ঘরছাড়া ঘরে ফেরা

 

হারুকি মুরাকামির 'কাফকা অন দা শোর' উপন্যাসে একটি ছেলে পনেরো বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। দূর কোনো শহরে সে একা একা ঘুরে বেড়ায়। চার্লস ডিকেন্সের ডেভিড কপারফিল্ড উপন্যাসেও ডেভিড বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। শিবরাম চক্রবর্তীর কাহিনি অবলম্বনে ঋত্বিক ঘটক নির্মিত সিনেমার নাম 'বাড়ি থেকে পালিয়ে'। সেখানে একটি কিশোর বাড়ি থেকে পালায়।

            কিশোর বয়সে বাড়ি থেকে পালানোর একটা প্রবণতা থাকে। সবগুলি ক্ষেত্রেই ঘিরে থাকা পরিস্থিতি সম্পর্কে দ্রোহ কাজ করে। একটা বয়সে মনে হয় প্রত্যেকেরই ইচ্ছা থাকে বাড়ি থেকে পালানোর! সকল রকম স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে এই বোধহয় তার মনের প্রথম উসকানি। আনন্দ ও আকর্ষণের পাশাপাশি ভেতরের ভয়কেও যদিও উপেক্ষা করা যায় না। সেই ভয়টা কীসের কে জানে! যারা এই ভয়কে জয় করে তারা বোধহয় আর ফিরে আসে না। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভয় তাকে ফিরিয়ে আনে। অনিশ্চয়তা তাকে ফিরিয়ে আনে। 

           আমি সেই সব মহাজীবনের কথা ভাবছি না। চৈতন্য বা বুদ্ধের কথা ভাবছি না। ভাবছি সাধারণের কথা। এমনি কত কত লোক যায়, বহুদিন পর ফিরে আসে। যারা যায়, তাদের অনেক নতুন ইচ্ছা থাকে। অনেক স্বপ্ন থাকে। আবার যখন ফেরে, সেই ফেরায় ক্লান্তি থাকে। পদে পদে বহুজনের প্রশ্নে লজ্জা জমে। তখন ফিরে আসা মনে হয় অপমানকর! শ্রান্ত ফিরে আসার মধ্যে আছে একধরনের হার। যেন ব্যাপারটা এমনই– তুমি তো গিয়েছিলে এই জীবনটাকে পাত্তা না দিয়ে, তাচ্ছিল্য করে ভিন্ন কোন জীবনের সন্ধানে, সেই তো আবার ফিরে এলে! আমার মা একটা প্রবাদ প্রায় বলেন, 'এই ঘর এই দুয়ার, ফিরে ফিরে সেলাম কর'। ফিরে আসা হয়তো ঘরকেই গ্লোরিফাই করে, নিজের স্থানকেই করে। কিন্তু মানুষের এই চলে যাওয়ার ছবি খুব বেশি প্রাচীন তো নয়! আসলে ঘুরে ঘুরে বেড়ানো আর ফিরে আসা নির্দিষ্ট ঠিকানায়, দুটি দুই যুগপর্বকেই চিহ্নিত করে। কেউ যখন যায়, মনে হয় তার ভেতরে কোথাও শিকার করে খাদ্য সংগ্রহের সেই হাজার বছরের ঐতিহ্য ও অভ্যাস জড়িয়ে আছে। আবার কেউ যখন ফিরে আসে, তার ভেতরেও রয়েছে কৃষিসভ্যতার ইঙ্গিত। এটা তো ঠিক চাষবাসই আমাদের ঠিকানা দিয়েছে  রাজ্য, রাষ্ট্র দিয়েছে। স্থিতি এনে দিয়েছে। তবু কী যে এক বিপন্ন বিস্ময় তার অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে!


                আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত টুলু (পরিবর্তিত নাম)। আমার থেকে বয়সে বড়। নবম শ্রেণি। নায়ক নায়ক ভাব। শ্রীকান্ত যেমন ইন্দ্রনাথকে দেখে, আমারও তাই। ওই বয়সে তরতাজা মন নিয়ে ভালোবাসল রাস্তার উল্টোদিকে থাকা চোখ টানাটানা রূপসী অষ্টম শ্রেণিকে। অষ্টম শ্রেণি পড়াশোনাতেও ভালো। তবে টুলু টেনেটুনে। তবু মন তো মনই। কিছুদিন দেখাদেখি, ইশারা, ইঙ্গিত, রাস্তা দিয়ে সাইকেল নিয়ে হুশহাশ, অষ্টম শ্রেণিও দেখতাম দোতলার ছাদে প্রয়োজনহীন ঘুরে বেড়ায়। তারপর এল সরস্বতী পূজা। বাতাসে প্রেমের ঘ্রাণ। টুলু একহাতে বড়ই প্যাকেট, শন পাপড়ি ও অন্য হাতে একটা চিঠি আমার হাতে গছিয়ে বলল 'দিয়ে আয়, আমি এখানে আছি'। দিলাম। চিঠিতে কী লেখা ছিল জানি না। পড়া মাত্রই চিঠিশুদ্ধ বড়ইয়ের প্যাকেট আর শন পাপড়ি মাটিতে ছুঁড়ে মারল অষ্টম শ্রেণি। শব্দ শুধু নয়, দৃশ্যও ব্রহ্ম। দূর থেকে দেখলাম টুলু নেই। এরপর টুলু কেমন যেন হয়ে গেল। লুকিয়ে লুকিয়ে থাকে আমার সঙ্গেও দেখা করে না। আগের সেই উদ্যম যেন নেই। তারপরে আরো বছর খানেক। হঠাৎ একদিন শুনলাম সে বাড়ি থেকে চলে গেছে। কেউ তাকে আর খোঁজাখুঁজি করেও পাচ্ছে না। এর কারণ যে প্রেম, তা নাও হতে পারে। কিন্তু ওই দিনের পর সে যে হঠাৎ চুপ মেরে গিয়েছিল সেটা সত্যি। 


           কিছুদিন পরে শুনলাম টুলু বাড়ি থেকে চলে গেছে। কোথায় গেছে কেউ জানে না। তন্ন তন্ন অনেক খোঁজাখুঁজি হলো কিন্তু নেই। কিন্তু সময় তো আর থেমে থাকে না। কালের স্রোত কাকে যে কোথায় নিয়ে ফেলে! আমাদেরও স্কুলজীবন শেষের পথে। এর মধ্যে কত কিছু হল। অষ্টম শ্রেণি (যদিও তখন আর অষ্টম নয়) অন্যত্র পালিয়ে বিয়ে করল। পরিবর্তনের নানা পথে আমিও ভুলে গেলাম টুলুর কথা। জীবন চলছিল আরো আরো ঘটনায় জড়িয়ে। হঠাৎ একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে রাস্তায় দেখা টুলুর সঙ্গে। সে ফিরে এসেছে। স্বভাবতই উচ্ছ্বসিত দুজনই। জানা গেল গুজরাটের কোনো এক লবণ ফ্যাক্টরিতে ছিল কিছুদিন। ত্রিপুরা থেকে সুদূর গুজরাট! হিসাবটা কোনোমতেই মেলানো যাচ্ছিল না। তবে এখন সে অনেক পরিণত। বুঝে সুঝে কথা বলে। বাড়তি কথা তো নয়ই। কেন সে চলে গেল? কীভাবে গেল? এইসব প্রশ্নে তাকে জর্জরিত হতে দেখেছি বহুদিন। কেউ কিছু বললে চুপ করে থাকে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে লক্ষ করি তার ভেতর মাঝেমাঝেই আবার চলে যাওয়ার সুড়সুড়ি কাজ করে। সেদিন বুঝলাম যে যায়, সে বারবার যেতে চায়। ফিরে এলেও যেখানে সে ফিরেছে তারাও তাকে ঠিকমতো গ্রহণ করতে পারে না। সে নিজেও কি পারে! বহুদিন পরে এসে দেখি সে যেন ঠিকমতো সবার সঙ্গে মিশতে পারছিল না। খাপ খাওয়াতে পারছিল না। সব হচ্ছিল– আনন্দ ফুর্তি চঞ্চলতা, তবুও কোথায় যেন ফাঁক। একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। ফিরে এলেও কি আর ফেরা যায়! কেন ফেরা যায় না। ভেতরে ভেতরে প্রশ্নে প্রশ্নে সে কি অপমানিত হচ্ছিল! যে স্থান ছেড়ে চলে যাওয়া হয়, লোকে কি এর ভেতরে জয়-পরাজয়ের তুল্যমূল্য দিয়ে তাকে বিচার করে! জানি না। তবে সব সময় যে এমন হয়, তা হয়তো নয়। মামার বাড়িতে হঠাৎ বড় মামার সঙ্গে করে এলেন রঞ্জন নামে একজন লোক। এলেন যে, থেকে গেলেন বহুদিন। বাড়ি থেকে নাকি রাগ করে এসেছেন। থেকে গেলেন দু-তিন বছর। পরে হঠাৎ একদিন তার বাড়ির মানুষেরা খুঁজে খুঁজে এলেন মামার বাড়ি। তাকে বুঝিয়ে সুুঝিয়ে আদর করে নিয়ে নিয়ে গেলেন তারা। 


