দিনান্তের মুক্তি

 


নেশারও চরিত্র আছে। আসক্তিরও আছে নিজস্ব মেজাজ। কালে কালে তার স্বরূপ বদলে যায়। অর্থনীতির সঙ্গে তার যোগ। সংস্কৃতি সঙ্গে তার সম্পর্ক। নেশার ইতিহাস আসলে মানুষের সংস্কৃতির ইতিহাস। যাপনেরও ইতিহাস। একটা কর্পোরেট পার্টিতে কোট টাই পরা অবস্থায় কাউকেই বিড়ি টানতে দেখা যাবে না। হাতে হুইস্কির গ্লাস সেখানে যতটা স্বাভাবিক, প্রাগৈতিহাসিক হয়ে উঠবে হুঁকো। অথবা লাঙ্গি বা তাড়ি। সিগার কামড়ে সাত-আট দশকের উঠতি বড়লোক মেয়ের বাপেদেরকে সিনেমায় খুব করে প্রদর্শিত হয়েছে। আর্থিক স্থিতিশীলতা ও আভিজাত্য যেন এতেই ফুটে বেরুতো। নায়ক কিন্তু সিগারেটে, বিড়ি নয়। বিড়ি গ্রামের, নিম্ন অর্থনীতির দ্যোতক। চর্যাপদে যেমন শুঁড়িখানার কথা আছে, সে সময়ের জীবনসংস্কৃতির সঙ্গে এটা মানানসই। ইয়োরোপীয়রা এদেশে আসার পর আমাদের নেশার নিজস্ব আবহমান সংস্কৃতিটিও বদলে দিয়েছিলেন। সুরার কথা মহাভারতে বা ভারতের প্রাচীন গ্রন্থাদিতে থাকলেও নেশারও যে উপনিবেশায়ন হয়েছে, তা তো সত্য। যে গাঁজা, সিদ্ধি, ভাঙ এ দেশে দেবত্বের মর্যাদা পেয়েছে, তার অবনমন ঘটার পর তা এখন অনেকক্ষেত্রে সন্ন্যাসীদের কারো কারো পুরিয়াতে অথবা গণবিচ্ছিন্ন হয়ে বিশেষ কোনো উৎসব বা পূজার প্রসাদে গিয়ে ঠেকেছে। মধুসূদনের মদ্যপান হোক কিংবা বঙ্কিমচন্দ্রের হুঁকো, শরৎচন্দ্রের অহিফেন সেবন হোক বা গিরিশ-শক্তি-ঋত্বিকের মাতলামির গল্প, সবই আসলে সংস্কৃতির বদলে যাওয়ার সূচক। সংকটের ছবি। সবাই সব নেশা করে না। ক্লাস বলতে একটা কথা আছে। ইংরেজ আসার পর যেমন দেশি তাড়ি, ঘরে বানানো ভাতের মদের সাংস্কৃতিক অবনমন ঘটে। আভিজাত্য কমে যায়। পঞ্চাশের কবিরা খালাসিটোলায় গিয়ে দেশি দারু, সস্তা মদ খেয়ে হয়তো নেশার আভিজাত্য বা উপনিবেশায়নকে ভাঙতে চেয়েছেন। ডিক্লাস করতে চেয়েছেন। এটা তাদের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একটা প্রকাশ হয়ে থাকতে পারে। 

            বিবেকানন্দ যে হুঁকোতে টান দিয়ে জাতধর্মের বালাই ভাঙতে চেয়েছিলেন আমাদের সেই ছোটবেলায়, বিশ শতকের আট নয়ের দশকে তার আর কোনো অস্তিত্বই রইল না। তখন এক হুঁকোতে অনেকজন। দেশভাগের সঙ্গে সঙ্গে নারিকেলের খোল দিয়ে বানানো সেই থেলো হুঁকোটিও হাতে হাতে করে আসে। তবে ততদিনে গ্রাম ছেড়ে শহরে বদলে গেছে অর্থনীতির কেন্দ্র। মানুষেরও গতি বদলে গেছে। এখন আর ক্ষেতের পারে গাছের তলায় বসে জমি চাষের ফাঁকে দুটো টান দেওয়া পৌরাণিক কল্পনা। শহরে নানা কাজ। নানা জায়গায় যাওয়া। অনিশ্চিতি। বিড়ি বা সিগারেট বহন করতে সুবিধা। 

