ছোট্ট চালাঘর
ভয় একটা বিশুদ্ধ অনুভব। তার কোনো পরিসীমা নেই। ভয় নানাভাবে জন্মাতে পারে।
ছোটোবেলায় যেমন মা বাবার কাছে ভুল করে ভয়, বড় বেলায় কাউকে সমীহ করে ভয়। সবই কৃতকর্ম বা কার্যকলাপ নির্ভর। যেমন যাকে সমীহ করা গেল, তার কাছে হয়তো থাকে কিছু প্রাপ্তির আশা। মা-বাবার কাছে শাস্তি বা স্নেহবঞ্চিত হবার তাড়না। এসবের বাইরে আরও এক ধরনের ভয় রয়েছে, সে বড়ো অপ্রাসঙ্গিক, তবে হঠাৎ উদয় হলে তাকে অস্বীকার করা যায় না।
প্রথম তাকে অনুভব করেছি সেই শৈশবে। কোনো কারণ ছাড়াই। আমার মাতামহরা তিন ভাই। সবচেয়ে বড় জনের সন্তানাদি নাই। দাদু-দিদিমা দুজনের সংসার। বাকি দুই দাদুর বাড়ি থেকে একটু দূরে আলাদা একটি টিলায় তাদের বাস। বাড়িটি ছিল দেখার মত। সবই মাটির ঘর। চালায় ছন। টিলা বেয়ে উঠেই প্রথমে বাঁদিকে দেবালয়। সামনে গুলঞ্চ ফুলের বিশাল গাছ। কিছু কিছু ডাল এঁকেবেঁকে মাটির দিকি ঝুঁকে আবার উপরে উঠে গেছে। অপূর্ব গাছটির সারা দেহে নাচের বিভিন্ন মুদ্রা, বিভঙ্গ যেন ছড়িয়ে। চারদিকেই গাছ আর গাছ। সবুজ আর সবুজ। আম জাম কাঁঠাল লুকলুকি লিচু বড়ই ছাতিম তাল মাধবীলতা সুপুরি কলা কী নেই!
একটু এগিয়ে ডানদিকে এরণ্ড গাছের গেটহীন বেড়া পেরিয়ে বাড়ির মূল উঠানে প্রবেশ করতেই প্রথমে বাঁদিকে দাদুর ঔষধালয়। সোজা গিয়ে ডানদিকে উঠোনের আরেক পাশে থাকার ঘর, রান্নাঘর ইত্যাদি। একেবারে আশ্রমিক পরিবেশ। হোমিওপ্যাথ, এলোপ্যাথ, আয়ুর্বেদ, বনাজি সবই তিনি প্র্যাকটিস করতেন। সে সময় আটের দশকে সমস্ত অঞ্চলটিতে তিনিই ছিলেন ভরসা। এক একদিন সন্তর্পণে ঘরে গিয়ে দেখেছি সারি সারি সাজানো তাকের উপর থেকে নীচ পর্যন্ত ছোটো বড় জারে কত কি তরল পদার্থ, মিকশ্চার। অদ্ভুত এক ধরনের গন্ধ ঘরটিকে আরও রহস্যময় করে তুলত।
নীরব বাড়িটি। ঝিম ধরা। আশেপাশেও কোনো আওয়াজ নেই। প্রায়ই মনে হতো এখানে শব্দ ঢুকে আর বেরোতে পারে না। চিৎকার দিয়ে দেখেছি, যেন শোনা যায় কম। শব্দগ্রাসী এই টিলা। দাদু বাইরে থাকলে তো আরো।
দিদিমা পড়তেন লালপাড় শাড়ি। কপালে বড় লাল সিঁদুরের ফোঁটা। কথা বলতেন কম। সাদা মাটি দিয়ে লেপা ঝকঝকে উঠোনে যখন তিনি একা কাজ করতেন, এদিক থেকে ওদিকে যেতেন, দূর থেকে তাকে আরো রহস্যপূর্ণ মনে হতো। ভয় লাগত। এই ভয়, কেন জানি না। দিদিমা তো কখনও অনাদর করেননি। কিন্তু ঐ নির্জন উঠোনে সিঁদুর এবং লাল পাড় সাদা শাড়ির ভেতর এক ধরনের নীরবতা আছে যেন। মনে হতো অজস্র কথা বলেও ঐ নীরবতার আড় ভাঙা সম্ভব নয়। লাল পাড় সাদা শাড়ি আর বড় সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে অঙ্কিত সজ্জার ভেতর হু হু করা এই যে