঙ্গে প্রচণ্ড ধস্তাধস্তি করেছি। তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে তার নাড়িভুঁড়ি বের করে দিয়েছি। প্রকৃতিকে উৎপাদনমুখী করতে গিয়ে আমরা পৃথিবীর স্বাভাবিকত্ব নষ্ট করে ফেলেছি। এখন সেই গাছ, সেই পাখি, সেই পশুই সংখ্যায় বেশি, যাদের ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন হয়েছে। এখন আমরা পৃথিবীর বাইরে গিয়ে থাকার বন্দোবস্ত শুরু করেছি। তবু শহরে গেলে যেমন মানুষকেই মনে হয় প্রধান, তার কাজ ছড়িয়ে থাকে চোখের সীমানায়, এইরকম খোলা জায়গায় এলে মানুষকে গুরুত্বহীন মনে হতে থাকে। মনে হয় আসলে সে তুচ্ছ। অতিক্ষুদ্র। তার আয়ত্ত্বের বাইরেই রয়ে গেছে বেশিরভাগটা। মনে হতে থাকে সেও কুকুর বিড়াল গরু ছাগল খরগোশ কীট পতঙ্গের মত এই অসীম জগতের একটা চরিত্র ছাড়া আর কিছু নয়। অতি সাধারণ। 

            বিশেষ নয়, সবার মাঝে এই যে সাধারণ হয়ে থাকা, এইসব জায়গায় এলে এই বোধ হয়। মনে হয়, এই তুচ্ছতরের জীবনই আসল জীবন। আমরা আমাদেরকে অনেক বড় ভেবে, যাচ্ছেতাই করি। 'মানুষের চাইতে নহে কিছু মহীয়ান' এইসব আইডিওলজিগুলি আমাদেরকেই ধ্বংস করেছে। পদে পদে বিচ্ছিন্ন করেছে প্রকৃতি থেকে। 'লীভ দ্য ওয়ার্ল্ড বিহাইন্ড' নামক একটা সিনেমা দেখছিলাম সেদিন। ইন্টারনেট থেকে শুরু করে সমস্ত কমিউনিকেশন হ্যাক হয়ে যাবার পর কী অসহায় লাগছিল মানুষদের। মাঝেমাঝে মনে হয়, এই পৃথিবী তো তার মা– হয়তো বয়স্কা। তবু তার স্নেহ অপার। যদিও মানুষ তাকে ভুলে গেছে।

          যেদিকেই তাকাই, চোখের দৃষ্টি আটকায় না। অনেক দূর দেখা যায়। এই অনেক দূর দেখার ব্যাপারটি মনে এক ধরনের প্রশান্তি আনে। আমি ভেবে দেখেছি এইরকম প্রকৃতির মাঝে এলেই আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। যখন চোখ অনেক দূর যেতে পারে– দূরকে কোন জায়গা থেকে দেখার মধ্যে একটা রোমাঞ্চ আছে। এক এক সময় মনে হয় পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে কি জানি এক উৎসব চলছে। গাছপালা পশুপাখি কীটপতঙ্গ মানুষ নিসর্গ প্রকৃতি সবার প্রাণের ভেতর সেই উৎসবের বাজনা বাজছে। এইসব একসঙ্গে মিলেমিশে এই যে প্রচণ্ড ভাইব্র্যান্ট জগত, তাকে যেন একসঙ্গে ধরতে পারি না। 

          অগ্রহায়ণের শেষ। মাঠে মাঠে হলুদ সবুজ ধান। কোথাও কৃষকেরা পাকা ধান কেটে নিয়ে গেছে। রাস্তায় পড়ে আছে ধানের ছড়া। কোথাও মাঠের মাঝে ডাঁই করে রাখা আছে খড় বিচালি। কোথাও আলাদা না করা ধানের গোছা স্তূপ করে রাখা। চকিতে কাঁধে দু'দিকে দুই গোছা ধানের ভার নিয়ে চলে যাওয়া কৃষক। তার ঘনবাদামী শরীর বেয়ে নেমে আসছে ঘাম। তার মুখটি রোদে ঝামা। তাদের চলার দুলুনিটি বেশ লাগে। এক দু'জন যায় মাথায় ধানের বিশাল বোঝা। মুখ দেখা যায় না। তবে ধানের পাতা, শিষের ভেতর দিয়ে সাদা চোখের অংশটি ঠিক দেখা যায়। দিন তবু মন্থর এখানে। মানুষের এত যে গতি, সে কোথায় যেতে চায়। কতদূর যাবে! এক সময় মনে হয় এর বিপরীতে এই ঝিম ধরে পড়ে থাকার ভেতরেও কোথাও জীবন আছে। চোখের সামনে এই যে উড়ে যাওয়া প্রজাপতি। একটু আগেই আমার মাথা পাক খেয়ে সে উড়ে গিয়ে বসেছে শুকনো খড়ের পাতায়। 