            ভাবি, একজন মানুষ কেন ঘর ছেড়ে চলে যেতে চায়! একটা বয়সে কেন এই বোধ হয়! আমারই বা কেন হয়েছিল! সেসময় কলেজে পড়ি, হঠাৎ গৌতম বুদ্ধের প্রতি তীব্র আসক্তি অনুভব করতে থাকি। কিছুই আর ভালো লাগে না। কেবল মনে হয় বন্ধন। আমি যেন কী চাই নিজেও বুঝি না। এর আগে ত্রিপুরার অরণ্যে পাহাড়ে তেমন ঘুরে বেড়াইনি। বুদ্ধের জীবনী পড়েছি জেন জানার চেষ্টা করছি। অদ্ভুতভাবে একটা ভাবনা কাজ করছে ভেতরে ভেতরে। কেবলই মনে হয়, রিয়োকানের মতন নির্জন কোনো পাহাড়ের চূড়ায় যদি যাওয়া যেত। অথবা কোনো অরণ্যে গুম হয়ে যাওয়া যেত। গেলাম পেঁচারথল। সেখানে রয়েছে কয়েকটি বৌদ্ধ মঠ। সবগুলি ঘুরলাম। নদীর পেরিয়ে প্রায় জঙ্গলের ভেতরে রয়েছে নীরব এক স্থান। সেখানে অনেক বৌদ্ধ অনুগামীরা আসেন। ধ্যান করেন সারাদিন। কেউ কেউ সাত দিন, চৌদ্দ দিন, যার যেমন ইচ্ছা। কেবলই মনে হয় কোথাও বসি। কুলকুল করে বয়ে যায় দেও নদী। কেউ কোনো কথা বলে না। নীরব। কত ধরনের যে পাখি ডাকে। কত রঙের প্রজাপতি। বিশাল একটা গাছ মরে পড়ে আছে। চুপ করে বসি তার উপর। দূর থেকে দেখলে যেন স্পষ্ট হয়। টুলু মারা গেছে। সেই মেয়েটিকেও একদিন দেখেছি সন্তানাদিসহ শহরে বেরিয়েছে পুজো দেখতে। মনে হয়, কোনও জীবনই তুচ্ছ নয়। এই গাছটিরও সার্থকতা আছে। তার একটা জীবন ছিল। এখন মৃত্যুর পরেও তার একটা জীবন আছে। সে এখনো আশ্রয়। হাজার হাজার কীট যেমন তার ভেতরে বাসা বেঁধেছে, তেমনি নানা গাছ-লতা। পাখিরাও এসে বসে। আমিও যেমন আজ এসে বসেছি। সেদিন মনে হল, মানুষ যেখানেই যাক, আসলে তার হৃদয়ের কোলাহলকে শান্ত করতেই যায়। নিজেকেই খোঁজে।