একাকীত্ব, ধবধবে সাদা মাটি দিয়ে লেপা পরিচ্ছন্ন উঠোনের ভেতর যে শূন্যতা, একে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়! কোথাও কোনো ক্যালেন্ডারে দেখা সাধক রামপ্রসাদ সেনের একটা ছবির প্রতিভাস মনে ভসে ওঠে। সেই ছবিটিতে রামপ্রসাদ ভাবে বিভোর বাঁশের বেড়া বানাচ্ছেন, তাকে বেড়া বাঁধার বেত উল্টোদিক থেকে ফিরিয়ে দিচ্ছেন শ্যামা কালী। হাসি হাসি মুখ। দাঁতে জিভ কেটেছেন। তার পরনে লাল পাড় পাড় সাদা শাড়ি। বাংলার প্রাচীন ছবি। দিদিমার গায়ের রঙ শ্যামলা। অকারণে মা কালীর একটা আভাষ মনে জেগে ওঠে। কেবল মনে হয় কখন যেন জিভ বের করবেন আর দাঁত দিয়ে কেটে আমার দিকে তাকাবেন। ভাবতে ভাবতেই শীতল স্রোত বয়ে যায় শিরদাঁড়ায়। ভয়। কীসের ভয়! জানি না। রোমাঞ্চ লাগে। আজ যখন মনে পড়ে, মুখটা ভাবার চেষ্টা করি। মনে হয়, সে মুখ প্রাচীন বাংলার। সহজ লাগে। অথচ সে সময় মনে হতো, যেকোন সময় মা কালী হয়ে হাসতে হাসতে চলে যাবেন ঘরের আড়ালে। দেবতা যে ভয়েরও, সেদিন বুঝেছিলাম। পরে বুঝেছিলাম, মা কালী কেন বাঙালির ঘরের মেয়ে।
দেবালয় পেরিয়ে বাড়িতে না ঢুকে খানিকটায এগোলে ছিল পরিবারের শিবের থান। সেখানে একটি ছোট্ট দেওয়ালহীন চার চালা ঘর, ঘরটি এত ছোটো যে একজন মানুষ দাঁড়ালে তার চাইতেও খাটো। পুজো বলতে বাড়িতে অনুষ্ঠান হলে ভোগ সাজিয়ে দেওয়া আর প্রদীপ জ্বালানো। তা সে নবান্ন হোক বা কীর্তন, লক্ষ্মী পূজা হোক বা অন্নপ্রাশন। ভোগ দেবার কিছু পরে নিষেধ সত্ত্বেও লুকিয়ে লুকিয়ে গেলে নিশ্চিত দেখা যেত কুকুর বা কাক। কুকুর নাকি ভৈরবের বাহন। আর কাক! খুব কাছের এই পাখিটির দিকে তাকানো হয়নি কোনোদিন। তার চোখ দেখি। টলটলে। শান্ত। মনে হয় তার বেদনার কথা কে আর জানে! কাউকে সে বলে যেতে পারল না। মানুষ মরলে পরে নাকি কাক হয়ে যায়। কাক তবে আমাদের পূর্বপুরুষ! নাকি মৃত্যুর পরের এলাকা তার। রোমাঞ্চ লাগে। পেছনে একটি বটগাছ এবং দুদিকে শ্যাওরা গাছ। কেন জানি না ওইখানে গেলেই শরীর ভার হয়ে আসতো। একটা অচেনা ভয়, মনে হতো ওই ছোট আবাসটিতে কেউ সত্যিই বসে আছেন। নির্জন দুপুরবেলা একা একা সেখানে গেলেই এসব ভেবে ভেবে রোম খাড়া হয়ে উঠত। হঠাৎ কথা বলা যেত না। মনে আছে দুপুর হোক বা বিকেল সবসময়ই ঝিঝি ডাকা নীরবতায় হঠাৎ বাতাসে পাতা পড়লে চমক লাগত। সামনে টিলা নেমে গেছে ক্ষেতের দিকে। ক্ষেত বলতে ধুধু করা হাওর। তিনি যেন এখানে বসে সমস্ত অঞ্চলটির দিকে তাকিয়ে আছেন। অথচ কোনোদিন কিছু দেখিনি। শিব তো দূরে থাক তার জটার আভাষও নয়।
