চরিত্র
লোকটি অনেকক্ষণ ধরে বসে আছে। নড়ার লক্ষণ নেই। কয়েকবারই বলেছেন দিলীপবাবু, 'আপনি এখন যান, আমার সময় হবে না। কাল সকালে দশটার পরে আসুন।' কিন্তু লোকটার ওঠার নাম নেই। আপাতত তাই কোনো কথা বলতে চাইছেন না তিনি।
লোকটার চেহারা দিলীপবাবুর কাছে পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে যে চেয়ারটায় তিনি বসেছেন, সেটি দেওয়ালে লাগানো বাল্বের ঠিক নিচে। বাল্বটি লোকটার পেছন দিকে। তাই আরো ঘন ছায়া পড়েছে লোকটির মুখে। দিলীপবাবু চুপ করে রইলেন। বিরক্তও লাগছিল খুব।
শুভ এখনও আসেনি। রাত কত হল কে জানে! দেওয়াল ঘড়িটা নষ্ট, বহুদিন হল। উঠে পাশের ঘরে গিয়ে যে ঘড়ি দেখবেন সেটারও উপায় নেই। ঘড়ি দেখতে হলে বাতি জ্বালতে হবে। হয়তো সুনয়না ঘুমায়নি, ছেলে না ফেরা পর্যন্ত ঘুমাবে না। তবু বাতি জ্বাললেই সে উঠে বসবে। এমনিতেই তার নাকি ঘুম কম হয়। প্রতিদিন এই কথা শুনতে শুনতে কান পচে গেছে। ঐ একবার যদি আলোর জ্বালবার জন্য ঘুম ভেঙে যায়, বা উঠে বসে, কথা শুনতে হবে কাল ভোর পেরিয়ে বিকাল পর্যন্ত। যত বয়স বেড়েছে, ততই আরো খিটখিটে হয়ে গেছে সে। কেমন যেন মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত। তবে পাশের ঘরে সজাগ বৌমা। কিন্তু বারবার বৌমাকে ডেকে ডেকে সময় জিজ্ঞেস করাটাও বাজে দেখায়। বৌমা অবশ্য বলেছে, 'আপনি ঘুমান বাবা, ও কিছুক্ষণ আগেই টেক্সট করেছে, আসছে।' তবু ঘুমানো কী যায়!
যদিও এটা প্রতিদিনকার রুটিন। সারাদিন অফিস শেষ করে সন্ধ্যায় চলে আসে শুভ। এরপর বের হয় আড্ডায়। এগারোটার আগে ঘর নেয় না। এসে হাত পা ধুয়েই চটপট ভাত খেয়ে নেবে। তারপর গান শোনা। অদ্ভুত এক অভ্যাস। এসব দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে দিলীপবাবুরও যেন অভ্যাস হয়ে গেছে তা। শুভ আসবে, খাবে, গান চালাবে। যত হাবিজাবি সব গান। ইংলিশ, স্প্যানিশ, রাশিয়ান, এসব শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি।
দিলীপবাবু নীরবতাভঙ্গ করে ফের বললেন, 'আপনার নাম কী যেন বললেন? অমিয়? আচ্ছা, আপনাকে কোথায় দেখেছি বলুন তো? আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারছি না।'
অমিয় নামধারী লোকটি উঠে দাঁড়ালেন। হাঁটতে হাঁটতে তার বইয়ের তাকের সামনে গেলেন। সাজানো গোছানো সব বই। দিলীপবাবু একজন লেখক। মানে আগে লিখতেন। এখন আর লেখেন না। এসব বই সে সময়ের। তার বহু শখের। দেশি বিদেশি কত কত রাইটারের লেখা। এক সময় বইমেলা এলে প্রতিবার কষ্ট করে চলে যেতেন আগরতলা, কলকাতা। তারপর কয়েকদিন বাছাই, কেনা। সারা বছরের জন্য বই সংগ্রহ। অমিয়বাবু আলমিরা থেকে একটি বই হাতে নিলেন। দিলীপ বাবু দূর থেকে দেখে বললেন, 'ও এটি? এটা একজন গিফ্ট করেছেন, উমাবার্তো একো। আমার প্রিয়।' অমিয়বাবু কিছু বললেন না। বইটি হাতে নিয়ে পৃষ্ঠা উলটাতে লাগলেন। বইটি দেখিয়ে বললেন, 'কত চরিত্র আছে এই বইয়ে, তাই না?'
