হাওয়ার দিন
দারিদ্র্যের ভেতরে এক ধরনের মুক্তি আছে। বিশেষত কৈশোরে, যখন পিঠে দুটি পাখার জন্ম হয়েছে সবে, যখন বাবা-মায়ের সব কথার উল্টোদিকে নিজের একটা ইচ্ছা মাথাচাড়া দেয়, যখন মন আড়াল চায়, একা একা কিছু বুঝতে চায়, ঠিক তখনই পাখাটি শরীরের চাইতে অনেক বড় হয়ে যায়। ঘর গলি পেরিয়ে শহর গ্রাম পেরিয়ে সে ঘুরে বেড়ায়। সে সময় দারিদ্র্য একটা সম্পদ। সে অনেক কিছু করার চ্যালেঞ্জের জন্য নয়। এ ছাড়াও তার অনেক কাজ আছে। দারিদ্র্য ঘরে থাকলে ছেলে মেয়েরা অনেক স্বাধীনতা আপসেই পেয়ে যায়। অনেক সুযোগ আপন মনে কিছু করার। বাবা-মায়েদেরও এত সময় নেই সন্তান নিয়ে পড়ে থাকার। তীব্র শাসনের বা শৃঙ্খলার বাইরেও সুতরাং থেকে যায় পরিসর। এই পরিসরের বিকল্প নেই। পাখার বিস্তার দিনে দিনে বাড়তে থাকে। আপন মনে অবাধে ঘুরে বেড়ানোর সে এক ভিন্নতর স্বাদ।
সেই আটের দশকের শেষ বা নয়ের দশকের সূচনায় মোবাইলহীন ছোট্ট শহরগুলিতে ছিল না বড় বড় মল বা দোকান। স্থানে স্থানে বড়দের আড্ডা আর ছোটোদের খেলা ছিল নিত্যকার্য। এত বাইক বা গাড়ির হুশহাশ নেই। রিকশা ছাড়াও ছিল সাইকেল নিত্যসঙ্গী। সাইকেল রেডিও টেপ রকর্ডার এই তো সেদিনও গ্রামেগঞ্জে বর যৌতুক হিসেবে পেতেন। অবশ্য ততদিনে স্কুটার ঢুকে গেছে উচ্চ মধ্যবিত্তের ঘরে। বিয়েতে স্কুটার দেওয়াটা ছিল রীতিমতো অবাক করা বিষয়। আর বাইক তো বিশাল ব্যাপার। সাধারণের কাছে সাইকেলটাই ছিল সবসময়ের সঙ্গী। আর কৈশোরে সাইকেল তো ভূতের রাজা দিল বরের মতন। সেটা সেই সময়, যখন বাড়ি থেকেও মনে হয়, গলি বা পাড়ার বাইরে অন্য পাড়ায় গেলে কিছু হবে না। অন্য পাড়াটা যে কোন ক্ষেত নদী কার্লভার্ট ভৈরবথলি চা বাগান জঙ্গল বিল ন্যাশনাল হাইওয়ে পেরিয়ে কোথায় অবস্থিত সে কি সাইকেল চালক নিজেও জানে!
উত্তর ত্রিপুরায় 'বাউটা' বলতে একটা শব্দ প্রচলিত। বিশেষত শ্রীহট্টীয়রা এই কথাটি খুব বলে থাকেন। যেমন, 'ফুলা ইগু যে বাউটা, খালি চক্কর মারে।' বেশি যারা ঘোরাঘুরি করে তাকে বলে বাউটা। কথাটি এসেছে আসলে সংস্কৃত 'বাতায়ু' শব্দ থেকে। বাতায়ু শব্দের অর্থ হল হরিণ। মূলত হরিণের দ্রুতগামীতা বুঝাবার জন্য শব্দটি ব্যবহৃত। 'বাতায়ু' শব্দের 'তা' অংশটি বাদ দিলে যেমন 'বায়ু', ঠিক তেমন 'বাত' কথাটিও বাতাসকে ইঙ্গিত করে। 'বাতায়ু' থেকে 'ত'-এর মূর্ধণ্যীভবন 'বাটাউ' ও পরে বর্ণবিপর্যয় হয়ে এসেছে 'বাউটা' শব্দটি। শব্দটি হয়তো সংস্কৃত থেকে বাংলা হতে হতে তার দ্রুততা হারিয়ে ফেলেছে। হয়ে গেছে অর্থগতভাবে শুধু ঘোরাঘুরি। কথাটি বর্ণবিপর্যয়ের ফলে আভিজাত্য হারিয়ে গরিমা হারিয়ে উদ্দেশ্যহীন এলোমেলো ভ্রমণের অর্থ নিয়েছে। তবু ভেবে খুব অবাক লাগে শব্দটির ভেতরে 'হরিণ' রয়েছে কোথাও। তার বিস্মিত তাকিয়ে থাকা ও দ্রুত ছোটার বিষয়টি এড়াতে পারি না।