       এসব ভারী ভারী কথা থাক। এখনও চোখ বুজলে একটি ছবি খুব মনে পড়ে।

        অষ্টপ্রহর কীর্তন চলছে। প্রকাণ্ড চাঁদ উঠেছে সেগুন গাছের মাথায়। আধো আলো আধো অন্ধকারে একেকজনকে মনে হচ্ছে আধিভৌতিক। নাটমন্দিরের দুদিকে দুটো প্যাট্রোম্যাক্স বাতি ঝুলছে। চার কোনায় চারটি কলাগাছ, প্রত্যেকটার নিচে ছোটো ঘট। সবদিকেই লাল নীল কমলা সবুজ রঙের কাগজের ঝালর ঝোলানো। কলা গাছে গাঁথা তিনকোনা কাগজের পাতাকা। এসবই আগের দিন নিজেদের হাতে বানানো, ময়দা দিয়ে সাঁটানো। লেপাপোছা নাটমন্দিরে পাটি, বিছানার চাদর, চাটাই পেতে হয়েছে বসার ব্যবস্থা। দূর দূর থেকে এসেছেন কীর্তনীরা। তাদের অনেকেরই বাবরি দোলানো চুল, কারো টেরি কাটা, কারো ঢেউ খেলানো। গলায় ফুলের মালা, কপালে রসকলি, পরনে ধুতি আর আধময়লা ফতুয়া, একেক জন যেন প্রাগৈতিহাসিক চরিত্র। যেন ইতিহাসের কোন পাতা উল্টে গেছে আনমনা বাতাস লেগে আর উঠে এসেছেন এইসব জলজ্যান্ত মানুষেরা। হারমোনিয়াম, খোল, করতাল, খঞ্জনি, কাঁসর বাজছে জোরে। গান উঠেছে উচ্চগ্রামে। 

            একটু দূরে বাইরের দিকে উঠোনের কোনে থেলো হুঁকা নিয়ে বসেছেন দু তিনজন। আমরা বলতাম ‘হুক্কা’। জলচৌকিতে বসেছেন তারা। যেন একটু আড়ালে। অন্ধকারে জ্বলে উঠছে টিকির আগুন, শব্দ উঠছে বুডুবুডুবুডু করে। কিছু পরে পরেই কীর্তন আসরের পেছন দিক থেকে কেউ একজন ছিটকে বেরিয়ে আসছেন, অন্ধকারে মিশে দুটো টান দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। এই দৃশ্য আমার ছোটবেলার। কীর্তন থাকলেও এখন সে ছবি আর নেই। হুঁকোর সঙ্গে কারো কারো চলত বিড়ি। তবে অপেক্ষাকৃত বয়স্করা সে সময় হুঁকোই টানতেন। হুঁকোয় দুই টান দিয়ে একেকজন কুলকুচি করে ফের আসরে গিয়ে বসতেন।  


       কীর্তনীরা অনেকে নেশা করতেন। কেউ পান, কেউ হুঁকো, কেউ বিড়ি। তবে একটু আড়ালে। কীর্তনের আসর থেকে দূরে। একদম বয়স্ক গুরুজনদের দিকে ঘুরে বসে কেউ কিন্তু হুঁকোয় টান দিতেন না। আলগা হয়ে পিঠ দিয়ে বসতেন। ঐ ঘুরে বসাটুকুই সম্মান জানানো। না, সিগারেট টানতে ওদের মধ্যে ছোটবেলায় কাউকেই দেখিনি। সিগারেট অনেকটা অভিজাত, যেন বিদেশি। বিড়ি সাধারণের, দেশীয়। কিন্তু ইয়োরোপীয়রা এদেশে আসার আগে বিড়ি যে আবিষ্কৃত হয়নি তা তো সত্য। পর্তুগীজরাই নাকি এদেশে তামাক পাতার আমদানি করেছিলেন শোনা যায়। তবু বিড়ির চাইতে গঞ্জে গ্রামে হুঁকোই চলত বেশি। আট নয়ের দশকে বোধহয় হুঁকো অবলুপ্তির শেষ প্রহর। এরপর আর তাদের তেমন দেখতে পাইনি। মানে আমাদের দাদুদের জেনারেশন পর্যন্ত, তাও সবার নয়। 

           দৃশ্যটি মনে থেকে গেছে একটি কারণে। বৈষ্ণবদের কাউকে হুঁকো বা তামাক সেবন করতে দেখিনি। বড়জোর হরিতকি বা আমলকী। তবে কেউ কেউ সাদাপাতা ছাড়া পানও চিবোতেন। লুকিয়ে হুঁকোতে টান দিয়ে আবার কীর্তনের আসরে প্রবেশের বিষয়টি আসরের বড় কীর্তনীদের মান্যতা পায়নি ততদিনেও। সেজন্যই হয়ত কুলকুচি করার সংস্কার। তবে হুঁকোতে টান দিয়ে যারা ফের বসতেন আসরে তাদের কণ্ঠস্বর যেন বদলে যেত। আমি যেন তাদের গলার ভেতরেও শুনতে পেতাম হুঁকোর ভেতরে জলের সেই বুডুবুডুবুডু ধ্বনি। খরখর আওয়াজ। বিশেষ গানে যেন সেটা স্পষ্ট অনুভব করা যেত। সেই কুলকুচি করার দৃশ্যটি এখনও মনে পড়ে।