ঠাকুরমা মারা গেলেন। বাবা বাড়িতে নেই। আমি আর মা। হাঁটা দিয়েছি। ঠাকুরমার ওখানে যাব। রাত কত আর, সাড়ে দশ কি এগারো। কোনো কোনো দিন এমন হয়, আবহাওয়াই কেমন যেন থাকে! সেসব দিনে মানুষের আলস্য পায়। তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে মন চায়। কয়েকদিন লাগাতর বৃষ্টি শেষে দুদিন ধরে ফুরফুরে বাতাসও বাউণ্ডুলে লোকের মত শহরের এদিক ওদিক ঘুরছে।
ভাবি, বেশিদিন নয় কুড়ি একুশ বছর আগেই এত লোক ছিল না শহরে। মাল বহনের জন্য ঠেলা আর জন পরিবহন মানে মূলত রিকশা। ই রিকশা নয়, অটোও ছিল মহার্ঘ্য। কিন্তু কিছুই নেই। ধর্মনগরের সেদিনকার ছবিটি এখনও আমি কল্পনা করতে পারি। দৈত্যাকার বসত বা দোকানও ছিল না এত। হাতে গোনা সব। পথের পাশে মাঝেমাঝেই ঝোপঝাড়। কোথাও কচুবন, কোথাও ভাটফুল, পিচণ্ডি, লুটকি, ছন জাতীয় গাছ। আজকের সি এফ এল বা এল ই ডি-র সাদা ঝকঝকে আলো নয়, পথের মোড়ে মোড়ে হলুদ এক ধরনের লাইটের আলো। এর তলায় এলে চেনা মানুষকে অচেনা মনে হয়। রহস্যময় ঠেকে। বাড়িতেও টিউব লাইট বাদ দিলে বাল্ব বলতে সেই প্রাচীন ম্রিয়মাণ হলুদাভ বাল্ব।
যাই হোক, পথে নেমে দেখি সব শুনশান। মানুষ দূরে থাক একটা কুকুরও নেই কোথাও! আশ্চর্য! সব এক লহমায় গায়েব হয়ে গেল নাকি! ভাবলাম, সামনের তেমাথায় এলে পাওয়া যাবে রিকশা। অনেকটা সময় গেছে বেরোতে বেরোতেই। যেভাবেই হোক তাড়াতাড়ি পৌঁছা দরকার। মায়ে-পুতে জোর হাঁটা দিলাম। কিন্তু কোথায় কি কিছুই নেই বাজারে ঢুকতে মনে হল সমস্ত বাজারটি তার হুহু করা শূন্যতা নিয়ে যেন ঝাঁপিয়ে পড়লো আমাদের উপর। দুদিকেই একতলা দোতলা দোকান। সব বন্ধ। ঠক ঠক করে আওয়াজ উঠতে লাগল। নিজেদেরই পায়ের শব্দ। চলার শব্দ। বড় বিদঘুটে রহস্যময় মনে হতে লাগল। নিজের শ্বাসের শব্দও কানে ঠেকছে। যত পা ফেলি তত ভয় বাড়তে লাগল। ঘরগুলো আমাদের সঙ্গে সঙ্গে যেন আমাদের পেছনে ধাওয়া করছে। আনমনে মায়ের হাত শক্ত করে ধরলাম। সমস্ত গলিটি যেন অনেক লম্বা হয়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতেও ফুরোতে চাইছে না। জোরে, প্রায় দৌড়ে পেরোচ্ছিলাম। কারণহীন ভয়। একটা অনিশ্চয়তার আবহ। জানি না কেন!
ভয় একটা পবিত্র অনুভব। তার কোন পরিসীমা নেই। তার কোন নির্দিষ্ট উৎস নেই। হাঁপাতে হাঁপাতে গলির বাইরে এসে দাঁড়াই। মাথার উপর কালো আকাশ চিরে ফুটেছে ছোট ছোট তারা। বাজার পেরিয়ে সামনে দীর্ঘপথ। পেছনে তাকাই। কিছু নেই। হলুদ আলো পড়ে আছে সমস্ত পথ জুড়ে। বুঝতে পারি, সব এই বুকের বাঁদিকে, ছোট্ট চালাঘরে। হাত রাখি সেখানে। এখানেই তার আবাস। এখানেই ছোট্ট চালাঘরে একাকী আদিদেবের মত তিনি থাকেন। তাকে জয় করা যায়, তার হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন