সুই সুতা দুই টাকা


‘সুই সুতা দুই টাকা, সুই সুতা দুই টাকা’ এই একটা সুর এখনও কানে ভাসে। হরিমন্দিরের সামনে একটা লোক সন্ধ্যার পরেই কাঁধে কিছু গামছা আর শরীরের সঙ্গে কাপড় দিয়ে বাঁধা একটি কাঠের বাক্স নিয়ে ঘুরে বেড়াত। নানা আকারের সুঁচ হরেক রঙের সুতার সঙ্গে ইঁদুর তেলাপোকার বিষও বিক্রি করত লোকটি। উপরের লাইনের সঙ্গে মিলিয়ে আরো একটা দুটো লাইন ছিল ছড়াটিতে। এখন আর মনে পড়ে না। তবে তার কণ্ঠ্য আর সুরটি ছিল বিচিত্র। ভিড়ের মধ্যে বহুদূর থেকেও স্পষ্ট শোনা যেত। পরনে সাদা ফতুয়া আর ধুতি। সে বেশি দূরে যেত না। হরি মন্দিরের পাশে কিছুটা চত্বর জুড়ে কেবলই পায়চারি করে বেড়াত।

       জানি না এছাড়া তার আর কোনো পেশা ছিল কী না। সম্ভবত চাষবাসই করতেন দিনে। বিকালে হয়তো সুই সুতার পসরা নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। অথবা সেসময়ের অনেক মানুষের মতন ছিলেন হয়ত কীর্তনের দলের কেউ। নাক-মুখ রোগা হলেও এক কালে যে তার বাবরি চুলে ঐশ্বর্য ছিল, অনুমান করা যায়। গলায় তুলসী মালা আর ঐ চুলের বাহার দেখে এই কল্পনা করাটা স্বাভাবিক। পরে শুনেছি, এসব ছাড়াও সুতোও বানাতেন, রঙ করতেন, গামছা বানাতেন নিজের তাঁতে।

           ঠিক কবে তাকে শেষ দেখেছি মনে পড়ে না। তবে হাফপ্যান্টের বয়সে বাবা মায়ের সঙ্গে বাজারে গেছি আর তাকে দেখিনি, তার কণ্ঠ্য শুনিনি, এ হয়নি। এখন মাঝে মাঝে ভাবি, এত স্বল্প আয়োজনের দোকানে তার সংসার চলত কীভাবে!  

          এক এক জন মানুষ কত অল্পেতে খুশি হয়। আর একেক জনের প্রচুর লাগে। অনেক পেলেও অভাব আর ঘোচে না। কেন জানি মনে হয় সেই প্রাচীন বাংলার নিতান্ত সাধারণ মানুষের প্রচ্ছায়া যেন আছে লোকটির ভেতরে। এই লোকটি যেন দেশভাগের আগের মানুষ, যে কোন একটা পরিস্থিতির শিকার হয়ে এপারে চলে এসেছে। এপারে মারমুখি জনতা। কীভেবে আরেকটু বেশি পাওয়া যায়, তার লড়াই। ভোগের দীঘল হাত, লোভের প্রসারিত জিহ্বা এখন সবার ভেতরে লকলক করছে। এর থেকে দূরে সামান্য আয়োজনের সংসার পাতা শেষ মানুষ যেন তিনি। 

          তার সুরটি কানে ভাসে। ডাকঘরে অমল দইওয়ালাকে বলেছিল কেমন করে ‘দই ভাল দই’ সুর করে দইওয়ালা ডাকে সেটা শিখিয়ে দেবার জন্য। অমল মারা যাবার পর সেটা আমাদের আর শেখা হয়নি। পাঁচমুড়া পাহাড় শ্যামলী নদী সব ছেড়ে দেশভাগের পরে এপারে এসে ওই সুরটুকু হয়তো গলায় থেকে গেছে কারো। কোন একদিন কীর্তনের কোনো আসরে সেটা আর্তনাদ হয়ে শোনা যায় হয়তো, কিন্তু ততদিনে সে আউটসাইডার। বহিরাগত নতুন ইহুদী। তার সুর আছে কিন্তু জমিন নেই, মাটি নেই। সেই সুরে তাই অবিশ্বাস আছে, অসহায়তা আছে, আত্মবিশ্বাস নেই। ডাকঘরে যারা প্রহরী, মোড়ল সেই চরিত্রই মুখ্য। সুতরাং বিচ্ছিন্নতা। খণ্ডবিখণ্ড সোসাইটি। টুকরো মানসিকতা।