              এ তো গেল বাইরের ব্যাপার। অন্যদিকে ঘরের ভেতরকার দৃশ্য! সে কখনোই ভুলবার নয়। আমার দিদিমার এক সখী ছিলেন। প্রায়ই আসতেন। সুখ দুঃখের গল্প বলতেন। তাদের বসার জায়গাটি ছিল রান্নাঘরে চুলার পাড়ে। হয়তো তখন সব কাজ শেষ। সন্ধ্যা পেরিয়েছে মাত্র। রাতের রান্না বসেনি। কিছুক্ষণ বসে গল্পগুজব করে তিনি ফিরে যেতেন অন্ধকারে হারিকেন হাতে। তিনি এলে বিড়ির গন্ধ প্রায়ই পেতাম। কিন্তু বুঝতে পারতাম না তার উৎস। কখনও সন্দেহও জাগেনি। বিড়ির সঙ্গে ছোটোবেলায় পুরুষদের যোগ খুঁজে পেতে পেতে মনে হতো এ যেন পুরুষেরই নেশা। মেয়েদের বড়জোর পান বা দোক্তা। 

        তো সেদিন কীর্তনের রাত। রান্নাঘরে চা বানানো ছাড়া তেমন কাজ নেই। মূল রান্না চলছে বাইরে আলাদা করে। খেলতে খেলতে হঠাৎ এক ঝটকায় দরজা খুলে রান্নাঘরে ঢুকে দেখি বিড়িপোড়ার উগ্র গন্ধে ঘর ভরে গেছে। কুপি বাতিকে ঘিরে দুজন। চুলার পাড়ে দুই সখি। দিদিমার সেই বান্ধবী। হাতে ধরা বিড়ি। আমাকে দেখে তিনি আড়াল করলেন। কিন্তু আমি তো অবাক। বললাম, ‘দাঁড়াও সবাইকে বলে দিচ্ছি, বলে চিৎকার চেঁচামেচি। দিদিমা কিছু বলার আগে সেই বান্ধবী বললেন, চুপ চুপ, কী লজ্জার কথা। এসব কি বলতে আছে! এরকম করো না নাতি, তোমাকে কালকে একটা জিনিস খাওয়াবো। এবারকার মত ছাড় দাও লক্ষ্মীটি। ঘুষে মন গলল না, বললাম এ রাম বিড়ি খায়! এখন মনে এলে হাসি পায়। 

       জানি এখন তিনি আর নেই কোথাও। সেসময়েই তার অনেক বয়স। কিন্তু কালো মুখটি মনে পড়ে। ঘরের স্থির বাতাসে ভাসমান ধোঁয়ার কুণ্ডলীটির ছবি ভাসে। আর তার নিচে ফুরফুরে একজন বয়স্কা। যেন মুক্তির একটি প্রতিচ্ছবি। তাদের যন্ত্রণার, নৈরাশ্যের, বেদনার দমবন্ধকর কত নির্মম সুদীর্ঘ ইতিহাস। পরে আরো অনেক প্রাচীনাকেই দেখেছি লুকিয়ে বিড়ি ফুঁকতে। বিড়িই ফুঁকতেন, হুঁকো নয়। হুঁকোতে তো নীরবতা নেই। হুঁকোর আওয়াজ তো লুকিয়ে রাখা যায় না। নিঃশব্দে টানার জন্য বিড়িই ছিল দিনান্তের একমাত্র মুক্তিদূত। চুলার পাড়েই ছিল অবস্থান। আজকের আধুনিকাদের মতন তারা ঘর থেকে বেরুতে পারতেন না হয়তো। সংসারের মায়াজালে পিষ্ট হতেন। কার কাছেই বা মনের কথা বলবেন! বিয়ে হয়ে আর বাপের বাড়ি যাননি, এমন সংখ্যাও কম নয়। দিদিমার সেই সখীর বিষণ্ন মুখটি মনে পড়ে। কত কথা তিনি মনে চেপেছেন। গিলে ফেলেছেন। বিড়ির ঘ্রাণ তো নয়, এ যেন তার হৃদয়পোড়া ঘ্রাণ।



মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