'হুম।' দিলীপবাবু মাথা নাড়ালেন।
'কিন্তু সব চরিত্র কি চরিত্র হয়ে উঠে দিলীপবাবু? যারা বইবন্দি হলেন, তাদের কত সৌভাগ্য। যারা হলেন না, হতে পারলেন না, তাদের কথা কেউ ভাবেন না।'
দিলীপবাবুর মুখে কোনো কথা এল না। লোকটিকে কেমন রহস্যময় ঠেকছে। ফের শুভর কথা মনে এল। ছেলেটি এখনো আসছে না। তিনি উশখুশ করতে লাগলেন। বৌমা কি ঘুমিয়ে গেছে। তিনি গলা খাকারি দিলেন। কোনো শব্দ নেই। আবার ডাকবেন! অমিয়বাবু বললেন, 'আমাকে আপনি একটুও চিনতে পারছেন না দিলীপবাবু?'
'না। আপনার বাড়ি কোথায় বলুন তো? কী করেন?'
অমিয়বাবু হাঁটতে হাঁটতে এসে সেই চেয়ারেই আবার বসলেন। 'দিলীপবাবু, শেষ কবে আপনি লিখেছেন, বলতে পারেন?'
'লেখা?' হ্যাঁ তাইতো ঠিক মনে করতে পারছিলেন না দিলীপবাবু কবে তার শেষ লেখাটি লিখেছিলেন। একদিন লিখতেন খুব। সেই কৈশোরে স্বপ্ন ছিল অনেক। যৌবনেও। ধীরে ধীরে কোথা থেকে যে কি হয়ে গেল।
সরকারি অফিসে বড়বাবু ছিলেন তিনি। পি ডব্লিউ ডি-তে। শুধু চাকুরি নয়, শেয়ার মার্কেটে ছিল তার অগাধ শখ। লাভও হয়েছে বেশ। সঙ্গে সুনয়নাকে বিয়ে, শুভর জন্ম, বাড়ি ঘর বানানো, সব করেছেন। সুন্দরভাবে, সুচারুভাবে। শহরের ঠিক মাঝখানে পাঁচতলা উঁচু বাড়ি। ধবধবে। দূর থেকে দেখা যায়। লোকে যেতে যেতে তাকায়। ভেতরে সুন্দর রঙ। সাজানো গোছানো। যেন হোটেল। দামী পেইন্টিং। সব করেছেন যত্ন করে। কিছুটা বেশিই করেছেন। মোট কথায় বিষয়ীই তিনি। কিন্তু একদিন স্বপ্ন ছিল লেখক হবার।
একটা জিনিস লক্ষ করেছেন দিলীপবাবু, যখন লেখক হবার স্বপ্ন দেখতেন, তখন ছিল তার ফুটো পকেট। মনে আছে বাবার নুন আনতে পান্তা ফুরাত। সে সময় পড়াশোনার ফাঁকে লেখাই ছিল তার নেশা। বন্ধুরা মিলে কাগজ করতেন। বই প্রকাশ করতেন। লেখক হবার স্বপ্নকে ঘিরেই ছিল যাবতীয় উদ্যম। এক সময় চাকুরী পেয়েছেন তিনি। বন্ধুরা কাগজ করলেও ধীরে ধীরে সরে আসেন। এই কাজটি যে কীভাবে হয়েছিল, এখন আর মনেও করতে পারছেন না দিলীপবাবু। তবে বেশ মনে আছে ম্যাগাজিন করতে গেলে বেশিরভাগ অর্থ তার দিতে হতো। এক দু'বার দেবার পরেই ভেতরে ভেতরে দিলীপবাবু পিছিয়ে আসতে থাকেন। কেবলই মনে হতে থাকে এ যেন অর্থের ক্ষতি, তার লোকসান। বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। একদিন মনে হল এর থেকে অব্যাহতি পেতে হবে। সুতরাং সিনক্রিয়েট করে বেরিয়ে আসা।
রক্তিম সেদিন খুব হম্বিতম্বি করছিল। দিলীপবাবু প্রশ্ন তুলেছিলেন,
'ম্যাগাজিনটা কি শুধু আমার? আমিই কেন দেব?'
কথাটা হয়তো ভুল বলেছিলেন তিনি। অর্থ অনেকেই দিতেন। কেউ কম কেউ বেশি। কেউ হয়তো ম্যাগাজিন বিক্রি করত। কেউ হয়তো দেখে দিত প্রুফ। কেউ ম্যাগাজিনের জন্য বিজ্ঞাপন সংগ্রহ। আসলে বন্ধুদের থেকে দূরে সরতে চাইছিলেন তিনি।
তখন মনে হতো এখন থেকে শুধু লিখবেন আর প্রকাশ করবেন। ম্যাগাজিনের সঙ্গে যোগাযোগ দরকার নেই। কত বড় বড় কাগজ রয়েছে, পত্রিকা রয়েছে। তবে লেখা বন্ধ করবেন না। প্রথম কিছুদিন লিখছিলেন বেশ। গল্পই লিখতেন। জীবনটা যেন মুক্তির স্বাদ পেয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে আসতে লাগলো অবসাদ। ভাল লাগত না। আলস্য লাগত খুব। অফিস থেকে ফিরে ঘুমিয়ে থাকতেন। কৈশোরে চাকরি পাওয়ার আগে যত বই কিনেছিলেন, চাকুরী পাবার পর কমে আসে তা। প্রথমে মনে হত এখন থেকে প্রচুর বই কিনবেন, প্রচুর পড়াশোনা করবেন। কিন্তু আস্তে আস্তে সেটাও কমতে থাকে। মনে হতো বাজে খরচ।
অমিয়বাবু বললেন, 'আমার প্রশ্নের উত্তর দিলেন না?' কিছুক্ষণ ইতস্তত করে দিলীপবাবু মাথা নাড়ালেন, 'না, মনে নেই।' এরপর আবার জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনার পরিচয়টা তো বললেন না।'
অমিয়বাবু বললেন, 'আমি আপনার লেখা একটি চরিত্র।'
'আমার লেখা চরিত্র?' দিলীপবাবু হতভম্ব হয়ে গেলেন।
'ধুর, এমন হয় নাকি? চরিত্ররা তো গল্পের ভিতরে থাকে। তারা কি আবার জীবিত হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে নাকি?'
অমিয়বাবু কিছু বললেন না। মৃদু হাসলেন।
দিলীপবাবু চিৎকার করে উঠলেন। 'নিশ্চয়ই আপনি চোর টোর হবেন। নইলে এত রাত্রে এখানে আমার ঘরে প্রবেশ করলেন কীভাবে?' একশ্বাসে কথাগুলো বলে দিলীপবাবু, 'বৌমা চোর চোর' বলে চিৎকার করে উঠতে লাগলেন। অথচ তার গলা থেকে 'গোঁ গোঁ' ধ্বনি ছাড়া আর কিছুই বেরোলো না। দিলীপবাবু নিজের এই আচরণে ভয়ঙ্কর রকমে আশ্চর্য হয়ে উঠলেন।
'আপনি কি তন্ত্র মন্ত্র জানেন, আমার ঘরের জিনিসপত্র লুঠ করতে এসেছেন?'
অমিয়বাবু ধমকের সুরে বললেন, 'দেখুন, আমি বুঝতে পারছি, আপনি পুরোপুরি একটি বিষয়ী মানুষ হয়ে উঠেছেন। কিন্তু আপনার কাছে না আসা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না।'
'মানে? কী বলতে চাইছেন আপনি? কীভাবে আমাকে ত্যাগ করতে পারবেন? আমি কী করতে পারি?' লাগাতর চারটি প্রশ্ন করে দিলীপবাবু যেন শ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারছিলেন না।
এরপর ঘরে আর কোন কথা নেই। অনেকক্ষণ চুপচাপ। গভীর নীরবতা সবদিকে। হঠাৎ মনে পড়ল ছেলেটার কথা। ও কি ফিরেছে? সব যেমন তালগোল পাকিয়ে গেছে।
'কেন এসেছেন আপনি?'
'এই তো কথার মত কথা।' অমিয়বাবু ফের উঠে দাঁড়ালেন, তারপর ঘরময় পায়চারি করতে করতে বললেন, 'আমি আপনার লেখা একটি চরিত্র দিলীপবাবু। আমাকে আপনিই ডেকেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ভাবে আপনি গল্পটি সমাপ্ত করেননি। বহুদিন আমি অসমাপ্তভাবে আপনার ডায়েরির পাতায় আটকে ছিলাম। যদি আমাকে কোন প্রয়োজনেই না লাগে, তবে কেন সৃষ্টি করলেন? এখন আমি কি করতে পারি? কোথায় যাব? জীবনের কোন উত্তরই আমি খুঁজে পাচ্ছি না। কেন আপনি আমাকে সৃষ্টি করলেন? লেখক হিসেবে আপনি কি এমন করতে পারেন? কোনো নৈতিকতা নেই?'
ঠিক কবে লিখেছিলেন অমিয়বাবুকে নিয়ে এখন আর মনে পড়ছে না দিলীপবাবুর। তার মনে হল জীবন কিছুই ছাড়ে না, সবকিছুই ফিরে ফিরে আসে। দিলীপবাবু হঠাৎ কোনো কথা খুঁজে পেলেন না। আমতা আমতা করে বললেন, 'এ কীভাবে হয়? আমি তো লেখা ছেড়ে দিয়েছি, সেই কবে?'
অমিয়বাবুর গলা শোনা গেল দৃঢ়।
'এ কথা বললে তো হবে না দিলীপবাবু, আপনি আপনার জীবন পুরোপুরি গুছিয়ে নিলেন, আর আমাদেরকে অসমাপ্ত রেখে দিলেন!'
'মানে? আমাদের? কী বলছেন আপনি?'
'হ্যাঁ আমাদের, মানে আমার মত অসমাপ্ত যেসব চরিত্রকে আপনি সৃষ্টি করলেন, যাদের কারো পরিবার নেই, কারো জন্য ঘর দিলেন না, কাউকে বাসস্টপে দাঁড় করিয়ে রাখলেন, কেউ শ্মশানে।'
মনে পড়ে একটা সময় ছিল যখন প্রচণ্ড অস্থিরতায় ভুগছিলেন তিনি। লেখা শুরু তো করতেন, কিন্তু শেষ করতে পারতেন না। অসহ্য লাগত। অথচ তখন বিভিন্ন কাগজে গল্প লিখে দেবার অনুরোধ আসত প্রায়ই। লিখতে পারতেন না। কোন কাহিনি বা চরিত্র মনের মধ্যে এলেও গোছাতে পারতেন না। লেখা শুরুর কিছুক্ষণ পরেই মুড অফ হয়ে যেত। লেখার উদ্দেশ্য পেতেন না। মনে হতো সময় নষ্ট। বন্ধুদের সঙ্গেও ছিল দূরত্ব। এত বছর পর হঠাৎ করে সেই সময়ের কোন চরিত্র লেখা থেকে উঠে সোজাসুজি তারে ড্রয়িং রুমে এসে যে প্রশ্ন করবে, ঘুণাক্ষরেও তিনি কল্পনা করেননি। অমিয়বাবু নিষ্ঠুর একটা হাসি হেসে বললেন,
'মনে আছে আমার গল্পে আপনি কি লিখেছিলেন? আমার একমাত্র ছেলেকে আপনি পাঠালেন বাইরে। আমি ঘরে অপেক্ষমান। বাইরে দাঙ্গা। বোমা পড়ছে। গাড়ি, টায়ার পুড়ছে। ঘরবাড়িতে আগুন। সমস্ত পথে কাচের বোতল ভাঙা। আমি ঘরে আটকা। এরপর আপনি আর লিখলেন না। আপনি না লেখায় আমার ছেলেটা আর ঘরে ফিরে এলো না। আপনার তত দিনে লেখার চাইতেও আরো জরুরি কাজ মনে পড়ে গেল। বহুদিন অপেক্ষা করেছি আমি, অথচ আপনি আমার কথা আর ভাবলেন না। আপনি পারলেন কীভাবে দিলীপবাবু? একজন পিতার দুঃখ, পিতার অস্থিরতা আপনার মনে দাগ কাটলো না। ছেলেটিকে দাঙ্গায় ফেলে রেখে, আমাকে ঘরে বন্দি রেখে, আপনি লেখাটি বাদ দিলেন কীভাবে?'
হঠাৎ দিলীপবাবু কোনো কথা খুঁজে পেলেন না। মনে হল শুভ কি ফিরেছে!
'না শুভ এখনো ফেরেনি।' অমিয়বাবুর ভারী গলা। আঁতকে উঠলেন দিলীপবাবু।
'কি আবোল তাবোল বকছেন আপনি?'
'আবোল তাবোল? এইভাবে বলার কোনো অধিকার আপনার নেই?'
দিলীপবাবু হেসে উঠলেন। 'অধিকারের কথা বলছেন? আপনি যদি আমার লেখা চরিত্র হন, তবে সবই তো আমার অধিকারে।'
'না, ঘটনা বদলে গেছে দিলীপবাবু। সময় বদলে গেছে। আজ ইচ্ছা করলেও আপনি সেই গল্পটি লিখতে পারবেন না।'
দিলীপবাবু চুপ করে রইলেন। কী বলবেন, ভাষা খুঁজ পাচ্ছেন না। কেবল মনে হল শুভ জানি এখন কী করছে। অমিয়বাবু যেন তার মনের কথা শুনতে পান। বললেন, 'শুভ আর ফিরে আসবে না দিলীপবাবু, আমাদের জীবন যেমন আপনি নষ্ট করে দিয়েছেন। আপনার জীবনেও একটা অপূর্ণতা থাক।'
দিলীপবাবু আর্তনাদ করে উঠলেন, 'কী বলছেন এসব? আপনারা কারা? কেন এমন বলছেন? এ হতে পারে না। এ হয় না। তিনি আবার 'বৌমা বৌমা, সুনয়না সুনয়না' বলে জোরে ডাকতে থাকেন। কিন্তু গলা দিয়ে যেন কোনো আওয়াজই বেরোয় না। দিলীপবাবু কাঁদতে থাকেন। তার চোখ জ্বালা করে।
'কাঁদবেন না দিলীপবাবু, এটা হয়, এ সহ্য করতে হবে আপনাকে। তিরিশ বছর ধরে আমরা যেভাবে সহ্য করে আছি। আপনি লিখলেন না বলে ছেলের সঙ্গে বাবার দেখা হল না। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরল না নায়ক। প্রেমিকের সঙ্গে দেখা হলো না প্রেমিকার। দাঙ্গা চলল তিরিশ বছর। এ হয়! হতে পারে! শহরের সবদিকে আজ আগুন। এর কারণ তো আপনি। এ তো চুড়ান্ত নৈরাজ্য! অথচ এই স্বেচ্ছাচার আপনি ঘটালেন।'
দিলীপবাবু চিৎকার করে বললেন, 'আমি লিখে সব ঠিক করে দেব। সব। আমাকে সামান্য সময় দিন।'
'তা আপনি পারবেন না দিলীপবাবু, আপনার সেই শক্তি এখন আর নেই। এরা আপনাকে আর রেহাই দেবে না।'
'এরা মানে?'
'ঐ দেখুন আপনার লেখা চরিত্ররা ভেঙে ফেলেছে আপনার ঘরের দেওয়াল। আপনার আর কোনো আভিজাত্য নেই। ঐ দেখুন তারা আপনার ঘরে জমানো সব সম্পত্তি লুঠ করে নিয়ে যাচ্ছে।'
দিলীপবাবু স্বপ্ন দেখছেন নাকি! তিনি দেখলেন তার ঘরের দেওয়াল ভেঙে পড়েছে। তিনি যেন মাঠের মাঝখানে অন্ধকারে চেয়ারে বসে আছেন। মাথার উপর কালচে নীল আকাশ। অগণন নক্ষত্র। দিলীপবাবু শুনতে পেলেন অন্ধকারের ভেতর থেকে যেন হাজার হাজার জনতার উল্লাস ধ্বনি তার দিকে এগিয়ে আসছে। ঠিক কোনদিকে, ঠাহর করতে পারলেন না। তিনি কি তিরিশ বছর ধরে চলা দাঙ্গার মাঝখানে এসে পড়েছেন! হঠাৎ কে পেট্রল বোমা ছুঁড়ে মারল। সেটা শূন্যে উঠে যেন তার দিকেই নেমে আসছে। তারা কি তাকে হত্যা করবে নাকি! প্রতিশোধ নিতে চায়! তিনি যেন চোখে আর কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। কান যেন বধির। দুম করে ফাটল সেটি কোথাও। দিলীপবাবু উপুর হয়ে পড়লেন মাটিতে। শত শত জনতা তার আলমিরা থেকে বইগুলো ছুঁড়ে মারতে লাগল আকাশের দিকে। দিলীপবাবুর মাথা কাজ করছে না। তিনি উপরে তাকালেন। অজস্র আগুনের ফুলকি নেমে আসছে আকাশ থেকে।
কি বলে যে ধন্যবাদ দেব তোমায়, কত বড় কাজ করলে নিজের জন্য একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে আমাদের এবং সমগ্র পাঠকদের পাঠ করার সুযোগ করে দিয়ে। খুব ভালো হয়েছে দাদা। শুভ কামনা।
উত্তরমুছুনকি বলে যে ধন্যবাদ দেব তোমায়, কত বড় কাজ করলে নিজের জন্য একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে আমাদের এবং সমগ্র পাঠকদের পাঠ করার সুযোগ করে দিয়ে। খুব ভালো হয়েছে দাদা। শুভ কামনা।
উত্তরমুছুনআমি রাজীব মজুমদার, উদয়পুর