            কানে আর কিছু আসে না। একটানা রী রী করা নীরবতা। আর কোনো শব্দ নেই। অনেক দূরে পাকা সড়ক। তার ওপর দিয়ে চলে যায় গাড়ি, অটো, বাইক। এত দূর যেন তার কোন গতি এখান থেকে বুঝা যায় না। শব্দ কানে পৌঁছায় না। হাওয়ার উপর ভর করে কাঁপতে কাঁপতে ঘন রোদের ভেতর দিয়ে ওরা যেন কোথায় চলে যায়। দূরে হাওরের মাঝখানে জেগে আছে একটি অনুচ্চ টিলা। এবার বর্ষায় দেখেছি সমস্ত হাওর যখন জলমগ্ন, সেই টিলা শুধু জেগে ছিল। কলার  ভেলা নিয়ে বালকেরা এই দিক থেকে ওই দিকে যায়। মাঝে মাঝে টিলাতে উঠে দাঁড়ায়। কয়েকটি আম গাছ আছে সেখানে। গোলাকার। অপূর্ব লাগে। এখন জল নেই।  দূরে কুয়াশা পড়েছে। নীলচে। জীবনানন্দ যে বলেছিলেন নীলাভ সন্ধ্যা, তা যে কত সত্য– স্পষ্ট বুঝা যায়। পাশেই লাই এবং মুলা ক্ষেতের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে একটি কাকতাড়ুয়া। দেখলে মনে হয় হঠাৎ যেন কোন লোক দাঁড়িয়ে। তার চুনআঁকা সাদা চোখ কালো পাতিল– গ্রামীণ চেহারাটি যেন আজকের নয়। আবহমান বাংলার সঙ্গে তার গভীর যোগ। শুধু ধুতির বদলে পরনের প্যান্টটি আধুনিকতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একেক সময় ভাবি মানুষের প্রতিদিনের এই যে নিত্যনৈমিত্তিক কাজের ধারা তার ভেতরেই আছে তার সত্যিকারের ইতিহাস। সামান্য একটি পোকা বা পাখি, গাছ জন্ম নিচ্ছে ধ্বংস হচ্ছে, ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া থেকে শুরু করে এই যে চলমান মহাজগৎ তার প্রবাহের এই বিশাল ইতিহাস কারোর সাধ্য নেই লিখে রাখে! উদাসীন এই বিশাল নীলিমার নীচে আমারও কোনো নাম নেই। মনে হয় মানুষ অযথাই নিজেকে বিশেষ করে তোলে। সাধারণ হবার সাধনাই কবির সাধনা।

               বিকেল হলেই মাথার উপর দিয়ে হু হু করে ছুটে যায় শয়ে শয়ে বক সারস বালিহাঁস। নাম না জানা আরো কত পাখি! শীত ছাড়া অন্য সময় তাদের তেমন দেখা যায় না। এরা পরিযায়ী। শীতে নদীর জল যখন প্রায় শুকিয়ে গেছে– চরে তারা মাছ ধরতে নামে। কত দূর দূর থেকে তারা আসে। কিছু কিছু আসে সাইবেরিয়া থেকে। তবে সাইবেরিয়ার পাখি উদয়পুরেই বেশি নামে। সেখানে জলাশয় অনেক বেশি। বিকেলে যখন উড়ে যায়, তাদের পাখার শব্দ আমি নিচে বসে স্পষ্ট শুনতে পারি। এমনকি ঘ্রাণও। একটু উপরে যদি সোজা উঠে যাওয়া যায়, তবে তাদেরকে ছোঁয়া যেত। ঐ উঁচু গর্জন গাছের উপরে দিয়ে। তারা বহুদূর চলে যাবে জানি। V এর আকার নিয়ে এরা উড়ে যায় বাংলাদেশের দিকে। আমার কেন জানি মনে হয় ওরা উড়ে উড়ে হাকালুকি হাওরের দিকে গেছে, ঐ যেখানে লঙ্গাই আর জুরি একসাথে গিয়ে মিশেছে।

             এখন যেখানে বসেছি সেটাকে ভৈরবের থলি বলে। জায়গাটি দীঘলবাঁক।  পশ্চিমবঙ্গে যাকে থান বলে, আমাদের এখানে এটাকেই থলি বলে। 'থান' শব্দটি যেমন স্থান থেকে এসেছে, তেমনি 'থলি' শব্দটি 'স্থল' থেকে ই প্রত্যয় হয়ে এসেছে। মজার ব্যাপার হল, 'স্থল' শব্দটি 'জল' শব্দের ধ্বন্যাত্মক বা অনুকার শব্দ। যেমন 'জলস্থল'। মনে হয়, 'স্থল' কথাটির ভেতর জলের একটা প্রচ্ছায়া আছে। যেন জলের লাগোয়া ভূমি, মানে যেমন জল স্থল পাশাপাশি। আমাদের এইসব অঞ্চলে অজস্র শিব বা ভৈরবের থলি রয়েছে। মনে হয়, এসব অঞ্চলের অনেক জায়গাই প্রায় জলে ডুবে থাকত। বিশেষত বর্ষায় বা বর্ষার পরে অনেক মাস। হাওরগুলো বা তৎসংলগ্ন সব অঞ্চলের চেহারাই মূলত তেমন ছিল। আগের তুলনায় বৃষ্টি কমেছে এখন। দীঘলবাঁক শব্দটির ভেতরেও জলাভূমির একটি ছবি সুপ্ত হয়ে আছে। যদিও এখন পাকা সড়ক আছে। এখন সেই নয়ের দশকের দৃশ্য কল্পনা করা দুষ্কর। সেই সময় দূরের ওই রাস্তাটির ছিল একেবারেই কাঁচা, বড় আলপথ যেন। মানুষের বাড়িঘর ছিল কম। হাওরের মাঝখানে এই থলি। তার পাশে ছায়াকালো জল। পুকুরের চারদিক ঘিরে আম গাছ, কাঁঠাল গাছ। 

              ভাবি, শিব দেবতাটি ভারতবর্ষের আদি এবং সত্যিকারের দেবতা। পথে ঘাটে মাঠে রাস্তায় গ্রামে নগরে জঙ্গলে অরণ্যে পাহাড়ে সমতলে দূর থেকে দূরে কত যে তার থান, কত যে তার মন্দির! কত অখ্যাত কুখ্যাত স্থানে নিস্পৃহ উদাসীন তিনি আছেন। বটের বীজ যেমন কেউ তেমন লাগায় না, হাওয়ায় উড়ে উড়ে একস্থান থেকে আরেক স্থানে যায়, শিকড়বাকড় ছড়িয়ে ঝুরি নামিয়ে গাছ হয়, শিবঠাকুরও তেমনি। তার যেন কোনো অহঙ্কার নেই। অল্পেতেই তিনি খুশি। ভোম ভোলা। পিঁপড়ে এসে ঘুরে যায়, ছাগল বসে থাকে, পাখিরা ডালে বসে মলত্যাগ করে। তার মাথায় কোনো ছাদ নেই। নিস্পৃহ। উদাসীন। সপ্তাহ বা বছরের একটি কি দুটি দিন কেউ এসে ধুইয়ে দেন সব, ফুলবেলপাতা দেন, আর বাকি দিন থাকেন নির্জন। চুপচাপ। কেউ ভয় পান। ভৈরব মহাবিভীষিকাময়। এড়িয়ে চলেন। আমার ভালো লাগে। প্রকৃতির মতন মনে হয়। মাঠের মাঝখানে নিঃসঙ্গতায় তিনি যেন চোখ বুজেই থাকেন। তাকে আবর্তন করে সব। দিনে দিনে তিনি যেন প্রকৃতির অংশ হয়ে উঠেছেন। লিঙ্গটির দিকে তাকাই। মনে হয় তারও যেন বিশেষ থেকে সাধারণ হবার সাধনা। একার সাধনা। 

    মাঠের মাঝখানে একা বসে কত হাবিজাবি মনে আসে। যার একটার সঙ্গে একটার কোনো যোগ নেই। বোকার মত তাকিয়ে থাকি। মাথার ভেতর এইসব চিন্তার ডালপালা যেন আরো উঁচু হয়ে ওঠে। পুকুরের কালো জল আরও কালো লাগে। তাতে আকাশের ছায়া, দূরে নীলিমার গায়ে ফুটে থাকা একফালি চাঁদের ছায়া পড়েছে। যেন শিবের মাথার চাঁদ। মুগ্ধ চেয়ে থাকি। দু'চোখ ভরে দেখা ছাড়া আমাদের আর কী ঐশ্বর্য আছে!




মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