হরিণের মত দ্রুতগামী না হলেও মাঝেমাঝেই ইতস্তত ঘোরাঘুরিই ছিল প্রথম স্বাধীনতার আস্বাদ। সেই ঘোরাটা ছিল একা একা। মনে আছে কোথা থেকে কোথায় যে যাওয়া যেত। সকালে কিচির মিচির করতে থাকা পাখিদের ভিড়ে, খোলা মাঠে ধানক্ষেতের পাশে, দুপুরের ঝমঝমে রোদের ভেতর বাজারে, ঐ যেখানে মিহিদানা আর শনপাপড়ি বেচতে থাকা কাবুলিওয়ালার মত লোকটি বসে আছে ছায়ায়, অথবা বিকেলের শান্ত গাছের নিচে– কোনো জলাশয়ের পাশে ঐ যেখানে নীল হয়ে আসে সন্ধ্যা। মনে হতো, পৃথিবীতে প্রতি মুহূর্তে একটা না একটা উৎসব লেগেই আছে। অচেনা মানুষ, বাজার, দেবালয়, তেতে ওঠা পথ, মিছিল, ডুগডুগি বাজিয়ে সাধু, গামছায় ঘাম মুছতে থাকা আখের রস বিক্রেতা, অথবা স্টেশনের পাশে হনুমান মন্দিরে করতাল আর ঝুনঝুনি বাজিয়ে গান করতে থাকা বিহারী মানুষ, তাদের কথা বলা, চিৎকার দেওয়া, ঝগড়া, উল্লাস– দেখে মনে হতো কোথায় কী যেন এক রহস্য ঘটেই চলছে অগোচরে, বুঝতে পারছি না। যেন ধরতে গিয়েও ধরতে পারি না। বাউটামিই ছিল কাজ। সেটাই স্বাধীনতা। প্রথম মুক্তির আস্বাদ। সাইকেলের চাকার শো শো শব্দই ছিল আত্মার ধ্বনি। বাংলাদেশের বর্ডার হোক আর জঙ্গলের পাশে কোনো অচেনা ঢিপি– বাতাসের মতনই ছিল দিন।
সাইকেল ছাড়া আরেকটি বিষয় ছিল, সিনেমা। বখে যাবার একটা প্রধান এলিমেন্ট। যদিও ছোট্ট শহরে যেসব সিনেমা চলত, সেগুলি ছিল বহু পুরাতন। নতুন সিনেমা এলেও সাত আট মাস পরে, যখন দাম কমে যেত। সিনেমা হল আসলে শহরের চোখ। বিশেষত আট-নয়ের দশকের গ্রামগন্ধী ত্রিপুরার মফস্বল শহরগুলোর ক্ষেত্রে নিশ্চিত। ভেবে দেখলে, আর কীই বা ছিল বাইরের জগতকে তাড়াতাড়ি তীব্রভাবে বোঝার! অথবা বিনোদনের! মনে পড়ে, শীতেও হঠাৎই রাত দশটায় রাস্তায় হৈ হৈ করতে করতে যেত হলভাঙা লোকের ঢল। তাদের কথা উচ্ছ্বাস চিৎকার সন্ধ্যার পর থেকে ঘুমে ঝুরতে থাকা কিশোরেরও চটকা ভেঙে দিত।
মাঝখানে অনেক বছর বন্ধ হয়ে এখন যদিও মাল্টিপ্লেক্সের যুগ। গোছানো তকতকে সব। ছোটো ঘর, ছোটো পর্দা, কার্পেটসজ্জিত মেঝে, চারদিকে অনেকগুলো সাউন্ডবক্স, নরম গদিওলা সিট– বসলেই শরীর এলিয়ে পড়ে। তুলনায় আট-নয়ের দশেকের ত্রিপুরার সিনেমা হলগুলির চেহারা, চরিত্রই ছিল আলাদা। যদিও প্রায় প্রতিটি ছোটবড় শহর বা শহরতলীতেই ছিল এর উপস্থিতি।
দুটি যুগের যেন বিশাল পার্থক্য। যেমন, এখনকার মাল্টিপ্লেক্সগুলোর প্রায় সবই ইংরেজি নাম– গোল্ড সিনেমা, আইলেক্স, ওরিয়েন্টাল টকিজ। বাংলা নামও ইংরেজি কায়দায় ব্যবহার করা হয়, যেমন সংক্ষেপে এস এস আর সিনেমা। কিন্তু আট নয়ের দশকে মোটামুটিভাবে সিনেমাহলের নাম বাংলাতেই ছিল। যেমন আমাদের ধর্মনগরে যে দুটি সিনেমা হল ছিল বহাল তবিয়তে, তার একটি, মায়া সিনেমা হল আর অন্যটি বলাকা সিনেমা হল। নাম দুটির মধ্যেই যেমন সহজ বিষয়টি জড়িয়ে আছে, হলগুলিও ছিল তেমন। 