         সুতরাং হয়তো দূর থেকে দেখতে হয়। কাছ থেকে যা মণ্ড বলে মনে হয়, দূর থেকে দেখলে সম্পূর্ণ পরিসরটি দেখা যায়। তাই হয়তো ঘরছাড়া। তাই হয়তো অন্য কোনোখানে। কিন্তু যারা ফিরে আসে! ফেরার একটা বেদনা আছে। একটা অস্বস্তি আছে। কেউ কেউ তার থেকে মুক্তি পায় না আজীবন। বারবার ঘুরে ঘুরে তার হৃদয় একঘেয়ে এককথা বলে। এসব মানুষদের দেখেছি, আলগা হয়ে যেন থাকেন সংসারের উপরে। সদা ভাসমান। মন বসে না কোনো কাজে। সামান্য সমস্যাকে যেন পাহাড়প্রমাণ লাগে। সব সময় ছাড়াছাড়া ভাব। বিষয়ী নন তারা। বাবাকে দেখেছি কিছুদিন পর পর চলে যেতে। ব্যাপারটা মায়ের পক্ষে অস্বস্তিকর। কিন্তু কখনো এ নিয়ে খুব বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হতে তাকে দেখিনি। তিনি ঠিক সামলাতেন। 


                প্রয়োজনে তো সবাই যায়। খাদ্যের সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গেছে কত মানুষ। এক জঙ্গল থেকে আরেক জঙ্গলে দলবেঁধে ঘুরেছে কত! কিন্তু প্রথম কবে সেই একলা মানুষটি তার প্রয়োজনের বাইরে একা কোথাও চলে গেল! এখানে বসে বসে ভাবি, হাজার হাজার বছর আগের সেই লোকটির কথা। সে হয়তো ঘুরতে ঘুরতে এমনই কোন গাছের তলায় একা বসে রইল। হয়তো এখনকারই মত সন্ধ্যা নেমে এসেছে। লোকটি আকাশের তারার দিকে তাকিয়ে কী ভাবল। তার মাথায় কি তখন নতুন নতুন ভাবনা এসে গেছে। সে হয়তো ভাবতে পারছে। অবসাদ, বিষণ্নতা, উদাসীনতা অনুভব করতে পারছে। একঘেয়ে জীবনকে তার বিরক্তির লাগছে। খাদ্য, আশ্রয় এবং মৈথুনের বাইরেও নানা চিন্তা তাকে স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। সে তাকাচ্ছে চারদিকে বোকার মত। তার পরিবারের সবাই হয়তো দূরে কোনো গুহায় অথবা জঙ্গলের গোপন আস্তানায় তার জন্যই প্রতীক্ষারত। অথচ তার হারিয়ে যেতে মন চাইছে। যদি সে ফিরে যায়,  তা কি তার গোষ্ঠীর সবার জন্য আনন্দের হবে, নাকি তার জন্য ক্লান্তির! ধীর নেমে আসে সন্ধ্যা। বাড়ির পথে হাঁটা দিই। একটা ভয় কাজ করে। একা থাকার ভয়। বুঝি, সন্ন্যাসীকেও নগরে নামতে হয়। ঘরছাড়াকেও কোনো না কোনো ঘরে ফিরতেই হয়।





মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চরিত্র 

বেগুনি রঙের ফুল

কিরণ ও রবীন্দ্রনাথ