               বাংলার প্রাদেশিকতা ও আঞ্চলিকতার দিকে তাকালে এখনো এটা ভাবতে কষ্ট হয় যে বাঙালি বলে কোনো জাতি আদৌ ছিল। এত তার পৃথকত্ব। জন্ম মৃত্যু বিবাহ অন্নপ্রাশন সাধভক্ষণ থেকে খাবার দাবার সবকিছুতেই এত এত আলাদা বৈশিষ্ট্য যে সব মিলে যে একটা সামগ্রিকতার বোধ তা জার জাগে না। আমি দেখেছি শ্রীহট্টীয়রা নোয়াখালিদের নিয়ে হাসাহাসি করে, কুমিল্লার লোকেরা আবার শ্রীহট্টীয়দের কথায় মজা পায়। আবার বরিশালের লোকেদের ঠেস দিয়ে কথা বলা ঢাকা ভিন্ন চোখে দেখে নদীয়া বা কোলকাতাকে। আবার এক শ্রীহট্টের ভেতর কথা, জীবন-যাপন, চাল-চলনের কত যে তফাৎ! বাঙালিদের অঞ্চলে অঞ্চলে এত ভিন্নতার ভেতরেই যে দেশভাগের বীজ লুকিয়ে নেই, কে বলতে পারে! তাচ্ছিল্য নিন্দা অপমানের চোরাস্রোত সদা জাগ্রত হয়ে বিভিন্ন লৌকিক আচার অনুষ্ঠানেও প্রবাহিত। যদি বলা হয়, বাঙালির পরিচয় ভাষায়, তা নিয়েও যে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য তা কম নয়।

         দেশভাগ কাকে যে কোথায় এনে ফেলেছে! কার সঙ্গে বেঁধেছে কার গাঁটছড়া, ভাবলে এখন অবাক হতে হয়। কচুরিপানার মত ভেসে কে যে কোথায় এসে ঠেকেছে! দেশ বদলেছে, পরিজন বদলেছে, পরিবেশ বদলেছে, টিকে থাকার লড়াই এক হলেও পুরানো গৌরবগাথা অথবা পরিচয়কে খড়কুটোর মত আঁকড়ে থাকতে দেখেছি । বিশেষত জন্ম মৃত্যু বিবাহ থেকে নানা সামাজিক সংস্কৃতিতে কঠোরভাবে পালন করা হয় তা। এমনকি আগের বিবাহের চিঠিতে আবশ্যক ছিল পূর্ব নিবাস কোথায় তা জানানোর। সম্প্রতি মৌখিকভাবে থাকলেও আলোচনায় তা বর্জিত হচ্ছে। আর যে ফিরে যাওয়া হবে না, সেটা বুঝতে বা বিশ্বাস করতেও লেগেছে অনেক দশক। সেই দগদগে ঘা, সেই লড়াই প্রজন্ম ধরে প্রবহমান।

         ইদানীং সেই লোকটাকে আমি স্বপ্নে প্রায় দেখি। এতসব ভিন্নতা নিয়ে আমার কাছে তিনি সটান এসে দাঁড়ান। চিৎকার দিয়ে জানান, সুই সুতা দুই টাকা। দুই টাকার সুই সুতোয় যেন তিনি সব সেলাই করে ঠিক করে দিতে পারবেন। কেবলি মনে হয় দেশভাগ আমাদের সব কেড়ে নিয়েছে, কেবল সুরটুকু পারেনি। 



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