'মায়া' যদিও ছিল আয়তনে বড়, সিট কিছুটা তুলনায় ভদ্রস্ত, 'বলাকা' ছোট, তার উপরে নারিকেলের ফাইবার বেরিয়ে থাকা ভাঙা কাঠের সিট। দুটিতেই 'উলুস' বা ছারপোকার আক্রমণে বিপর্যস্ত দর্শককে কখনোই বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে যেতে দেখিনি। সে এক লড়াই। তবু হতাশা নয়, শরীর চুলকোতে চুলকোতে নতুন জামাই ইন্টারভ্যালে বেরিয়ে সহাস্য মুখে সদ্য যুবতী শ্যালিকাকে অম্লান বদনে পান ও কোল্ড ড্রিংকস কিনে দিতে দেখেছি। শ্যালিকারও কোনও অভিযোগ নেই, ভ্যাপসা গরমে জামাইবাবুর পিছু পিছু ঢুকে গেছেন ফার্স্ট ক্লাসে। কত ছবি। দিনগুলিও ছিল সিনেমারই মত। রানিরবাজারে দাদার ওখানে গেছি। হলের নাম 'বুইড়ার ডাব্বা'। পরে জেনেছি তার আসল নাম নাকি 'রূপবাণী'। কিন্তু স্থানীয় লোকেরাই তার নাম দিয়েছেন 'বুইড়ার ডাব্বা' আসলে যে লোকটি এই হলটি স্থাপন করেছিল তিনি ততদিনে বয়স্ক। তার হলটিও তদ্রূপ। চেয়ারের জায়গায় বাঁশের বেঞ্চি পাতা। জোড়া তালি লাগানো পর্দা। রুপালি নয় অনেকটা ঘী-রঙের কালো কালো। কোথাও একটু ঢেউ-খেলানো, সুতরাং ছবিগুলি আঁকাবাঁকা হয়ে আসে। এতেই ভিড় কিন্তু সাংঘাতিক। এত ভিড় কেন তবু! সিনেমার শুরুর পরে ঢোকা এবং ইন্টারভ্যালের পরে বেরিয়ে আসা আবার ইন্টারভ্যালের পর শুরুর পরে ঢোকা এবং সিনেমার শেষ হওয়ার আগে বেরিয়ে আসার রহস্য পরে একদিন বুঝতে পেরেছিলাম। সামান্য কয়েকটি দৃশ্যের জন্য সে কী হাপিত্যেশ! লুকোচুরি। কখনো ইন্টারভেলের আগে আলো জ্বলে উঠলে দেখা যেত কোন শিক্ষক মহাশয়ের পাশেই হয়তো এতক্ষণ বসা হয়েছিল। এসব ঘটনা ঘটত আকছার!
সে এক দিন গেছে। আপন মনে ঘুরে বেড়াবার সেসব দিন। সে দেখা ছিল বিস্ময়ের। তবু যেন চোখ আর মন স্বস্তি পেত না। হাওয়ার উপর ভর করেই যেন চলেছে সব। এভাবেই ঘুরতে ঘুরতে মাঝে মাঝে মনে হতো, হঠাৎ হারিয়ে গেলে কেমন হয়। আসলে কৈশোরে সবার ভেতরেই হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার একটা ইচ্ছা জেগে থাকে। আর যেন সে ঘরে ফিরতে চায় না। মানুষ যে আসলে পর্যটক, মানুষ যে আসলে সমস্ত পৃথিবীর ঘুরে বেড়াতে এসেছে। সে বোধ তখনই তার ভেতরে বাসা বাঁধে। সেজন্য হয়তো এডভেঞ্চারের কাহিনি সে বয়সে এতো সবাইকে আকর্ষণ করে। কখনো বেরোতে বেরোতে মনে হতো আর ফিরব না। দূর কোনো টিলার উপরে যেখানে প্রচুর রোদের ভেতর নিবিড় ছায়া পড়ে আছে, শুয়ে থাকতাম অনেকক্ষণ। মাথার উপর দিয়ে উড়ে যায় পাখি, উড়ে যায় মেঘ, তার ছায়া পড়ে আমার মুখের উপর। নির্জন দ্বিপ্রহর। কোথাও বক বসে থাকে স্থির হয়ে। মাছরাঙা চুপ করে। হঠাৎই এক লাফে জলের কোন গভীর থেকে এক ছোঁ-য়ে মাছ নিয়ে উঠে যায় শূন্যে। মনে হতো, পৃথিবী অসম্ভব সুন্দর। মাছরাঙার ছোঁ-এর পরে যে মৃত্যুর ঘটনাটি হল, সে যেন কত নির্মমভাবে স্বাভাবিক। এত দিক দিগন্ত জোড়া ছড়ানো এ পৃথিবী, কতদূর যাব আমি! কতদূর যেতে চাই! উপুর হয়ে পিঁপড়েটিকে দেখি। ঘাসের তলা দিয়ে পথ। এঁকেবেঁকে ছুটেছে সে। কোথায় যায় সে! মানুষ কোথায় যায়! আসলে কি কোথাও যায়!


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন